খেলাধুলা

বৈশাখের তাপের মুখে শান্তর প্রশান্তি দেওয়া সেঞ্চুরি

অঘোষিত ফাইনাল, জিতলেই সিরিজ জয়। এমন ম্যাচে মানসিক চাপটা থাকে প্রবল। এর মধ্যে টস হেরে ব্যাটিং করতে নেমে প্রথম ২.১ ওভারে ফিরে যান দুই ওপেনার। বলও পুরোনো হয়নি, ৪ নম্বর ব্যাটার নাজমুল হোসেন শান্তকে নামতে হলো ব্যাটিংয়ে। কিছুক্ষণ পর হারিয়ে ফেলেন সৌম্য সরকারকেও। এরপর শুরু হলো যুদ্ধ, যেখানে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের সঙ্গে বৈশাখের প্রচন্ড দাবদাহও ছিল অন্যতম প্রতিপক্ষ। শান্ত অবশ্য গরমকে হার মানিয়েছেন, লিটনকে সঙ্গী করে গড়েছেন ম্যারাথন জুটি। দুজনে মিলে বাংলাদেশকে শুধু বিপর্যয় থেকেই রক্ষা করলেন এমনটা নয়, এনে দেন লড়াইয়ের মতো পুঁজিও। লিটন না পারলেও শান্ত ছুঁয়েছেন তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার। দুজনের লম্বা ইনিংস খেলা দলকে শুধু বিপদ থেকেই বাঁচালো না, মিডল অর্ডার নিয়ে সব চিন্তার পরিমাণটাও কিছুটা কমালো।

Advertisement

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস হেরে আগে ব্যাটিং করে ২৬৫ রান করে বাংলাদেশ। যেখানে শান্তর ব্যাট থেকে আসে ১১৯ বলে ১০৫ রান আর লিটন করেন ৯১ বলে ৭৬। চতুর্থ উইকেটে দুজন মিলে গড়েন ১৬৫ রানের জুটি। যা কিনা বাংলাদেশের মোট দলীয় রানের ৬২.২৬ শতাংশ।

চট্টগ্রামের এই স্টেডিয়াম সাগর থেকে মাত্র ৫–৭ কিলোমিটার দূরে। ফলে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ সবসময়ই বেশি। তার ওপর বৈশাখের প্রচণ্ড দাবদাহ, তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি বা কখনো তারও বেশি। এমন আবহাওয়ায় কয়েকবার সিঁড়ি ভেঙে ওঠানামা করলেও ক্লান্তি আসে সহজেই। সেখানে শান্ত ও লিটন মিলে ব্যাটিং করেছেন ১৩৮ মিনিট, অর্থাৎ ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিট। শান্ত নিজে ক্রিজে ছিলেন আরও বেশি সময় ১৮৬ মিনিট, ৩ ঘণ্টারও বেশি।

শুরুর দিকে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে বাউন্ডারি বের করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। ৩০ গজের মধ্যে বেশিরভাগ ফিল্ডার রেখে ব্যাটারদের চাপে রাখার কৌশল নেয় কিউইরা। তাই ইনিংস গড়তে হয়েছে ধৈর্য ধরে। শান্ত তার ১১৯ রানের ইনিংসে ৪১টি সিঙ্গেল ও ৫টি ডাবল নেন। অন্যদিকে ১৩৮ মিনিট ব্যাটিং করা লিটন ৪৬টি সিঙ্গেল ও ৫টি ডাবল নিয়েছেন। শান্ত ডট দিয়েছেন ৫৯ বল, আর লিটন ৪৪ বলে কোনো রান করতে পারেননি।

Advertisement

এই তাপমাত্রায় ব্যাটিং করা কতটা কঠিন সেটা অবশ্য শান্তর সেঞ্চুরি উদপাপনেও দেখা গেছে। এমনিতে আগের সব সেঞ্চুরিতে দেখা গেছে শূন্যে লাফিয়ে উদযাপন করেন তিনি। তবে এদিন কেবল ব্যাট আর হেলমেট উঁচু করলেন, এরপর আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দিলেন সেজদাহ।

বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। প্রথম বলেই খোঁচা মেরে আউট হন সাইফ হাসান। এক ওভার পর ভেতরের অংশে লেগে বোল্ড হন আরেক ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। তৃতীয় উইকেটে শান্তকে নিয়ে কিছুটা আশার আলো জ্বালিয়েছিলেন সৌম্য সরকার। কিন্তু কয়েকটি ভালো শট খেলার পর তিনিও একইভাবে বোল্ড হয়ে ফেরেন। তখন বাংলাদেশের স্কোর ৩২ রানে ৩ উইকেট।

সেখান থেকেই শুরু শান্ত ও লিটনের লড়াই। দুজনই বেশ কিছুদিন ধরে রানখরায় ভুগছিলেন। শান্ত গত ম্যাচেই ১৩ ইনিংস পর ওয়ানডেতে ফিফটি করেছিলেন। আর লিটনের শেষ ওয়ানডে ফিফটি ছিল ২০২৩ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে। দলের কঠিন মুহূর্তে তাই দায়িত্বটা এসে পড়ে তাদের কাঁধেই। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়ানডেতে ব্যর্থতার জন্য মিডল অর্ডারকেই দায় দেওয়া হচ্ছে। সেই সমস্যা কাটাতে ওপেনিং থেকে মিডলে ফেরানো হয়।

