একজন মা শুধু একটি পরিবারের সদস্য নন; তিনি পুরো পরিবারের হৃৎস্পন্দন। সন্তানের জন্ম থেকে সংসারের প্রতিটি দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে নিতে অনেক মা কখন যে নিজের শরীরের কথা ভুলে যান, সেটি তারা নিজেরাও বুঝতে পারেন না।
Advertisement
বিশেষ করে চল্লিশ বছর পার হওয়ার পর নারীর শরীরে নানা ধরনের শারীরিক ও হরমোনজনিত পরিবর্তন শুরু হয়। এই সময়টাতে সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা দিবসে ফুল বা শুভেচ্ছার পাশাপাশি একজন মায়ের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হতে পারে তার সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা।
চল্লিশের পর শরীরে কী পরিবর্তন আসেচল্লিশের পর নারীদের শরীরে ধীরে ধীরে হরমোনের পরিবর্তন শুরু হয়। অনেকের ক্ষেত্রে মেনোপজের পূর্বলক্ষণ দেখা দেয়। ওজন বাড়া, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাড় ক্ষয়, থাইরয়েড সমস্যা, মানসিক চাপ, অনিদ্রা এসব সমস্যা এই বয়সে বেশি দেখা যায়।
অনেক মা সংসারের ব্যস্ততায় নিজের অসুস্থতাকে গুরুত্ব দেন না। এই বয়সে একটু ব্যথা তো হবেই, এমন ধারণা খুবই বিপজ্জনক। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে অধিকাংশ জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
Advertisement
মায়ের খাবারের প্লেটে শুধু পরিবারের বাকি সবার বেঁচে যাওয়া খাবার নয়, থাকতে হবে পুষ্টিকর খাবার। যেমন- বেশি শাকসবজি ও ফল, কম তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত পানি, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি কমানো, ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় পরিহার।
নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়ামপ্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। তাই সকালে বা বিকেলে নিয়মিত হাঁটুন, হালকা ব্যায়াম ও স্ট্রেচিং করুন, দীর্ঘসময় একটানা বসে থাকবেন না।
মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নঅনেক মা নিজের দুঃখ-কষ্ট প্রকাশ করেন না। সন্তান বড় হয়ে গেলে অনেক সময় একাকীত্বও বাড়ে। এজন্য পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান, নিজের পছন্দের কাজ করুন, পর্যাপ্ত ঘুমান, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে দ্বিধা করবেন না।
চলাফেরা ও দৈনন্দিন জীবনে সতর্কতাহঠাৎ পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়ান। হাড় দুর্বল হলে পড়ে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এজন্য বাথরুম শুকনো রাখুন, স্লিপার যেন পিছল না হয়, সিঁড়িতে পর্যাপ্ত আলো রাখুন।
Advertisement
অনেক মা পরিবারের সবাইকে খাইয়ে শেষে নিজে খান। এতে গ্যাস্ট্রিক, দুর্বলতা ও ডায়াবেটিসের সমস্যা বাড়ে। তাই সময়মতো খাবার খান, সকালের নাশতা বাদ দেবেন না।
নিজের অসুস্থতা লুকাবেন নাবুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক রক্তপাত, ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি এসব উপসর্গ অবহেলা করা উচিত নয়।
পরিবারের দায়িত্বও আছেশুধু মায়ের দায়িত্বই নয়, সন্তানেরও দায়িত্ব আছে মায়ের খোঁজ নেওয়ার। অনেক সময় মা অসুস্থ হলেও পরিবারের কথা ভেবে ডাক্তার দেখাতে চান না। মা দিবসে একটি শাড়ি উপহার দেওয়ার পাশাপাশি যদি আমরা মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে দেই, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। মায়ের ওষুধ সময়মতো খাওয়া হচ্ছে কিনা, তিনি ঠিকমতো ঘুমাচ্ছেন কিনা, হাঁটছেন কিনা এসব খেয়াল রাখাও সন্তানের দায়িত্ব।
একজন চিকিৎসকের অনুভূতিহাসপাতালে আমি প্রায়ই দেখি, অসুস্থ হয়ে পড়ার পর অনেক মা বলেন, সবার খেয়াল রাখতে গিয়ে নিজের কথা ভাবিনি। এই কথার ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক জীবনের ত্যাগ। আমরা চাই না আমাদের মায়েরা শুধুমাত্র পরিবারের জন্য বেঁচে থাকুন; আমরা চাই তারা নিজেদের জন্যও বাঁচুন, সুস্থ থাকুন, হাসিখুশি থাকুন।কারণ মা সুস্থ থাকলে পরিবার সুস্থ থাকে, সমাজ সুস্থ থাকে।
মা দিবস বছরে একদিন আসে, কিন্তু মায়ের প্রতি দায়িত্ব প্রতিদিনের। চল্লিশের পর একজন মায়ের শরীর আরও বেশি যত্ন দাবি করে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং পরিবারের ভালোবাসা এই তিনটিই পারে একজন মাকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে। আসুন, এবার মা দিবসে শুধু শুভেচ্ছা নয়; মায়ের সুস্থ জীবনের প্রতিশ্রুতি দেই।
লেখকডা. মো. সাঈদ হোসেনকনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান, মেডিসিন বিভাগ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, মুন্সীগঞ্জ
জেএস