সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত অফিসে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। তবে সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অনেকেই এ নির্দেশনা মানছেন না।
Advertisement
সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে শুরু করে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার অনেক কর্মকর্তা ওই সময়েও নিজ নিজ অফিস কক্ষে উপস্থিত ছিলেন না। যাদের কক্ষে পাওয়া যায়নি, তাদের বেশিরভাগই তখনো অফিসে আসেননি, কেউ ছুটিতেও ছিলেন না। আবার কেউ কেউ উপস্থিত থাকলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কক্ষে অবস্থান করছিলেন।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ে কারা অফিসে আসছেন বা আসছেন না, তা নিয়মিতভাবে তদারকি করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। এ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি নিয়মিত সচিবালয়ে অফিস করছেন। তিনি সকাল ৯টার মধ্যেই সচিবালয়ে হাজির হন।
Advertisement
সেবাগ্রহণকারী নাগরিকদের সুবিধা, প্রশাসনিক গতিশীলতা এবং আন্তঃদপ্তর সমন্বয় বাড়াতে গত ২ মার্চ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত অফিসে বাধ্যতামূলকভাবে অবস্থান করতে হবে বলে একটি পরিপত্র জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। যদিও কাছাকাছি সময়ে এর আগে ২০২১ ও ২০১৯ সালে এ বিষয়ে পরিপত্র জারি করেছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কিন্তু, তখনও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ নির্দেশ খুব একটা মানতে দেখা যায়নি।
‘আমরা সময় মতোই অফিসে আসি। তবে অনেক সময় ট্রেনিং থাকে। আবার স্যাররা ডাকলে সেখানে যেতে হয়। আজ আমার একটি ট্রেনিং ছিল। তাই আমি ছিলাম না।’— মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্মসচিব প্রশাসন অধিশাখা মো. আসাদুজ্জামান
কোনো কোনো কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী সকালে সময় মতো অফিসে আসেন। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরাও বেশির ভাগ আসেন। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে আগের মতো গাছাড়া ভাবটা হয়তো নেই। কিন্তু, এখনও অনেকের নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসা ও অবস্থান করার ক্ষেত্রে গাফিলতি আছে।
কর্মকর্তাদের নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসা ও অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জাগো নিউজকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। তবে কর্মকর্তাদের উপস্থিতির বিষয়ে আমাদেরও মনিটরিং আছে। কাউকে ফোন দেওয়া হয়, কাউকে ভিডিও কল করা হয়।’আরও পড়ুনঅফিসে অবস্থান-জ্বালানি সাশ্রয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১১ নির্দেশনাসংসদ ভেঙে দিতে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবীর১১ অধিদপ্তর-সংস্থায় নতুন ডিজি, ৩ কর্তৃপক্ষে চেয়ারম্যান
Advertisement
তিনি বলেন, ‘এখন যে পরিস্থিতি তাতে তো সবাই সময় মতো চলে আসে। তবে দু-একজনের সমস্যা হতে পারে। যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। সেটা তো বিবেচনায় নিতে হয়।’
মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত সচিবালয়ের নতুন ১ নম্বর ভবনে থাকা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ৪২৫ নম্বর কক্ষে যুগ্ম সচিব (প্রশাসন অধিশাখা) মো. আসাদুজ্জামান, ৬০৫ নম্বর কক্ষে যুগ্মসচিব (প্রকল্প ও গবেষণা অধিশাখা) শেখ নূর মোহাম্মদ, ৬১৯ নম্বর কক্ষে যুগ্মসচিব (মন্ত্রিসভা অধিশাখা) মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম, ৮০৫ নম্বর কক্ষে যুগ্ম সচিব জিয়াউল হক, ১১১৪ নম্বর কক্ষে যুগ্মসচিব (উন্নয়ন অভিলক্ষ বাস্তবায়ন ও সমন্বয় অধিশাখা) ফারহানা হায়াত, ১১১৫ নম্বর কক্ষের যুগ্মসচিব (কর্মসম্পাদন নীতি ও মূল্যায়ন অধিশাখা) এস এম ফেরদৌসকে পাওয়া যায়নি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনেক উপসচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিবের কক্ষও ফাঁকা দেখা গেছে।
একই ভবনে (১ নম্বর ভবন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও অফিস করেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৮০১ নম্বর কক্ষে অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. রাহেদ হোসেন, ১৫০৫ নম্বর কক্ষে যুগ্ম সচিব মো. তৌফিক ইমাম, ১৮১৭ নম্বর কক্ষে যুগ্মসচিব (বাজেট ব্যবস্থাপনা অধিশাখা) ড. মো. ফরিদুর রহমান, ১৫১৯ নম্বর কক্ষে যুগ্মসচিব আবুল হায়াত মো. রফিককে পাওয়া যায়নি।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ১২৭ নম্বর কক্ষে বসেন অতিরিক্ত সচিব শাহ্ আবদুল আলীম খান। তাকেও সময় মতো অফিসে পাওয়া যায়নি।
ফোনে অফিসে না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব প্রশাসন অধিশাখা মো. আসাদুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা সময় মতোই অফিসে আসি। তবে অনেক সময় আমাদের ট্রেনিং থাকে। আবার স্যারেরা ডাকলে তাদের ওখানে থাকতে হয়। আজকে আমার একটি ট্রেনিং প্রোগ্রাম ছিল। তাই আমি ছিলাম না।’
‘সাবেক ড. সা’দত হুসাইন ও এম কে আনোয়ারের মতো মন্ত্রিপরিষদ সচিবদের নির্দেশ সহজেই প্রতিপালিত হতো। এখন অনেক কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নিজেদের মন্ত্রিপরিষদ সচিবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, ফলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের নৈতিকতার অবনতি ও সরকারের মনিটরিংয়ের ঘাটতিও রয়েছে।’— সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার
