দেশে কোরবানির পশুর হাটের চিরচেনা সেই ‘দাম কষাকষি’ আর ‘অনুমানের লড়াই’ এখন ডিজিটাল বিবর্তনের মুখে। এক সময় কেবল অভিজ্ঞদের দিয়ে পরিমাণ আন্দাজ করে চলতো বেচাকেনা; কিন্তু সময়ের সঙ্গে আধুনিক ক্রেতাদের কাছে পুরোনো সেই পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। ফলে পশু বিক্রিতে এখন জায়গা করে নিচ্ছে ‘লাইভ ওয়েট’ বা জীবন্ত ওজন মেপে গরু কেনা।
Advertisement
বরিশালে কয়েক বছর ধরেই এই ‘লাইভ ওয়েট’ দিয়ে পশু বিক্রির প্রবণতা বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে স্বচ্ছতা, অপরদিকে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে আস্থা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং ক্রেতাদের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এই পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেক হাটে ডিজিটাল ওজন মাপার মেশিন বসানো হচ্ছে, যেখানে গরুর ওজন অনুযায়ী নির্ধারিত দরে দাম ধরা হচ্ছে। এতে দর কষাকষির ঝামেলা কমে যাচ্ছে এবং প্রতারণার সুযোগও অনেক অংশে কমছে।
‘আগে গরুর আকার-আকৃতি দেখে দাম আন্দাজ করা হতো, যা অনেক সময় সঠিক হতো না। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দাম দিয়ে কম ওজনের গরু কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতো। কিন্তু লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে গরুর প্রতি কেজির নির্দিষ্ট দাম থাকায় সহজেই হিসাব করা যায় মোট মূল্য’
Advertisement
অন্যদিকে খামারিরাও এই পদ্ধতিতে পশু বেচাকেনায় স্বস্তি পাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরুআলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্পছাদবাগান থেকে শুরু, চাঁদপুরে এখন আঙুর চাষে সম্ভাবনার নতুন দিগন্তবাঁশ-বেতের শিল্পে পাহাড়ের প্রাণ, টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম লাকি চাকমার
তাদের দাবি, লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে তারা তাদের পশুর প্রকৃত মূল্য পাচ্ছেন। আগে অনেক সময় দালালদের কারণে সঠিক দাম পাওয়া যেত না, কিন্তু এখন ওজন অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ হওয়ায় সেই সমস্যা কমেছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এই পদ্ধতিকে আরও উৎসাহিত করে এবং দেশের সব পশুর হাটে ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করে, তাহলে ভবিষ্যতে এটি কোরবানির পশু কেনাবেচার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
খামারে লালন-পালন করা হচ্ছে গরু/ ছবি: জাগো নিউজ
Advertisement
লাইভ ওয়েট দিয়ে পশু কিনে কোরবানি দেন ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিকী সুজিন।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আগে গরুর আকার-আকৃতি দেখে দাম আন্দাজ করা হতো, যা অনেক সময় সঠিক হতো না। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দাম দিয়ে কম ওজনের গরু কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতো। কিন্তু লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে গরুর প্রতি কেজির নির্দিষ্ট দাম থাকায় সহজেই হিসাব করা যায় মোট মূল্য।
তিনি আরও বলেন, লাইভ ওয়েট ব্যবস্থা এখন ডিজিটাল যুগের সময় উপযোগী একটা পদ্ধতি। এর ফলে ক্রেতা বিক্রেতার ঠকে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে পছন্দ অনুযায়ী গরু দেখে লাইভ ওয়েট দিয়ে ক্রয় করা যায়। এখন সব হাটে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত, যাতে কেউ না ঠকে।
‘সারাজীবন গরুর সাইজ চোখে দেখে অনুমান করে বিক্রি করেছি। এবারও খামার থেকে অনেক গরু বিক্রি হয়ে যাবে। অবশিষ্ট যা থাকবে সেগুলো হাটে নিয়ে বিক্রি করবো। হাটে ওজন মাপার যন্ত্র থাকলেও আমার নির্ধারিত দাম অনুযায়ী গরু বিক্রি করবো। কারণ এখন গরু পালনে আগের থেকে খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বাজার দর মাথায় রেখে ও লালন-পালনের খরচের হিসেব করে দাম নির্ধারণ করা হবে’
আরেক ক্রেতা রাতাহ খান বলেন, আগে সবসময় কোরবানির হাট থেকে গরু কেনা হতো। হাটে নানান ঝামেলা থাকায় এখন হাটের চেয়ে এগ্রো ফার্ম থেকে গরু ক্রয় করি। এগ্রো ফার্ম থেকে গরু কিনলে হাটের চেয়ে সুবিধাও আছে। হাটে দালাল, খাজনা পরিশোধ, পরিবহন ব্যবস্থার কারণে অনেক ঝামেলা হয়। আর এগ্রো ফার্ম থেকে পছন্দ অনুযায়ী গরু দেখে লাইভ ওয়েট দিয়ে কেনা যায়। এছাড়া এগ্রো ফার্ম কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব পরিবহন দিয়ে গরু বাড়িতে পৌঁছে দেয়।
