মতামত

বাস ভাড়া বাড়ে যাত্রীসেবা কমে

রাজধানীর প্রতিদিনের সকাল যেন এক অনন্ত পরীক্ষা। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো জানে না, আজ অফিসে পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগবে, কিংবা মাসের শেষে বেতনটা কতটা টিকবে। এর মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। পরিবহন মালিকদের দাবি—ভাড়া বাড়াতেই হবে। কিন্তু যাত্রীদের প্রশ্ন আরও সহজ এবং আরও তীব্র: তেলের দাম যখন কমেছিল, তখন ভাড়া কমেনি কেন?

Advertisement

এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয় না। বরং প্রতিবারই দেখা যায়, মূল্যবৃদ্ধির চাপ একমুখী—যাত্রীদের দিকে।

দুই.বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পক্ষ থেকে ভাড়া বৃদ্ধির নানা প্রস্তাব এসেছে—পরিবহন মালিকরা শহরে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২.১২ টাকা থেকে ২.৪২ টাকায় বাড়ানোর দাবি তুলেছে। আবার কেউ কেউ দীর্ঘপথে ভাড়া ২.১২ টাকা থেকে ৪.০৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যা প্রায় দ্বিগুণ। কিছু প্রস্তাবে মহানগরে ভাড়া ৪ টাকা প্রতি কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যে মানুষগুলো দাঁড়িয়ে থাকে, তারা শুধু যাত্রী নয়—তারা এই শহরের শ্রমশক্তি, অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাদের সময়, তাদের টাকা, তাদের স্বাস্থ্য—সবকিছু দিয়েই এই শহর চলে। কিন্তু বিনিময়ে তারা কী পায়? একটি অস্বস্তিকর, অনিরাপদ, অনিশ্চিত যাত্রা—যেখানে প্রতিদিন নতুন করে বাড়ে ভাড়া, কিন্তু কমে না কষ্ট। জ্বালানির দাম বাড়তেই পারে—এটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই বাস্তবতার বোঝা ন্যায্যভাবে বণ্টন করা। যদি সেই দায়িত্ব পালিত না হয়, তাহলে বাসের ভাড়া শুধু বাড়ে না— মানুষের আস্থাও কমে যায়। এখন প্রশ্ন একটাই— আমরা কি শুধু ভাড়া বাড়ানোর রাষ্ট্র হবো, নাকি জনবান্ধব পরিবহনের রাষ্ট্র?

Advertisement

অন্যদিকে, যাত্রী কল্যাণ সমিতি তুলনামূলক বাস্তবসম্মত একটি প্রস্তাব দিয়েছে— প্রতি কিলোমিটারে সর্বোচ্চ ১৫ পয়সা বৃদ্ধি। তাদের যুক্তি পরিষ্কার। যখন ডিজেলের দাম কমেছিল, তখন ভাড়া ২–৩ পয়সা কমানো হয়েছিল (যদিও বাস্তবে কার্যকর হয়নি), তাই ১৫ টাকা বৃদ্ধি হলে ১৫ পয়সা বৃদ্ধি যৌক্তিক। এই দুই প্রস্তাবের মধ্যে পার্থক্যই আসলে আমাদের নীতিগত সংকটকে তুলে ধরে— একদিকে সীমাহীন মুনাফার চেষ্টা, অন্যদিকে ন্যায্যতার দাবি।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের ‘অরাজক নিয়মে’ চলছে। এখানে বাজারনীতি আছে, কিন্তু জবাবদিহি নেই; ভাড়া নির্ধারণ আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই; আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লেই তা যাত্রীদের ঘাড়ে চেপে বসে, কিন্তু কমলে তার সুফল তারা পায় না।