এ বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে ড. সা'দত হুসাইন, এম কে আনোয়ারসহ অনেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন। তাদের নামের ওজনটাই এমন ছিল তাদের আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিপালন হতো। এখন তো আর কেউ কাউকে মানে না। এখন কোনো কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক সংযোগের কারণে মনে করে সে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের চেয়েও বড়। এ কারণে আর কেউ কাউকে মানে না। কর্মকর্তাদের নীতি-নৈতিকতাও অনেক নিচে নেমে গেছে। আর সরকারের মনিটরিংও নেই। মন্ত্রিপরিষদ সচিবদেরও ভারিক্কিও আর সেই রকম নেই।
তিনি বলেন, ‘এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য তদারকি জোরদার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট করতে হবে। সবার আগে সচিবদের নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসা নিশ্চিত করতে হবে। কেউ নির্ধারিত সময়ে অফিস না করলে এ দায়ভার সচিবের ওপর ন্যস্ত করতে হবে। কোনো সচিব এক্ষেত্রে গাফিলতি করলে ওএসডি করে দিতে হবে। তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যাবে।’
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০০৩ সালে ড. সা'দত হুসাইন যখন মন্ত্রিপরিষদ সচিব তখন প্রথম অফিসে আসা ও অবস্থানের বাধ্যবাধকতা নিয়ে আদেশ জারি করা হয়। তখন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিজে এ বিষয়টি তদারকি করছেন। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের বিভিন্ন দপ্তর সংস্থা ভাগ করে দিয়েছিলেন মনিটরিংয়ের জন্য। যাদের দায়িত্ব দিতেন তারা প্রতিদিন খোঁজখবর নিতেন। কোথাও অনিয়ম পেলে সা'দত হুসাইনকে জানাতেন। তখন এ নির্দেশনা কার্যকর ছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে এ নির্দেশনাটি কর্মকর্তাদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।আরও পড়ুনরাজস্ব না দেওয়া চা বাগান দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশবিদ্যুৎ চাহিদা অনেক বেড়েছে, জ্বালানি সংকটও অসহনীয় পর্যায়েফরিদপুর ও শেরপুরে নতুন ডিসি
গত ২ মার্চ এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে আগমনকালে পথিমধ্যে দাপ্তরিক বা ব্যক্তিগত বিভিন্ন কর্মসূচিতে (যেমন- সেমিনার, ওয়ার্কশপ, সিম্পোজিয়াম, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে অতিথি বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ, ব্যাংক/হাসপাতাল/বিদ্যালয়ে গমন ইত্যাদি) সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকেন না। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে জনসাধারণ ও অন্যান্য দপ্তরের প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ব্যাহত হয়; যা নাগরিক সেবা প্রদান, প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি এবং সরকারের ভাবমূর্তির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
এ অবস্থায়, সেবাগ্রহণকারী নাগরিকদের সুবিধা, প্রশাসনিক গতিশীলতা ও আন্তঃদপ্তর সমন্বয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত আবশ্যিকভাবে নিজ অফিস কক্ষে অবস্থান করবেন। দাপ্তরিক কর্মসূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এ সময়সীমা বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক থাকবেন বলে পরিপত্রে জানানো হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, ‘সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯’ এবং ‘সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪’ অনুযায়ী সব সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ে নিজ দপ্তরে উপস্থিতি ও প্রস্থান নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
তবে কিছু ক্ষেত্রে এ বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য হবে না যেমন-
• শিক্ষা/প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত নন এমন শিক্ষক/অনুষদ সদস্যরা।
• হাসপাতাল, জেলখানা, সংবাদ বা নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে রোস্টার ডিউটিতে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
• জরুরি গ্রাহকসেবা প্রদানে সরাসরি সম্পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
• মাঠপর্যায়ে নিয়মিত দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সমরূপ সংস্থার সদস্যরা।
এছাড়া ভিভিআইপি/ডিআইপি প্রোটোকল প্রদান, আকস্মিক বৃহৎ দুর্ঘটনা মোকাবিলা, উন্নয়ন সহযোগী বা কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে অতি গুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশগ্রহণ এবং অনুমোদিত সরকারি সফরের ক্ষেত্রে।
কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবেন না। কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে দাপ্তরিক কাজ ছাড়া অফিস সময়ে নিজ দপ্তর ত্যাগ করতে পারবেন না বলেও ওই পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিতি ও অফিস ত্যাগের নির্দেশনা দিয়ে সব দপ্তরে আরেকটি চিঠি পাঠায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
আরএমএম/এমএএইচ/এএসএম