কোরবানির জন্য গরুর যত্ন নিচ্ছেন খামারি/ ছবি: জাগো নিউজ
জানা গেছে, বিগত বছরগুলোতে বরিশালের অনেক হাটে লাইভ ওয়েট সুবিধা চালু হয়নি। আবার কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কিছু ব্যবসায়ী এখনো পুরোনো পদ্ধতিতেই ব্যবসা চালিয়ে যেতে আগ্রহী।
বরিশাল সাদ সাঈদ এগ্রো ফার্মের মালিক সাঈদ বিন মিরাজ জাগো নিউজকে বলেন, এখন লাইভ ওয়েটে গরু বিক্রির সব থেকে বড় সুবিধা হচ্ছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ঠকার সুযোগ নেই। হাটে গরুর ওজন অনুমান করা যায় না, কিন্তু ফার্মে গরু দেখে ওজন দিয়ে কিনতে পারছেন। আবার ওজন দেওয়ার মানে এটা নয় যে আপনি মাংস হিসাব করে কিনছেন, ওজন দেওয়ার মানে হচ্ছে আপনি একটা ধারণা পেলেন গরুটার সম্পর্কে।
পিরোজপুরের ২০০ বছরের মৃৎশিল্প বিলুপ্তির পথেহাওরে জলাবদ্ধতায় ভরা মৌসুমেও সংকটে কৃষকএক ছাগলেই ভাগ্য বদল মমতাজ বেগমের
তিনি আরও বলেন, হাটে গরু কিনলে নানান ঝামেলা পোহাতে হয়। হাটে দালাল, খাজনা, পরিবহন খরচের একটা বাড়তি বোঝা টানতে হয়। বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে ক্রেতাদের অতিরিক্ত পরিবহন খরচ করতে হবে। সেক্ষেত্রে এগ্রো ফার্ম থেকে গরু কিনলে ওইসব ঝামেলা পোহাতে হবে না। এগ্রোর নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থায় ক্রেতাদের বাড়ি পর্যন্ত গরু পৌঁছে দেওয়া হবে। ফলে প্রতারিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
‘বিভিন্ন এগ্রো ফার্মে লাইভ ওয়েট স্কেলের ব্যবস্থা করা হয় কিন্তু হাটগুলোতে সেই ব্যবস্থা থাকে না। এবার জেলা প্রশাসকের মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে, যাতে হাটগুলোতে লাইভ ওয়েট স্কেলের ব্যবস্থা করা হয়’
এগ্রো ফর্মের মালিকরা জানান, লাইভ ওয়েট পদ্ধতি শুধু একটি নতুন ট্রেন্ড নয় বরং এটি একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং আধুনিক পশু বাণিজ্য ব্যবস্থার বড় পদক্ষেপ।
বরিশাল নগরীর টিয়া খালি এলাকার চৌধুরী বাড়ির খামারি নাসির উদ্দিন বলেন, এখন গো খাদ্যের দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে, পশুর লালন পালনে ব্যয়ও আগের থেকে অনেক বেড়েছে। সে হিসেবে গরু হাটে নিলে দাম নির্ধারণ করা হবে। তবে হাটে ওজন মাপার ডিজিটাল স্কেল থাকলে ভালো হয়, তাতে ক্রেতাও গরুর ওজন দেখে দাম নির্ধারণ করতে পারে।
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গরুর যত্ন নিচ্ছেন খামরি/ জাগো নিউজ
ওই এলাকার আরেক খামারি লিটন বলেন, সারাজীবন গরুর সাইজ চোখে দেখে অনুমান করে বিক্রি করেছি। এবারও খামার থেকে অনেক গরু বিক্রি হয়ে যাবে। অবশিষ্ট যা থাকবে সেগুলো হাটে নিয়ে বিক্রি করবো। হাটে ওজন মাপার যন্ত্র থাকলেও আমার নির্ধারিত দাম অনুযায়ী গরু বিক্রি করবো। কারণ এখন গরু পালনে আগের থেকে খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বাজার দর মাথায় রেখে ও লালন-পালনের খরচের হিসেব করে দাম নির্ধারণ করা হবে।
‘হাটে গরু কিনলে নানান ঝামেলা পোহাতে হয়। হাটে দালাল, খাজনা, পরিবহন খরচের একটা বাড়তি বোঝা টানতে হয়। বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে ক্রেতাদের অতিরিক্ত পরিবহন খরচ করতে হবে। সেক্ষেত্রে এগ্রো ফার্ম থেকে গরু কিনলে ওইসব ঝামেলা পোহাতে হবে না। এগ্রোর নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থায় ক্রেতাদের বাড়ি পর্যন্ত গরু পৌঁছে দেওয়া হবে। ফলে প্রতারিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই’
জ্বালানি সংকটে স্বস্তি দিচ্ছে জিকে ক্যানাল, কৃষকের মুখে হাসিরেলের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ‘ভূতুড়ে নগরী’ হয়ে উঠেছে লালমনিরহাটচাঁপাইনবাবগঞ্জে বাণিজ্যিক ড্রাই আনারসে ব্যাপক সম্ভাবনা
বরিশাল জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, বিভিন্ন এগ্রো ফার্মে লাইভ ওয়েট স্কেলের ব্যবস্থা করা হয় কিন্তু হাটগুলোতে সেই ব্যবস্থা থাকে না। এবার জেলা প্রশাসকের মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে, যাতে হাটগুলোতে লাইভ ওয়েট স্কেলের ব্যবস্থা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, হাটে ইজারাদারের উদ্যোগে এই ব্যবস্থা করা দরকার। যাতে ক্রেতা বিক্রেতা উভয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারে। এক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অফিসের কোনো প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করা হবে।
এনএইচআর/এফএ/জেআইএম