টপ অর্ডারের ব্যর্থতায় এদিন খারাপ সময় কাটানো মিডল অর্ডারই দায়িত্ব নিয়েছে। শুরুর ধাক্কা খাটিয়ে ১৪তম ওভারে ফিফটি পূর্ণ হয় বাংলাদেশের। শুরুতে একের পর এক কিউই পেসারদের দুর্দান্ত সব ডেলিভারি সামাল দিতে হয়েছে লিটন ও শান্তকে। দলের প্রথম ৫০ রানের মধ্যে ২৬ রানই এসেছে বাউন্ডারি থেকে। ‘অতিরিক্ত’ থেকে এসেছে আরও ৪ চার। বাকি ২০ রান দৌঁড়ে নিয়েছেন ব্যাটাররা।

Advertisement

২৭তম ওভারে ব্যক্তিগত ৭০ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন শান্ত। ফিফটির পর অবশ্য নিয়মিত বাউন্ডারি বের করতে থাকেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। শুরু থেকে উইকেটে আকড়ে থাকায় মনোযোগ দেওয়া লিটন ফিফটি পূর্ণ করেন ৩৩তম ওভারে। ৭১ বলে ফিফটি করার পথে তার ব্যাট থেকে আসে মাত্র ২ চার। দলের এদিন যে শুরু ছিল, তাতে শান্তর ব্যাট থেকে শুধু ফিফটিই যথেষ্ট ছিল না। শান্ত সেই চাহিদাও মিটিয়েছেন, করেছেন দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে দুই ব্যাটার তখন ইনিংস বড় করে ফেলেছেন। শেষদিকে প্রয়োজন ছিল আগ্রাসী খেলে দলের পুঁজিটাকে যত সম্ভব বড় করা। সেখানেই ব্যর্থ তারা। ৯ ইনিংস ধরে হাফ সেঞ্চুরি না পাওয়া লিটনের সামনে সুযোগ ছিল নিজের সেঞ্চুরির সংখ্যাটা বাড়িয়ে নেওয়ার। সর্বশেষ ৫১ ইনিংস আগে সেঞ্চুরি পাওয়া লিটন ‘মনোযোগ’ হারিয়ে ফিরলেন কিছুটা আক্ষেপ বাড়িয়ে। এক ওভার আগেই দারুন দৃষ্টিনন্দন শটে ছক্কা ও চার আদায় করা লিটন জেডেন লেনক্সের বল স্টাম্প ছেড়ে বেরিয়ে যান, এরপর বলের লাইন মিস করে হন বোল্ড।

লিটন মিস করলেও সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন শান্ত। লেনক্সের করা ৪১ তম ওভারের শেষ বলে লং অনে সিঙ্গেল নিয়ে ওয়ানডেতে নিজের চতুর্থ সেঞ্চুরি তুলে নিলেন তিনি। ২০ ইনিংস পর এই সংস্করণে সেঞ্চুরির দেখা পেলেন শান্ত। এর আগে ওয়ানডেতে এই বাঁহাতি ব্যাটারের সর্বশেষ সেঞ্চুরি ছিল ২০২৪ সালে। চট্টগ্রামের এই মাঠেই ২০২৪ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১২২ রানের ইনিংস খেলেন শান্ত। ওয়ানডেতে শান্তর চার সেঞ্চুরির মধ্যে প্রথম দুটি বিদেশের মাটিতে। পরের দুটি দেশের মাটিতে।

এর আগে, শান্তর ইনিংসে যদি খুঁত খোজা হয় পাওয়া যাবে কেবল একটি! ১৪তম ওভারে বাউন্সার ডেলিভারি ডিপ ফাইন লেগে খেলেছিলেন শান্ত, সেটি ফিল্ডারের হাতে লাগলেও ছক্কা হয়ে যায়। এছাড়া বাকি পুরো ইনিংসেই শান্ত দেখিয়েছেন দলের বিপদে কিভাবে ওয়ানডেতে ব্যাটিং করতে হয়, আরও বলা ভালো কিভাবে সেঞ্চুরি করতে হয়। যদিও লিটন শান্ত আউট হওয়ার পর আবার মুখ থুবড়ে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন আপ। শেষ ৭ ওভারে মাত্র ৪৪ রান জমা হয় টাইগারদের স্কোরবোর্ডে।

শান্ত-লিটনের এই জুটি বাংলাদেশ দলকে অনেক স্বস্তি দেবে। সাম্প্রতিক সময়ে মিডল অর্ডারের ব্যর্থতা টাইগারদের ভাবাচ্ছিল। সেখানে শান্ত ও লিটনের এমন জুটি টিম ম্যানেজমেন্টের চিন্তা কমাবে স্বাভাবিকভাবেই। তার চেয়েও বড় কথা, দুজনের ফর্মে ফেরাটা দলের জন্য দারুণ ইতিবাচক বার্তা। শুধু রান করাই নয়, দুজনই খেলেছেন লম্বা ইনিংস, যা বাংলাদেশের ওয়ানডে ব্যাটিংয়ে দীর্ঘদিন ধরেই খুব প্রয়োজন ছিল।

এসকেডি/আইএন