ঝিনাইদহের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য হ্যাচারি বলুহর মৎস্য প্রজনন খামার। ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকে রেণু পোনা উৎপাদনে প্রতিষ্ঠানটির জৌলুস থাকলেও এখন চলছে ভাটার টান। জনবল সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, ব্যবস্থাপনার অভিযোগ এবং মানসম্মত পোনা সরবরাহে ঘাটতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রান্তিক মৎস্য চাষিদের ওপরও।
Advertisement
অনেকের অভিযোগ, খামারে পাওয়া যায় না কাঙ্ক্ষিত মানের রেণু ও পোনা। সেই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা হ্যাচারিগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে প্রান্তিক মৎস্য চাষিদের চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে বলুহর মৎস্য প্রজনন খামার।
আরও পড়ুন- মাছের আঁশ রপ্তানি করে আসছে লাখ টাকারাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জে কমেছে আমচাষ, বাড়ছে পুকুরফসলি জমিতে নতুন করে লোনা পানির আগ্রাসন
জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে কোটচাঁদপুর উপজেলার বলুহর বাওড়ের পাশে তৎকালীন সরকার মৎস্য প্রজনন খামার প্রতিষ্ঠা করে। ১০৩ একর জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় এই হ্যাচারি। যেখানে মিঠা পানির কার্পজাতীয় (সাদা মাছ) মাছের রেণু পোনা উৎপাদন করা হয়। এছাড়া ব্রুড মাছ (মা ও পুরুষ মাছ) তৈরি করে এই প্রতিষ্ঠানটি। বলুহর মৎস্য হ্যাচারি জেলার ছয়টি উপজেলার চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অন্যান্য জেলায় রেণু পোনা সরবরাহ করে। মৃগেল, কাতল, রুই, সিলভার কার্প, গ্রাসকার্প, কালিবাউশ, ব্রিগহেডসহ মিঠা পানির সাদা মাছের রেণু পোনা এই হ্যাচারিতে উৎপাদন হয়। মূলত চায়না, ভিয়েতনাম ও চট্টগ্রামের হালদা নদী থেকে ব্রুড মাছ সংগ্রহ করে বলুহর মৎস্য প্রজনন খামার।
Advertisement
হ্যাচারি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর খামারে রেণু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯১৫ কেজি। যার সম্ভাব্য বাজার মূল্য ৩৬ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এছাড়া বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৬০০ কেজি। যার সম্ভাব্য বাজার মূল্য ১৪ লাখ টাকা।
এছাড়া ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার টেবিল ফিশ (খাবার হিসেবে বিক্রয়যোগ্য) ও দুই লাখ টাকার পাঙাশের ব্রুড মাছ বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে অন্যান্য জাতের রেণু উৎপাদন ও বিপণন বাবদ দুই লাখ টাকা আয় নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সব মিলিয়ে চলতি বছর রেণু, পোনা ও অন্যান্য মাছ থেকে মোট ৫৬ লাখ ৬৪ হাজার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যার মধ্যে চলতি মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত প্রায় ৩২ লাখ ৮ হাজার টাকা আয়ও করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
জনবল সংকট ও অব্যবস্থাপনাপ্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র সহকারী পরিচালক এসএম আশিকুর রহমান জানান, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে জনবল সংকট রয়েছে। অনুমোদিত ২৮ পদের মধ্যে পূরণ করা পদসংখ্যা মাত্র ১১টি। এই ১১ জনের মধ্যে তিনজন ডেপুটেশনে অন্যত্র সংযুক্ত রয়েছেন। ফলে মাত্র আটজনে চলছে পুরো খামারের কার্যক্রম। এছাড়া আউটসোর্সিং শ্রমিক দিয়ে চালানো হচ্ছে পাহারা, পুকুর পর্যবেক্ষণ, সংরক্ষণ ও পরিচর্যার কাজ। এই খামারে প্রতিদিন গড়ে ২০-২২ জন আউটসোর্সিং শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। ফলে অনভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণ না থাকা শ্রমিক দিয়ে খামারের কাজ করানোর ফলে ব্যাহত হচ্ছে রেণু পোনার কাঙ্ক্ষিত মান।
Advertisement
