জাতীয়

জ্বালানি সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীকে খোলা চিঠি

বর্তমান জ্বালানি সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে খোলা চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)।

Advertisement

বুধবার (২২ এপ্রিল) দিবাগত রাতে গণমাধ্যমে চিঠিটি পাঠান সংগঠনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ।

চিঠিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে অচল হয়ে পড়ে, যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশও তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়ে। এই সংকটের কারণে বিদ্যুৎ, কৃষি, শিল্প, পরিবহনসহ প্রায় প্রতিটি খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানি না- এই সংকট কবে কাটবে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কখন ফিরবে।’

দেশের বিদ্যমান জ্বালানি কাঠামোর বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করে মোস্তফা আল মাহমুদ জানান, যদি ভারী জ্বালানি তেল (এইচএফও) ভিত্তিক এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এক বছর ৮০ শতাংশ দক্ষতায় পরিচালিত হয়, তাহলে প্রায় ১৯০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এতে উৎপাদন হয় আনুমানিক ৭০ লাখ ইউনিট (কিলোওয়াট ঘণ্টা) বিদ্যুৎ। এই ব্যয়ের একটি বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রায়, যা প্রায় ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য। এর মধ্যে প্রায় ৪০ কোটি টাকা সরকারকে ভর্তুকি হিসেবে বহন করতে হয়।

Advertisement

অন্যদিকে, সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সৌরশক্তি থেকে উৎপাদন করতে চাইলে প্রায় পাঁচ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সোলার প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে, যার প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রায় ২৫ কোটি টাকা। কিন্তু এর জন্য কোনো জ্বালানি প্রয়োজন হয় না, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় না ও দীর্ঘমেয়াদে কোনো ভর্তুকির প্রয়োজন পড়ে না।

‘যদি আমরা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারি, তাহলে সেই অর্থ শিল্পায়ন, কৃষি উন্নয়ন ও অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে আমাদের গার্মেন্টস খাত- যা দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি- তা টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি,’ যোগ করেন বিএসআরইএ সভাপতি।

তিনি এটিও বলেন, ‘আমরা বুঝি, রাতারাতি এলএনজি, কয়লা বা অন্যান্য জ্বালানি উৎস থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। তবে এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে রূপান্তর শুরু করা সময়ের দাবি। আপনি এরই মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, যা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’

বিএসআরইএ সভাপতি তার চিঠিতে কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন। সেগুলো হলো-

Advertisement

বিলম্ব না করে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সব সরঞ্জাম শূন্য শুল্কে আমদানির ব্যবস্থা করা। ব্যাটারি স্টোরেজ প্রযুক্তির সরঞ্জামেও শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া। সোলার ও ব্যাটারি পণ্যের জন্য আমদানিতে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ মার্জিনে এলসি খোলার সুযোগ এবং পাঁচ শতাংশ ফ্ল্যাট সুদে ১০ বছর মেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। ইলেকট্রিক যানবাহনের (ইভি) জন্য সহনীয় শুল্ক নির্ধারণ করে আমদানি সহজ করা। ইউটিলিটি-স্কেল সোলার প্রকল্পের জন্য দ্রুত জমি বরাদ্দ, গ্রিড সংযোগ এবং বিনিয়োগবান্ধব পিপিএ ও আইএ নিশ্চিত করা, যাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়। এরই মধ্যে বাতিল হওয়া এলওআই-প্রাপ্ত প্রকল্পগুলো আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পুনর্মূল্যায়ন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া, যাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার হয়। সোলার সেচ পাম্পের সরঞ্জাম শূন্য শুল্কে আমদানির সুযোগ দিয়ে ডিজেলচালিত পাম্পের বিকল্প হিসেবে দ্রুত বাস্তবায়ন করা। মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি সহজীকরণ ও দ্রুত লাইসেন্স দেওয়া নিশ্চিত করা এবং ট্রান্সমিশন চার্জ সহনীয় পর্যায়ে রাখা। অফশোর, অনশোর এবং নিয়ার-শোর উইন্ড এনার্জির সম্ভাব্যতা যাচাই করে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া। নিয়ার-শোর অঞ্চলে ভাসমান বা অফশোর সোলার প্রকল্পের সম্ভাবনা যাচাই করা। জামালপুরের চরাঞ্চলে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রস্তাবিত ২০ হাজার একর জমির সোলার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া।

মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, ‘উপরোক্ত কয়েকটি উদ্যোগ আমাদের আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল বলে আমরা মনে করি। তবে এখনো সময় আছে, যদি আমরা এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারি, তাহলে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাবো। ইনশাআল্লাহ, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে আমাদের শিল্প বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচবে এবং দেশ এগিয়ে যাবে।’

এনএস/একিউএফ