ধরা যাক, একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী প্রতিদিন বাসে করে যাতায়াত করেন। আগে যদি তার দৈনিক যাতায়াত খরচ ১০০ টাকা হয়ে থাকে, নতুন ভাড়া বৃদ্ধির ফলে তা সহজেই ১২০–১৩০ টাকায় পৌঁছাতে পারে। মাসে ২৬ কর্মদিবস ধরলে, অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫২০–৭৮০ টাকা। একজনের জন্য এই অঙ্কটি ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু পরিবারে যদি দুইজন কর্মজীবী থাকে, কিংবা সন্তানদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত যুক্ত হয়, তখন এই ব্যয় কয়েক হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকে। যেখানে নিত্যপণ্যের দাম আগেই ঊর্ধ্বমুখী, সেখানে এই অতিরিক্ত চাপ অনেক পরিবারের জন্য সরাসরি জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দেয়।

কিন্তু সমস্যাটি শুধু ভাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভাড়া বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে জ্বালানির দাম দেখানো হলেও, সেবার মান একই জায়গায় স্থির—বরং অনেক ক্ষেত্রে আরও খারাপ। রাজধানীতে এখনও অসংখ্য লক্কড়-ঝক্কড়, মেয়াদোত্তীর্ণ বাস চলাচল করছে। কালো ধোঁয়ায় ভরা এসব যানবাহন শুধু পরিবেশ দূষণই করছে না, যাত্রীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। হাইড্রোলিক হর্নের বিকট শব্দ শহরের শব্দদূষণকে অসহনীয় করে তুলেছে।

Advertisement

যাত্রীদের জন্য আরেকটি বড় যন্ত্রণা হলো ‘স্টপেজ বিশৃঙ্খলা’। নির্দিষ্ট বাসস্টপেজের ধারণা প্রায় অচল। যত্রতত্র বাস থামানো, যাত্রী ওঠানামা, রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। এতে সময় নষ্ট হয়, জ্বালানি অপচয় হয়, আবার সেই অপচয়ের দায়ও শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপরই বর্তায়।

একটি ছোট কেস স্টাডি ধরা যাক। মিরপুর থেকে বাড্ডাগামী এক অফিসযাত্রী রাশেদ। আগে তার যাতায়াতে সময় লাগত গড়ে দেড় ঘণ্টা, খরচ ছিল প্রতিদিন ৯০ টাকা। এখন সময় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই ঘণ্টা, আর খরচ ১২০ টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ, তিনি প্রতিদিন অতিরিক্ত ৩০ টাকা এবং ৩০ মিনিট সময় ব্যয় করছেন। মাস শেষে তিনি শুধু টাকা নয়, প্রায় ১৩ ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় হারাচ্ছেন—যা তিনি পরিবার, বিশ্রাম বা ব্যক্তিগত উন্নয়নে ব্যয় করতে পারতেন।

এই বাস্তবতা কেবল রাশেদের নয়; এটি লাখো নগরবাসীর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা।

তিন.বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি কেবল জ্বালানির দামের নয়—এটি একটি কাঠামোগত সংকট। ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব, নিয়ম প্রয়োগে দুর্বলতা, মনিটরিংয়ের ঘাটতি এবং জবাবদিহির অভাব—সব মিলিয়ে একটি অসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এখানে যাত্রীকে ‘গ্রাহক’ হিসেবে দেখা হয় না; বরং তিনি এক ধরনের ‘বাধ্য ভোক্তা’, যার বিকল্প নেই।

অন্যদিকে পরিবহন মালিকদেরও কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। বাস কেনা, রক্ষণাবেক্ষণ, ঋণের সুদ—সবকিছুর খরচ বেড়েছে। ফলে তাদের পক্ষ থেকেও ভাড়া সমন্বয়ের দাবি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই খরচের পুরোটা কি যাত্রীর ওপর চাপানোই একমাত্র পথ? নাকি নীতিগত সংস্কার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার দিয়ে এই চাপের একটি অংশ কমানো সম্ভব?

চার.

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—সমাধান কী?