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর প্রথমদিকে খামারটি সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত ছিল। পরে ধীরে ধীরে মৎস্য প্রজনন খামারটি বিনোদন পার্কে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ কর্তৃপক্ষের।
প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র সহকারী পরিচালক এসএম আশিকুর রহমান বলেন, মৎস্য প্রজনন প্রক্রিয়া খুবই সংবেদনশীল। কিন্তু এখানে পুকুরের পাড়ে খামার ক্যাম্পাসে সবসময় সাধারণ মানুষের অবাধ বিচরণ থাকে। বিশেষ দিবস ও উৎসবে মানুষের উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয়। ফলে ব্রুড মাছের (মা ও পুরুষ) বিচরণ ও প্রজননের কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। আমরা এসব নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কথা বলেও কোনো সুরাহা পাইনি।
আরও পড়ুন- রাতের আঁধারে পুকুর খনন, রাজশাহীতে আবাদি জমি কমেছে ১৬ হাজার হেক্টররাজু সরদারের পুকুর যেন এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রজঞ্জালই এখন আয়ের উৎস
তিনি জানান, সাধারণ দর্শনার্থীরা হ্যাচারিতে এসে খাবারের প্যাকেট, খোসা, খাবারের উচ্ছিষ্ট ও ময়লা যত্রতত্র ফেলে রাখে, যা হ্যাচারি ও পুরো খামারের পরিবেশ নষ্ট করে।
হ্যাচারি ম্যানেজার ফিরোজ আহম্মেদ বলেন, প্রতিষ্ঠানটির ভবনগুলোও জরাজীর্ণ হয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে আছে। দীর্ঘদিন এসব ভবনের সংস্কার হয় না। এছাড়া মালামাল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত দুটি গাড়ির একটি অচল হয়ে পড়ে আছে গ্যারেজে।
তিনি জানান, বৃহত্তম এই বিশেষায়িত খামারে মোট ২৯টি পুকুর রয়েছে। এর মধ্যে ৭টি পুকুর পার্শ্ববর্তী বলুহর বাঁওড়ের আওতাধীন। বাকি ২২টি পুকুর বলুহর মৎস্য প্রজনন খামারের মালিকানাধীন। এসব পুকুরেই ব্রুড মাছ ও রেণু পোনা উৎপাদন হয়। দীর্ঘদিন এসব পুকুরের সংস্কার হয়নি। তবে সম্প্রতি মৎস অধিদপ্তরের টেন্ডারের মাধ্যমে শুরু হয়েছে পুকুরের সংস্কার কাজ।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা হ্যাচারির উৎপাদন বন্ধজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, ঝিনাইদহ জেলার ৬টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় একসময় ব্যক্তিগত উদ্যোগে হ্যাচারি গড়ে উঠেছিল। সেসব হ্যাচারির সবগুলোই এখন বন্ধ। হ্যাচারি ভেঙে গড়ে তোলা হয়েছে অন্য স্থাপনা। কেউ কেউ রেণু পোনা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। সরকারি হ্যাচারি ও যশোর থেকে রেণু পোনা সংগ্রহ করে মাছ চাষ করছেন জেলার প্রান্তিক মৎস্য চাষিরা।
নিজাম উদ্দিন বাদশা নামে এক মাছচাষি বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে রেণু পোনা উৎপাদন এখন ঝুঁকিপূর্ণ। পুকুর প্রস্তুত রাখা ও পুকুরের পরিবেশ ঠিক রাখা খুবই কঠিন। বিশেষ করে, রেণু উৎপাদনের ঝুঁকি এখন চাষিরা নিতে চায় না। যে কারণে অধিকাংশ চাষি সরকারি খামার, যশোর, কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরা অঞ্চল থেকে পোনা সংগ্রহ করে মাছচাষ করছেন।
প্রহ্লাদ কুমার নামে অপর এক চাষি বলেন, রেণু উৎপাদনে ঝুঁকি থাকে, কিন্তু লাভজনক। এখন কেউ রেণু উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে না। সবাই পোনা কিনে পুকুরে দিয়ে চাষ করছে। অল্প দিনে ভালো লাভ পাওয়া যায়। আমি নিজেই আগে পুকুর লিজ নিয়ে রেণু উৎপাদন করেছি। এখন পোনা কিনে চাষ করছি।
বলুহর মৎস্য প্রজনন খামারের সিনিয়র সহকারী পরিচালক এসএম আশিকুর রহমান বলেন, জেলা মৎস্য অফিসের সঙ্গে আমাদের অফিসিয়াল কোনো যোগ নেই। তবে আমরা কাজের ক্ষেত্রে অনেক সময় আলাপ-আলোচনা করে নিই। পরিকল্পনা আদান-প্রদান করা হয়। জেলার প্রায় শতাধিক মৎস্যচাষি আমাদের খামার থেকে রেণু কেনেন। রেণু নিয়ে গিয়ে তারা পুকুরে পোনা তৈরি করেন।
তিনি আরও বলেন, অনেক চাষি আমাদের রেণু দিয়ে পোনা বানিয়ে সেই পোনা বিক্রি করেন। এটাও তাদের জন্য লাভজনক। আমাদের প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত রেণু ও পোনার গুণগত মান অনেক উন্নত। আমরা সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
এফএ/এএসএম