আন্তর্জাতিক

যুদ্ধের আগুনে পোড়েনি মানবতা, নার্স সালিমি গেয়েছেন জীবনের জয়গান

১ মার্চ ২০২৬, সকাল ১১টা ৪০ মিনিট। তেহরানের খাতাম-আল-আনবিয়া হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ড। সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুদের এই সংঘাতপূর্ণ পৃথিবীতে আগমনের এক ঘণ্টাও পূর্ণ হয়নি। এদিকে তখনও অপারেশন থিয়েটারের নিবিড় পরিচর্যায় ছিলেন জননীরা।

Advertisement

পৃথিবীর বাতাসে নিশ্বাস নেওয়া এই শিশুরা ক্ষমতার লড়াই কিংবা যুদ্ধের বাস্তবতা সম্পর্কে কিছুই জানে না। হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দে মুহূর্তটা যেন থমকে গিয়েছিল। ইরান যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে খাতাম আল-আনবিয়া হাসপাতালে হামলা চালায় ইসরায়েল-মার্কিন যৌথবাহিনী।

যৌথবাহিনীর হামলায় যখন হাসপাতালের কর্মীরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছিল তখন অসহায় এসব শিশুর বর্ম হয়ে আসেন একজন নার্স। তার নাম নেদা সালিমি। হামলার সময় নবজাতকদের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করছিলেন সালিমি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, যুদ্ধরত দেশের হাসপাতালে হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধের শামিল। তবে এই আইনি বাক্য তোয়াক্কা না করেই হামলা চালানো হয়। যৌথবাহিনীর হামলায় মুহূর্তেই ছাদ ভেঙে পড়তে শুরু করে, কংক্রিট আর কাচের টুকরো যেন পানির মতো ঝরে পড়তে থাকে। ধ্বংসস্তূপের শব্দে মানুষের চিৎকার যেন বিস্ফোরণের শব্দে হারিয়ে গিয়েছিল।

Advertisement

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে নিজের জীবনের কথা না ভেবে নেদা ছুটে যান সদ্য জন্ম নেওয়া অসহায় শিশুদের কাছে। সাহসী এই নার্স হয়তো জানতেন, এই শিশুদের কিছু হলে তা শুধু জীবনহানি নয় বরং মায়েদের শেষ আশাটুকুও ভেঙে যাবে। 

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হাসপাতালের ওয়ার্ডের ছাদ যখন ধসে পড়ছিল তখন নবজাতকদের দিকে ছুটে যাচ্ছেন সালিমি। কাঁপা হাতে কিন্তু অদম্য সাহসে, তিনি একে একে শিশুদের কোলে তুলে নিলেন।

তিনটি নবজাতককে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে তিনি ধোঁয়া ও ধ্বংসস্তূপে ভরা করিডোর পেরিয়ে গেলেন। তিনি আশ্রয়ের দিকে যাননি। এই বিভীষিকাময় মুহূর্তে একটি শিশুর জায়গা তার মায়ের বুকে। আর একটি মায়ের প্রয়োজন তার সন্তানের জীবিত থাকার নিশ্চয়তা। তাই হয়তো এসব শিশুর জীবন রক্ষায় নিজের জীবনের পরোয়া করেননি সালিমি।

শিশুদের কোলে নিয়ে তিনি করিডোরের দিকে ছুটে যান এবং মায়েদের নাম ধরে ডাকতে থাকেন। ধ্বংসস্তূপ আর কান্নার মাঝেও নেদার কণ্ঠ যেন ঐশ্বরিক শক্তিতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। অপারেশন থিয়েটার থেকে সদ্য বের হওয়া মায়েরা ভেবেছিলেন এ যুদ্ধ হয়তো তাদের শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু না তা হতে দেননি নার্স সালিমি।

Advertisement

মায়েরা হঠাৎ দেখলেন-ধুলোমাখা এক দেবদূত তাদের সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে বেরিয়ে এসেছে।

পরে এক সাক্ষাৎকারে নেদা সালিমি বলেন, আমি শুধু একজন আমানতদার ছিলাম।

কিন্তু ইতিহাসের স্মৃতিতে এবং এই শিশুদের মায়েদের কাছে তিনি হয়ে থাকবেন এক মহীয়সী নারী।

প্রসঙ্গত, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায় এবং এর জবাবে ইরান পাল্টা আক্রমণ করে। দীর্ঘ ৩৯ দিনের যুদ্ধ শেষে গত ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি চলছে।

ইরানের লিগ্যাল মেডিসিন সংস্থার তথ্যমতে, ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘাতে মোট ৩ হাজার ৩৭৫ জন নিহত হন, যার মধ্যে ২,৮৭৫ জন পুরুষ এবং ৪৯৬ জন নারী। এছাড়া জরুরি চিকিৎসা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ১১৮ জন চিকিৎসাকর্মী আহত হন এবং ২৬ জন নিহত হন।

সূত্র:এসএনএন

কেএম