প্রথমত, ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করতে হবে। জ্বালানির দামের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত একটি ফর্মুলা থাকতে পারে, যেখানে দাম বাড়লে ভাড়া বাড়বে, আবার কমলে তা বাধ্যতামূলকভাবে কমবে। এই প্রক্রিয়াটি ডিজিটালভাবে মনিটর করা গেলে অনিয়ম অনেকটাই কমানো সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, গণপরিবহনের গুণগত মান উন্নয়ন জরুরি। মেয়াদোত্তীর্ণ বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। পরিবেশবান্ধব বাস, যেমন সিএনজি বা বৈদ্যুতিক বাস চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। এতে একদিকে দূষণ কমবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয়ও কমবে।

তৃতীয়ত, রুট রেশনালাইজেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই রুটে অসংখ্য কোম্পানির প্রতিযোগিতামূলক বিশৃঙ্খলা না রেখে, নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট সংখ্যক বাস ও কোম্পানি নির্ধারণ করা উচিত। এতে শৃঙ্খলা বাড়বে, যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে।

চতুর্থত, কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। হাইড্রোলিক হর্ন, অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, যত্রতত্র পার্কিং—এসবের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। শুধু অভিযান নয়, জরিমানার অর্থ যেন বাস্তবেই আদায় হয় এবং তা যেন নজির তৈরি করে—সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, গণপরিবহন ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ই-টিকিটিং, জিপিএস ট্র্যাকিং, নির্দিষ্ট সময়সূচি—এসব চালু করা গেলে যাত্রীদের অনিশ্চয়তা অনেক কমবে। তারা জানবে কখন বাস আসবে, কতক্ষণ লাগবে—এটি একটি বড় মানসিক স্বস্তি।

পাঁচ.সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যাত্রীকে ‘গ্রাহক’ হিসেবে দেখা। আমাদের দেশে গণপরিবহনে যাত্রী যেন একপ্রকার ‘জিম্মি’। তাদের চাহিদা, স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা—এসবকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ একটি জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে যাত্রীকেই কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।

জ্বালানির দাম বাড়তে পারে—এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতার পুরো বোঝা যদি একতরফাভাবে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হয়, তাহলে তা শুধু অর্থনৈতিক অন্যায় নয়, সামাজিক বৈষম্যও বাড়ায়।

ঢাকার প্রতিটি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত মানুষের চোখে যে হতাশা, যে অসহায়তা—তা শুধু পরিবহন সংকটের প্রতিচ্ছবি নয়; এটি আমাদের নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতারও প্রতিফলন।

এখন সময় এসেছে এই বাস্তবতা বদলানোর। নয়তো প্রতিদিনের এই যাত্রা শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর লড়াই নয়, বরং বেঁচে থাকার সংগ্রাম হয়ে থাকবে।

ছয়.শেষ কথা: এই শহর কার?ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যে মানুষগুলো দাঁড়িয়ে থাকে, তারা শুধু যাত্রী নয়—তারা এই শহরের শ্রমশক্তি, অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাদের সময়, তাদের টাকা, তাদের স্বাস্থ্য—সবকিছু দিয়েই এই শহর চলে। কিন্তু বিনিময়ে তারা কী পায়? একটি অস্বস্তিকর, অনিরাপদ, অনিশ্চিত যাত্রা—যেখানে প্রতিদিন নতুন করে বাড়ে ভাড়া, কিন্তু কমে না কষ্ট।

জ্বালানির দাম বাড়তেই পারে—এটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই বাস্তবতার বোঝা ন্যায্যভাবে বণ্টন করা। যদি সেই দায়িত্ব পালিত না হয়, তাহলে বাসের ভাড়া শুধু বাড়ে না— মানুষের আস্থাও কমে যায়। এখন প্রশ্ন একটাই— আমরা কি শুধু ভাড়া বাড়ানোর রাষ্ট্র হবো, নাকি জনবান্ধব পরিবহনের রাষ্ট্র?

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com

এইচআর/এএসএম