দেশজুড়ে

খালেদা জিয়ার দেওয়া বিচারের আশ্বাস পূরণের দাবি নিহতদের স্বজনদের

সাড়ে ৭ বছর ধরে আপিল বিভাগে ঝুলছে মামলা জজকোর্ট ও হাইকোর্টে বিচার হয় প্রথম সাড়ে তিন বছরে হতাশা ও আতঙ্কে কাটছে স্বজনদের জীবন

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল। নারায়ণগঞ্জ আদালত থেকে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লা অংশ থেকে অপহৃত হন সিটি করপোরেশনের (নাসিক) ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, নজরুল ইসলামের আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও আইনজীবীর গাড়িচালক মো. ইব্রাহিম। এরপর ৩০ এপ্রিল ছয়জনের ও ১ মে একজনের মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দরের শান্তির চরে ভেসে ওঠে। পরে সেগুলো উদ্ধার করে পুলিশ।

Advertisement

পরবর্তীতে এই ঘটনায় নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের জামাতা বিজয় বাদী হয়ে ফতুল্লা থানায় আলাদা দুটি মামলা করেন।

ওই দুই মামলায় ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ দায়রা জজ আদালত অপরাধীদের ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ নেতা ও নাসিক ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‍্যাব-১১ এর চাকরিচ্যুত সাবেক অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানাসহ বাকিরা।

আরও পড়ুন- জমিদারের মতোই সাম্রাজ্য চালাতেন নূর হোসেনসাত খুন : কার কী সাজাসাত খুন মামলার চার্জশিট মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণফাঁসির ইতিহাসে সাত খুন দ্বিতীয়, শীর্ষে বিডিআর বিদ্রোহ

Advertisement

সাজা প্রদানের পর আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত ২০১৮ সালের ২২ আগস্ট মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তের সংখ্যা কমিয়ে ১৫ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড আদেশ বহাল রাখেন এবং অন্যান্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেন। এরপর থেকে প্রায় সাড়ে ৭ বছর ধরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় আটকা পড়ে রয়েছে মামলা দুটি।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় অপহরণ করে অমানবিকভাবে একে একে সাতটি তাজা প্রাণ কেড়ে নেয় সংঘবদ্ধ খুনির দল। এতে হত্যার শিকার মানুষগুলোর পরিবারে নেমে আসে অন্ধকারের ছায়া। হারানো স্বজনদের ফিরে না পেলেও অন্তত ন্যায়বিচারের আশায় একযুগ ধরে আদালত প্রাঙ্গণে ঘুরছে পরিবার। বছরের পর বছর বিচারের অগ্রগতি না পেয়ে হতাশ হয়ে যাচ্ছেন নিহতদের স্বজনরা। পাশাপাশি লোকমুখে প্রধান আসামি নূর হোসেনের জামিনে মুক্তি পাওয়ার কথা শুনে আতঙ্কে জীবনযাপন করছেন বলেও জানিয়েছেন তারা।

নৃশংস হত্যার শিকার তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের বলেন, বছর আসে, বছর যায়। কিন্তু সরকার কোনো কার্যকর ভূমিকা নেয় না। মামলার প্রথম সাড়ে তিন বছরে আমরা হাইকোর্টের রায় পর্যন্ত শেষ করতে পেরেছিলাম। এরপর সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে কাগজ পড়ে আছে। এখন আমরা এমনটাই ভাবি যে, যারা নিহত হয়েছেন তারাতো কেউ বিত্তবান না এবং তাদের মধ্যে একজন ব্যতীত অন্যদের রাজনৈতিক ক্ষমতাও ছিল না। অথচ আসামিপক্ষের প্রত্যেকে টাকাওয়ালা, ক্ষমতাবান। তাই হয়ত আমাদের বিচার ঢিলা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমাদের এই ঘটনার কিছুদিন পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর (তারেক রহমান) মা বেগম খালেদা জিয়া এখানে এসে মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন ‘আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না, আমরা (বিএনপি) ক্ষমতায় গেলে সর্বপ্রথম এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করবো। তাই আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমানে তিনি (বেগম জিয়া) জীবিত না থাকলেও তার দল ক্ষমতায় রয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার মায়ের দিয়ে যাওয়া কথা বিবেচনায় আমাদের বিচারটা শেষ করবেন।

