দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতে বহুল প্রতীক্ষিত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে পেপ্যাল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
Advertisement
বুধবার (২২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এ ঘোষণা দেওয়ার পর ফ্রিল্যান্সার, উদ্যোক্তা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং ইকোসিস্টেমে গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
ফ্রিল্যান্সিং খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, পেপ্যাল চালু হওয়া মানেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের অন্যতম প্রধান বাধা দূর হওয়া। স্টুডিও ইভল্ভ-এর ফাউন্ডার ও ডিজাইন লিড সালাউদ্দিন ইশাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে অনেক আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট শুধু পেপ্যালের মাধ্যমে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কাজের সুযোগ হারান।’
তিনি বলেন, ‘পেপ্যাল চালু হলে ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ শুরু করা সহজ হবে, দ্রুত ও নিরাপদে পেমেন্ট গ্রহণ করা যাবে। বিশেষ করে নতুন ও ছোট ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ অনেক সহজ হয়ে যাবে।’
Advertisement
বর্তমানে ফ্রিল্যান্সাররা পেয়নিয়ার ও ওয়াইজ-এর মতো বিকল্প প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করলেও এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফি, পেমেন্ট বিলম্ব এবং ভেরিফিকেশন জটিলতা দেখা যায়। অনেক সময় ক্লায়েন্টকে বিকল্প পদ্ধতি বোঝাতে গিয়ে কাজের প্রাথমিক পর্যায়েই সমস্যা তৈরি হয়।
শেষ মুহূর্তে পেমেন্টেই আটকে যায় কাজফ্রিল্যান্সার ও আপটেক ডিজিটালের প্রতিষ্ঠাতা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায় ক্লায়েন্ট কাজ দিতে প্রস্তুত, বাজেট ঠিক। কিন্তু শেষ প্রশ্ন থাকে, ‘ডু ইউ একসেপ্ট পেপ্যাল?’ এই জায়গাতেই আমরা পিছিয়ে পড়ি।’ তার মতে, পেপ্যাল চালু হলে-ক্লায়েন্টের আস্থা বাড়বে, পেমেন্ট নিয়ে অনিশ্চয়তা কমবে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সিংয়ে বিশ্বাস তৈরি হওয়ার জন্য দ্রুততা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যখন ক্লায়েন্ট দ্রুত আস্থা পায়, তখন কাজের পরিমাণও বাড়ে, আয়ের সুযোগও বাড়ে।’
আয় বাড়বে, তবে নির্ভর করবে দক্ষতার ওপর
Advertisement
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেপ্যাল চালু হলে আয়ের প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও সেটি সরাসরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে না। সালাউদ্দিন ইশাদ বলেন, ‘পেপ্যাল একটি এনাবলার। এটি সুযোগ তৈরি করবে, কিন্তু আয় বাড়বে কি না তা নির্ভর করবে ফ্রিল্যান্সারের দক্ষতা, মার্কেটিং এবং গ্লোবাল প্রতিযোগিতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর।’ তার মতে, পেপ্যাল চালু হলে-নতুন ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ শুরু সহজ হবে, ছোট ও দ্রুত প্রজেক্টের সংখ্যা বাড়বে, ক্রস-বর্ডার লেনদেনে জটিলতা কমবে।
ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড: আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির পথেসরকারের আরেকটি বড় উদ্যোগ হলো ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আইডি কার্ড প্রদান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি ফ্রিল্যান্সিং পেশাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফ্রিল্যান্সারদের মতে, এই আইডি কার্ডের মাধ্যমে-ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও আর্থিক সেবা পাওয়া সহজ হবে, ঋণ বা ক্রেডিট সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, সরকারি প্রশিক্ষণ ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে অগ্রাধিকার মিলবে, বিভিন্ন প্রণোদনা ও ইনসেনটিভের আওতায় আসা সম্ভব হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি ফ্রিল্যান্সিংকে একটি ‘ফরমাল প্রফেশন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করবে। তবে বর্তমানে এই আইডি কার্ড ব্যবস্থার বাস্তব প্রভাব খুব বেশি দৃশ্যমান নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইডি কার্ড নিয়ে গ্লোবাল ইউআই/ইউএক্স ডিজাইন এজেন্সি ওয়েভস্পেস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিদ মিয়া বলেন, ‘এখনো ব্যাংক, প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় হয়নি। অনেক সুবিধা নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে, বাস্তবে কার্যকর হয়নি। তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে যদি-ব্যাংকিং সিস্টেমের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ তৈরি হয় নির্দিষ্ট সুবিধা (লোন, ট্যাক্স বেনিফিট, ইনসেনটিভ) বাস্তবায়িত হয় তাহলে এই আইডি কার্ড ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বাস্তবিক মূল্য তৈরি করবে।’
এদিকে সরকার জানিয়েছে, পেপ্যাল চালুর পাশাপাশি কয়েক হাজার তরুণকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করে বৈদেশিক আয় বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু প্ল্যাটফর্ম চালু করাই যথেষ্ট নয়-মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। বাস্তব দক্ষতা ছাড়া ফ্রিল্যান্সিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়।
পেপ্যালের আগমন বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ম্যানেজার এবং হেড অব ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া, মুভিরীল স্টুডিও-এর ডিরেক্টর সেলম হোসেন বলেন-পেপ্যালের আগমন বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজ সহজ হবে। পেমেন্ট হবে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ হবে। সর্বপরি নতুন প্রজন্ম ফ্রিল্যান্সিং খাতে আগ্রহী হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি নিজে এই ইন্ডাস্ট্রির একজন মানুষ হিসেবে এই অগ্রগতিতে গভীরভাবে গর্বিত। বাংলাদেশ সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারকে আন্তরিক ধন্যবাদ, যাদের সম্মিলিত উদ্যোগে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দেশের মানুষের জন্য বাস্তবায়নের পথে এসেছে।’
আমাদের প্রত্যাশানতুন প্রজন্ম যারা আইটি সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তাদের জন্য এটি শুধু একটি সুযোগ নয় একটি শক্তিশালী আশার আলো জানিয়ে তিনি বলেন-নিঃসন্দেহে, এটি আমাদের ফ্রিল্যান্সিং ইকোসিস্টেমকে আরও গতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রায় এই ধরনের উদ্যোগ আরও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পেপ্যাল চালু এবং ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড-দুই উদ্যোগই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এগুলোর সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। পেপ্যাল ফ্রিল্যান্সারদের জন্য গ্লোবাল সুযোগ তৈরি করবে, আর আইডি কার্ড তাদের স্থানীয়ভাবে স্বীকৃতি ও সুবিধা পাওয়ার পথ খুলে দেবে। তবে বাস্তবায়ন যদি সঠিকভাবে না হয়, তাহলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে বলেও মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুনসোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল খবরের সত্যতা যাচাই করবে গুগলএখন নোটপ্যাডেও পাবেন ইমেজ সাপোর্টশাহজালাল/কেএসকে