মাত্র দেড় মাস বয়সী এক শিশু মায়ের সঙ্গে গেলো জেলহাজতে। মঙ্গলবার বিকেলে বিস্ফোরক আইনের এক মামলায় শিশুটির মা যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগমকে কারাগারে পাঠান আদালত। এরপর কোলের শিশুটি নিয়ে কারাগারে যান শিল্পী বেগম। পরে সন্ধ্যায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানি শেষে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান মানবিক বিবেচনায় তার জামিন মঞ্জুর করেন।
Advertisement
তবে, শিশুটির মায়ের জামিন মঞ্জুর হলেও এখনই তারা মুক্তি পাচ্ছেন না। শিল্পী বেগম কারাগারে যাওয়ার পর জামিন সংক্রান্ত আদেশ কারাগারে পাঠানো হতে পারে আগামীকাল বুধবার সকালে। এরপর তারা মুক্তি পাবেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দায়ের করা এ মামলায় বিস্ফোরক আইন ও দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়। বাদীপক্ষের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত এক ঘটনার জেরে এই মামলা করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, বাদীর ছেলে মো. তাহমিদ মুবিন রাতুল (২১) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় ১৬ জুলাই চানখাঁরপুল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন। পরবর্তীসময়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ২৩ জুলাই সন্ধ্যায় আসামিদের নির্দেশে বিপুলসংখ্যক লোক দেশীয় অস্ত্র, পিস্তল ও বোমা নিয়ে বাদীর বাসায় হামলা চালায় বলে অভিযোগ করা হয়। এতে ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর, লুটপাট এবং প্রায় ৮ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। হামলায় বাদীর স্বামী মো. সোহেল রানা গুরুতর আহত হন এবং তার হাত ভেঙে যায় বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া আসামিরা বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয় বলেও অভিযোগ আনা হয়েছে।
Advertisement
এ মামলায় গত ২০ এপ্রিল সন্ধ্যায় শিল্পী বেগমকে তার বাসা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
শুনানির এক পর্যায়ে আদালতের খাস কামরায় মা ও নবজাতক শিশুকে একসঙ্গে উপস্থিত করা হয়। পরে আদালত তাদের বাইরে পাঠিয়ে আইনজীবীদের বক্তব্য শোনেন। সবশেষে মামলার নথি পর্যালোচনা করে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।
তবে, শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি আদালতে যে যুক্তি উপস্থাপন করেন, তা পরে জাগো নিউজকে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি জানান, তার মক্কেল সদ্য সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়েছেন এবং তার শরীরের ক্ষত এখনো শুকায়নি। এই অবস্থায় তাকে নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তার কোলে রয়েছে মাত্র এক মাস ১৬ দিনের এক নবজাতক শিশু, যে সম্পূর্ণভাবে মায়ের ওপর নির্ভরশীল।
আরও পড়ুনবিস্ফোরক মামলায় যুব মহিলা লীগ নেত্রী কারাগারে, শিশুসন্তান নিয়ে উদ্বেগ জামিন পেলেন দেড় মাসের সন্তানসহ কারাগারে যাওয়া সেই যুব মহিলা লীগ নেত্রী
Advertisement
আইনজীবী আদালতকে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে মাকে কারাগারে পাঠানো হলে শিশুটির স্বাভাবিক জীবনধারণ ব্যাহত হতে পারে এবং তার জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। দেশের বর্তমান আবহাওয়া, পরিবেশ এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগ। বিশেষ করে হামের প্রকোপ উল্লেখ করে তিনি যুক্তি দেন, এত ছোট শিশুকে জেলখানায় নেওয়া কিংবা মায়ের কাছ থেকে আলাদা করা, উভয় অবস্থাই মা ও শিশুর জন্য চরম অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল আখ্যা দিয়ে যে কোনো শর্তে আসামির জামিন প্রার্থনা করেন।
এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শিশুটির মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে এক পুলিশ কর্মকর্তা শিল্পী বেগমকে হাজতখানায় নিতে আসেন। এ সময় আইনজীবী ও নারীর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে তর্কে জড়ান। পাঁচ মিনিট পর তাকে হাঁটিয়ে সিএমএম আদালতের চারতলা থেকে নামিয়ে হাজতখানায় নেওয়া হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, শুনানি শেষে আদালত প্রাঙ্গণের বারান্দায় বসেই শিশুটিকে মায়ের কোলে দুধ পান করানো হয়। এসময় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের দ্রুত তাড়া দিতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর সন্তানকে স্বজনদের কোলে তুলে দিতে গিয়ে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এরপর পুলিশ তাকে আদালতের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। তখন আবার শিশুটিকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন শিল্পী বেগম। পুরো সময়টাতেই তিনি সন্তানকে বুকে আগলে রেখেছিলেন।
কথা হয় শিল্পী বেগমের খালা উম্মে কুলসুম সুমির সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি জানান, তার ভাগনির শারীরিক অবস্থা ভালো নয় এবং হাত ভাঙা থাকায় তাকে নিয়ে আদালতে থাকা কঠিন।
এ সময় উপস্থিত অন্য স্বজনরাও বলেন, এত ছোট শিশুকে নিয়ে প্রিজনভ্যানে করে কারাগারে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, মা ও শিশুর বর্তমান শারীরিক অবস্থায় কারাগারে থাকলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
পরে সন্ধ্যায় জামিন আবেদন মঞ্জুরের পর আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটের দিকে জামিন শুনানি শুরু হয়। শুনানি শেষে আদালত শিল্পী বেগমকে জামিন দেন। ৫ হাজার টাকা মুচলেকায় পুলিশ রিপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত তার জামিন মঞ্জুর করে আদেশ দেন আদালত।
শিশুটি ও তার মায়ের মুক্তির বিষয়ে আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি জাগো নিউজকে বলেন, জামিন আবেদন শুনানি শেষে আদালত তা মঞ্জুর করে আদেশ দিয়েছেন। বর্তমানে জামিন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান। আগামীকাল সকালে বিচারক এসব নথিতে স্বাক্ষর করলে তা দ্রুত কারাগারে পাঠানো হবে। এরপরই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে মা ও নবজাতক শিশুটি মুক্তি পাবেন।
এমডিএএ/কেএসআর