অর্থনীতি

তিন লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন ব্যয়ে বৈদেশিক ঋণ লাখ কোটিরও বেশি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বা উন্নয়ন ব্যয়ের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ কোটি টাকা। ফলে গত বছরের তুলনায় এডিপির আকার বেড়েছে ৫০ শতাংশ। নতুন এডিপিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে।

Advertisement

২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে এডিপি বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২০ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। ফলে এক অর্থবছরের ব্যবধানে খাতটিতে এডিপি বরাদ্দ বাড়ছে ৯ হাজার কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা সংস্থান করা হবে।

তবে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এডিপির আকার ‘বাস্তবায়নযোগ্য নয়’ দাবি করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, ‘একটা প্রেক্ষাপটের আচমকা পরিবর্তন ঘটেছে। বাজেট যে প্রেক্ষাপটে দেওয়া হয়েছে তার গুরুত্ব বিবেচনার বিষয়। ওভারঅল বাজেট কত হওয়া উচিত, এডিপির আকার কত হওয়া উচিত—এগুলো বিবেচনার বিষয়।’

Advertisement

তিনি বলেন, ‘একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্বল প্রবৃদ্ধি। যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাড়ছে। বাইরের একটা শকড আছে। এর সঙ্গে আমাদের খাপ খাওয়াতে হবে। প্রথম কথা হলো—এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ী হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। কতটা সাশ্রয়ী হতে হবে, কীভাবে সাশ্রয়ী হতে হবে তা সময়ের দাবি। সবকিছু বিবেচনায় বাজেটের এই আকার মিলছে না, এডিপির আকার মিলছে না।’

আরও পড়ুন৮ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন ৩০%, টাকার অঙ্কে পাঁচ বছরে সর্বনিম্নইরান যুদ্ধে জ্বালানি শেষ হওয়া প্রথম দেশ হতে পারে বাংলাদেশভ্যাট থেকেই ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনা

পরিকল্পনা মন্ত্রণায় জানায়, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বরাবরের মতো এবারও বেশি বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, ৩৬ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ প্রায় ৩২ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ পেয়েছে প্রায় ১৯ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ী হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। কতটা সাশ্রয়ী হতে হবে, কীভাবে সাশ্রয়ী হতে হবে তা সময়ের দাবি। সবকিছু বিবেচনায় বাজেটের এই আকার মিলছে না, এডিপির আকার মিলছে না।—অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন

Advertisement

এছাড়া আসন্ন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রায় ১৬ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রায় ১৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় প্রায় ১১ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রায় ৯ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা আর কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে সরকার দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দিয়েছিল। তবে পরে তা সংশোধন করে দুই লাখ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এর মধ্যে এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা ছিল অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ৭২ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক সহায়তা থেকে।

এডিপি বাস্তবায়নের জন্য কিছু কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে অন্যতম—মধ্যমেয়াদি সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্প গ্রহণ, বৃহৎ প্রকল্পের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রকল্প বাস্তবায়ন মনিটরিং জোরদার এবং প্রকল্প ঋণের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালকদের দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং বাজেট বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।

৮ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন ৩০%, টাকার অঙ্কে ৫ বছরে সর্বনিম্নবৈশ্বিক সংকটে অর্থনৈতিক অস্থিরতা সামাল দিতে সরকারের ব্যয়সাশ্রয়ী নীতির প্রভাব পড়েছে প্রকল্পের অগ্রগতিতে। যে কারণে চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে বা আট মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩০ দশমিক ৩১  শতাংশ। টাকার অঙ্কে যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। 

 

চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ৬৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা মূল এডিপির ৩০ দশমিক ৩১ শতাংশ—আইএমইডির তথ্য

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ৬৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা মূল এডিপির ৩০ দশমিক ৩১ শতাংশ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের আলোচ্য সময়ে ২৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ বা ৬৭ হাজার ৫৫৩ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ বা ৮৫ হাজার ৬০২ কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল।

এরও আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরের আলোচ্য সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হার ৩৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে ৮২ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৮ দশমিক ৬০ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল, টাকার হিসাবে যা ছিল ৮৪ হজার ৭৬৫ কোটি টাকা। ফলে গত পাঁচ বছরের মধ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে কম টাকা খরচ করা হয়েছে।

গত আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১০ শতাংশও এডিপি বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

আরও পড়ুনসুদ-ভর্তুকিতে যাবে বাজেটের বড় অংশ, বাড়বে ঋণের চাপআইএমএফের শর্তে রাজস্বে চাপ, আসছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটির বাজেট৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আলোচ্য সময়ে জননিরাপত্তা বিভাগে এডিপি বাস্তবায়ন হার ৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে ৭ দশমিক ৫১ শতাংশ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ ও সংসদ সচিবালয় বিভাগের বাস্তবায়ন হার শূন্য শতাংশ।

আইএমএফ আমাদের বাজেট সাপোর্টের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে এডিপি-জাইকা থেকেও বাজেট সাপোর্ট মিলিবে কি না সন্দেহে। তাই বলবো, এডিপির আকার সময়োপযোগী নয়, এমনকি বাস্তবায়নযোগ্যও নয়

চলতি অর্থবছরে ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের গত আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এডিপি বাস্তবায়ন ৩০ শতাংশ। ফলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে অর্থবছরের সামনের মাত্র চার মাসে বাকি ৭০ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করতে হবে।

সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, ‘এডিপিতে আমরা সাশ্রয়ী না হয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ এডিপি দিচ্ছি। গ্যাস-সারের দাম বেড়েছে, ভর্তুকি বাড়ছে—কিন্তু রাজস্ব আহরণ বেশ দুর্বল, অর্থনীতিও দুর্বল। তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে অর্থায়ন থাকতে হবে। অথচ সাশ্রয়ের বড় জায়গা এডিপি।’

‘এ মুহূর্তে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ভাবতে হবে—কোন কাজটা না করলে নয়, কোন কাজটা বাদ দিতে হবে, কোন খাতে ব্যয় কমাতে হবে। আইএমএফ আমাদের বাজেট সাপোর্টের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে এডিপি-জাইকা থেকেও বাজেট সাপোর্ট মিলিবে কি না সন্দেহে। তাই বলবো, এডিপির আকার সময়োপযোগী নয়, এমনকি বাস্তবায়নযোগ্যও নয়’—যোগ করেন এ অর্থনীতিবিদ।

এমওএস/এমকেআর