লাইফস্টাইল

গর্ভধারণ থেকে প্রসব, এই টেস্টগুলো জরুরি

গর্ভধারণ শুধু একটি শারীরিক পরিবর্তন নয়, এটি একজন নারীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অধ্যায়। এমনকি গর্ভধারণ একটি নতুন জীবনের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আর এই যাত্রাকে নিরাপদ ও সুস্থ রাখতে প্রয়োজন সঠিক সময়ের সঠিক যত্ন। শুরু থেকে প্রসব পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা মা ও গর্ভের শিশুর সার্বিক অবস্থার ওপর নজর রাখতে সাহায্য করে।

Advertisement

অনেক সময় বাহ্যিকভাবে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে নানা জটিলতা, যা শুধুমাত্র নিয়মিত টেস্টের মাধ্যমেই ধরা সম্ভব। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভধারণ থেকে প্রসব পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো জানা এবং সঠিক সময়ে করানোই হতে পারে সুস্থ মা ও নিরাপদ সন্তানের সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা।

এ বিষয়ে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের গাইনি, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি রোগ এবং গাইনি ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. রুখসানা পারভীন বলেন, ‘সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষা করালে অনেক জটিলতা আগেই শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব।’

এ বিষয়ে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের গাইনি, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি রোগ এবং গাইনি ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. রুখসানা পারভীন বলেন, ‘সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষা করালে অনেক জটিলতা আগেই শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব।’

Advertisement

একই সঙ্গে তিনি গর্ভধারেণের আগ থেকে সন্তান হওয়ার আগ পর্যন্ত একজন নারীর যেসব টেস্ট করতে হয়, কখন কোন টেস্ট করতে হয়, আর কোন টেস্ট কি কারণে করা হয় সে বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন।

গর্ভধারণের আগে: প্রস্তুতির প্রথম ধাপ

গর্ভধারণের পরিকল্পনা করার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা জরুরি। এতে করে ভবিষ্যতের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।

রক্তের গ্রুপ ও আরএইচ ফ্যাক্টর পরীক্ষা: মায়ের রক্তের গ্রুপ ও আরএইচ নেগেটিভ বা পজিটিভ জানা খুব জরুরি। আরএইচ ইনকম্প্যাটিবিলিটি থাকলে পরবর্তীতে শিশুর জন্য জটিলতা তৈরি হতে পারে। সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট): রক্তস্বল্পতা বা ইনফেকশন আছে কি না তা জানা যায়। গর্ভধারণের আগে হিমোগ্লোবিন ঠিক রাখা গুরুত্বপূর্ণ। থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট (টিএসএইচ): থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে গর্ভধারণে সমস্যা বা গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে। ব্লাড সুগার টেস্ট: ডায়াবেটিস থাকলে তা আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার। সংক্রমণজনিত পরীক্ষা (হেপাটাইটিস বি, সি, এইচআইভি): এই সংক্রমণগুলো থাকলে মা ও শিশুর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়। গর্ভধারণের পর প্রথম ৩ মাস (প্রথম ট্রাইমেস্টার) আল্ট্রাসনোগ্রাম (৬-৮ সপ্তাহে): গর্ভের অবস্থান, হার্টবিট ও ভ্রূণের সংখ্যা নির্ণয়ের জন্য করা হয়। ব্লাড টেস্ট (সিবিসি, ব্লাড গ্রুপ নিশ্চিতকরণ): শরীরের সামগ্রিক অবস্থা বোঝার জন্য। ইউরিন আর/ই (রুটিন এক্সামিনেশন): ইনফেকশন বা কিডনির সমস্যা শনাক্ত করতে। রুবেলা ও অন্যান্য স্ক্রিনিং: ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে শিশুর জন্মগত ত্রুটি হতে পারে। এনটি স্ক্যান (১১-১৩ সপ্তাহ): ডাউন সিনড্রোমসহ কিছু জেনেটিক সমস্যা শনাক্তে সহায়ক। দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার (৪-৬ মাস) অ্যানোমালি স্ক্যান (১৮-২২ সপ্তাহ): শিশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিকভাবে তৈরি হচ্ছে কি না তা বিস্তারিত দেখা হয়। এসময় শিশুর লিঙ্গ জানা যায়, তবে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী শিশুর লিঙ্গ প্রকাশ করা দন্ডনীয় অপরাধ। ট্রিপল বা কোয়াড স্ক্রিনিং টেস্ট: জেনেটিক বা জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি নির্ণয়ে সাহায্য করে। ওজিটিটি (ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট): গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আছে কি না তা শনাক্ত করতে। রক্তচাপ ও ওজন মনিটরিং: প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকি বোঝার জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি। আরও পড়ুন:  গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব কারণ, কীভাবে কমাবেন গর্ভাবস্থায় যে কারণে বাড়ে রক্তচাপ অনাহারে শরীর কাকে আগে বাঁচায়, মা নাকি শিশু? তৃতীয় ট্রাইমেস্টার (৭-৯ মাস) গ্রোথ স্ক্যান: শিশুর ওজন ও বৃদ্ধি ঠিক আছে কি না তা দেখা হয়। ডপলার স্টাডি (প্রয়োজনে): শিশুর রক্তপ্রবাহ ঠিক আছে কি না তা যাচাই করা হয়। সিবিসি পুনরায় পরীক্ষা: রক্তস্বল্পতা বেড়েছে কি না তা নিশ্চিত করা। গ্রুপ বি স্ট্রেপ্টোকক্কাস (জিবিএস) স্ক্রিনিং (৩৫-৩৭ সপ্তাহ): মায়ের শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া থাকলে শিশুর সংক্রমণ হতে পারে, তাই আগেই জানা দরকার। বেবির পজিশন ও হার্টবিট চেক: স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব কি না তা নির্ধারণে সাহায্য করে। কেন এই পরীক্ষাগুলো গুরুত্বপূর্ণ?

ডা. রুখসানা পারভীনের মতে, ‘অনেক সময় বাহ্যিকভাবে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও শরীরের ভেতরে নীরবে সমস্যা তৈরি হতে পারে। নিয়মিত পরীক্ষা সেই ঝুঁকিকে আগেই ধরতে সাহায্য করে।’

ডা. রুখসানা পারভীনের মতে, ‘অনেক সময় বাহ্যিকভাবে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও শরীরের ভেতরে নীরবে সমস্যা তৈরি হতে পারে। নিয়মিত পরীক্ষা সেই ঝুঁকিকে আগেই ধরতে সাহায্য করে।’

Advertisement

এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে- মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো যায় জন্মগত ত্রুটি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা যায় নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা সহজ হয়

সবশেষে ডা. রুখসানা পারভীন আরও বলেন, গর্ভধারণ একটি সুন্দর যাত্রা, তবে এটি নিরাপদ করতে প্রয়োজন সচেতনতা ও নিয়মিত চিকিৎসা পরামর্শ। নিজের ইচ্ছামতো পরীক্ষা না করে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টেস্ট করানো উচিত। মনে রাখতে হবে, আজকের একটি ছোট পরীক্ষা আগামী দিনের বড় ঝুঁকি এড়াতে পারে। সুস্থ মা মানেই সুস্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, এই লক্ষ্যেই প্রয়োজন গর্ভধারণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সঠিক যত্ন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা।

গর্ভধারণ একটি সুন্দর যাত্রা, তবে এটি নিরাপদ করতে প্রয়োজন সচেতনতা ও নিয়মিত চিকিৎসা পরামর্শ। নিজের ইচ্ছামতো পরীক্ষা না করে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টেস্ট করানো উচিত।

জেএস/