লাইফস্টাইল

সাধারণ জ্বর নাকি ম্যালেরিয়া, বুঝবেন কীভাবে?

একসময় ম্যালেরিয়া ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ এক মহামারি রোগ। চিকিৎসা ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে আজ এই রোগের ভয়াবহতা অনেকটাই কমেছে। তবুও এই রোগ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। এখনো বিশ্বের বহু অঞ্চলে ম্যালেরিয়া একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবই অনেক ক্ষেত্রে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। তাই প্রতি বছর ২৫ এপ্রিল বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস পালন করা হয়, যাতে মানুষ এই রোগ সম্পর্কে সচেতন হয় এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়।

Advertisement

এই বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘ম্যালেরিয়া নির্মূলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ: এখন আমরা পারি, এখন আমাদের করতেই হবে’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। অর্থাৎ ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও উপায় রয়েছে, এখন দরকার সঠিক প্রয়োগ ও সম্মিলিত উদ্যোগ।

ম্যালেরিয়া কী এবং কীভাবে ছড়ায়?

ম্যালেরিয়া একটি পরজীবীজনিত সংক্রামক রোগ, যা প্লাজমোডিয়াম নামক পরজীবীর মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমিত স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ের মাধ্যমে এই জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। মশাটি যখন কোনো আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ায়, তখন তার শরীর থেকে জীবাণু সংগ্রহ করে এবং পরে অন্য কাউকে কামড়ানোর সময় সেই জীবাণু নতুন শরীরে ছড়িয়ে দেয়।

এছাড়া বিরল ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে বা গর্ভাবস্থায় মা থেকে শিশুর শরীরেও এই রোগ সংক্রমিত হতে পারে। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই রোগ বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে এর প্রাদুর্ভাব তুলনামূলক বেশি।

Advertisement

সাধারণ জ্বর নাকি ম্যালেরিয়া বোঝার উপায়

ম্যালেরিয়ার শুরুটা অনেক সময় সাধারণ জ্বরের মতোই মনে হয়। হালকা জ্বর, ঠান্ডা লাগা, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, অরুচি বা ক্লান্তি, এসব লক্ষণ অনেকেই গুরুত্ব দেন না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষণগুলো তীব্র হয়।ম্যালেরিয়ার অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো নির্দিষ্ট বিরতিতে কাঁপুনি দিয়ে উচ্চ জ্বর ওঠা, যা ১০৫-১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। জ্বরের সঙ্গে প্রচণ্ড ঘাম হয় এবং জ্বর নেমে যাওয়ার পর শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর আবার নির্দিষ্ট সময় পর জ্বর ফিরে আসে।

এছাড়া বমি ভাব, পেটব্যথা, খিঁচুনি, অনিদ্রা, রক্তশূন্যতা এবং যকৃৎ ও প্লীহা বড় হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে। রোগের তীব্রতা বাড়লে রক্তের লোহিত কণিকা ভেঙে যেতে থাকে, যা জীবনঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন:বেশি খেলেও কেন ওজন বাড়ে না পানিশূন্যতায় কি ব্লাড সুগার বেড়ে যায়  যেসব লক্ষণ অবহেলা করা ঠিক নয়

অনেকেই শুরুতে ম্যালেরিয়ার লক্ষণকে সাধারণ ফ্লু ভেবে অবহেলা করেন। হালকা জ্বর বা শরীর ব্যথা হলে নিজে নিজে ওষুধ খেয়ে ফেলন কিন্তু এতে রোগ জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই কয়েকদিন ধরে জ্বর থাকলে বা কাঁপুনি দিলে দেরি না করে রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত। এছাড়া বারবার বমি হওয়া, খেতে না পারা,অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি বা শ্বাসকষ্ট হলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

প্রতিরোধের উপায়

ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। দিনে বা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। ঘরের আশপাশে কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে, কারণ জমে থাকা পানিতে মশা বংশবিস্তার করে।

Advertisement

ফুলের টব, খালি ড্রাম, ড্রেন বা জলাবদ্ধ জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি। প্রয়োজনে কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। দরজা-জানালায় মশারোধী জাল লাগানো এবং বাইরে গেলে মশা প্রতিরোধক ক্রিম বা স্প্রে ব্যবহার করাও ভালো অভ্যাস।

চিকিৎসা ও পরবর্তী যত্ন

ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় অ্যান্টি-ম্যালেরিয়া ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যা রোগের ধরন অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসা শুরু করার পর লক্ষণ কমে গেলেও পুরো ওষুধের কোর্স শেষ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করে দেন, যা রোগকে আবার ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে উঠতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা জরুরি। শরীরের শক্তি ফিরে পেতে পানি ও পুষ্টির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ম্যালেরিয়া একটি গুরুতর হলেও প্রতিরোধযোগ্য ও নিরাময়যোগ্য রোগ। সময়মতো পরীক্ষা, সঠিক চিকিৎসা এবং সচেতনতা থাকলে এই রোগ থেকে সহজেই রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এনডিটিভি ও অন্যান্য

এসএকেওয়াই