Advertisement

তাজুলের ছোট ভাই রাজু আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগের নূর হোসেনের ছয় কোটি টাকায় সাত খুন করে র‍্যাব। হত্যাকাণ্ডের এক যুগ পার হলেও আমরা বিচার পাইনি। রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি পরিবর্তন হয়, অ্যাটর্নি জেনারেল পরিবর্তন হয় কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানও পরিবর্তন হয়। অথচ হত্যাকাণ্ডের ১২ বছর অতিবাহিত হলেও আমরা বিচার পাই না। এতে আমরা হতাশ হই।

তিনি বলেন, তৎকালীন বিরোধীদলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়া ঘটনার পরপর আমাদের এখানে এসে আমাদের প্রত্যেকটা পরিবারের মাথায় হাত রেখে ওয়াদা করেছিলেন যে বিএনপি ক্ষমতা গেলেই সর্বপ্রথম আমাদের বিচারের পদক্ষেপ নিবেন। বেগম জিয়া মৃত্যুবরণ করায় তারেক রহমান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। তারেক রহমান সাহেবও আমার মতো একজন ভাইহারা মানুষ। তিনি নিজের ভাইয়ের জানাজায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তাই আমি একজন ভাইহারা হিসেবে তারেক রহমানের কাছে অনুরোধ করবো, সাত খুনের বিচারটা যেন দ্রুত কার্যকর হয় এবং যেসব আসামিরা এখনো ধরা পড়েনি তাদের দ্রুত গ্রেফতার করা হয়।

নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, আমাদের মতো গোটা দেশের মানুষ হত্যার বিচারের অপেক্ষায় বসে আছে। কী রায় দেন এটা সবার দেখার ইচ্ছা। আমাদের সাতটা পরিবার প্রতিনিয়ত কাঁদে। আমাদের যা হারানোর সেটাতো হারিয়ে ফেলেছি, এখন শুধু বসে আছি আল্লাহ তাআলা যেন বিচারটা দেখান। জজকোর্ট আর হাইকোর্টের রায় দেখে আমরা ভেবেছিলাম বিচারটা দ্রুত পেয়ে যাবো। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে এ রায় কী কারণে ঝুলে আছে তা জানি না। এখানে তো আমাদের হাতে কিছু নেই, সবকিছু সরকারের ওপর নির্ভর করে। তারা চাইলেই বিচারটা হয়। আমরা সবসময় ভয়ে থাকি। কারণ মানুষ এখন বলে নূর হোসেন বেরিয়ে আসবে। যদি নূর হোসেন আসে তাহলে সে আমাদের ওপর প্রতিশোধ নিবে। কারণ আমরা এই মামলার জন্য যুদ্ধ করে গেছি। হতাশায় ভুগি আদৌ বিচারটা হবে কি না।

বিউটি বলেন, আমরা সরকারের দিকে তাকিয়ে আছি। কারণ হত্যার পর বেগম খালেদা জিয়া আমার বাসায় এসে আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি কখনো ক্ষমতায় গেলে আমাদের ন্যায়বিচার দিবেন। আমরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে অনুরোধ করি, তার মায়ের ওয়াদা যেন তিনি রক্ষা করেন।

এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান জাগো নিউজকে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সংঘটিত সাতখুন মামলার হাইকোর্ট পর্যন্ত বিচার কার্যক্রম শেষ হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে জনগণের চাপে পড়ে সরকার রায় দিতে বাধ্য হয়েছিল। খুনিরা প্রত্যেকে স্বৈরাচার দলীয় হওয়াতে হাইকোর্টের পর বিচার কার্যক্রম আটকে রয়েছে। তাদের লোকজনকে বাঁচানের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ফাইল ফেলে রাখা হয়েছিল। স্বৈরাচার সরকারের আমলে সাতখুন মামলার ফাইল আদালতে ওঠানোর সিরিয়াল পাওয়া যায়নি। আমরা ভেবেছিলাম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রায়টা পেয়ে যাবো এবং তার জন্যে আমরা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগও করেছিলাম। কিন্তু বিচারটা শেষ হয়নি।

তিনি বলেন, আমরা বর্তমান সরকারের আমলে এই বিচার কার্যক্রম শেষ করার জন্য যোগাযোগ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ ন্যায়বিচার আমরা পাবো।

এফএ/জেআইএম