সরকার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
Advertisement
শনিবার (১৩ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত বাণিজ্য, প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনীতি বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান। এসময় তিনি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে সরকারের রোডম্যাপ তুলে ধরেন। সম্মেলনে দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, ব্যবসায়ী নেতা ও নীতিনির্ধারকরা অংশগ্রহণ করেন।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বৈশ্বিক মন্দা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জলবায়ু ঝুঁকি, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য বাধা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি চলমান জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
Advertisement
সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। প্রথমত প্রধান রপ্তানি বাজারে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে কঠিন প্রতিযোগিতার আশঙ্কা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত অর্থায়নে বৈষম্য প্রকট—উন্নত দেশগুলো মাত্র ১ থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পেলেও বাংলাদেশকে ৬ থেকে ১২ শতাংশ বা তার বেশি হারে ঋণ নিতে হচ্ছে। মুদ্রার অস্থিরতা ও আর্থিক বাজারের ওঠানামাও দেশকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।
তৃতীয়ত আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু ঝুঁকির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো বছরে অতিরিক্ত ২ হাজার কোটি ডলার সুদ গুনছে। বাহ্যিক ঋণ ও জলবায়ু সংকট ক্রমশ একসূত্রে জড়িয়ে পড়ছে।
চতুর্থত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, চলমান জ্বালানি সংকট ১৯৭০-এর দশকের তেল ধাক্কার চেয়েও ব্যাপক হতে পারে যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে উন্নয়ন বরাদ্দকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সেই সংকটের কারণেই ১৯৮০’র দশক অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য ‘হারানো দশক’ হয়ে উঠেছিল।
Advertisement
পঞ্চমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, ব্লকচেইন ও ৫-জি প্রযুক্তিনির্ভর ‘ট্রেড টেক’ বৈশ্বিক বাণিজ্যকে দ্রুত পুনর্গঠন করছে, যা সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই তৈরি করছে।
তিন লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্পএসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প তিনটি মূল লক্ষ্যকে ঘিরে—স্থিতিশীল করো, সংস্কার করো এবং উন্নীত করো। এই রূপকল্পকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য কূটনীতির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তরিত করাই এখন সরকারের প্রধান কাজ বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।
কূটনীতিক ও ব্যবসায়ীদের প্রতি বার্তাউপস্থিত রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের উদ্দেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোকে সক্রিয় বিনিয়োগ সহায়তা কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। বাণিজ্য চুক্তি আধুনিকীকরণ ও বাজারে পারস্পরিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে। বাংলাদেশ একটি নির্ভরযোগ্য, নিরপেক্ষ ও গঠনমূলক অংশীদার হিসেবে বৈশ্বিক মঞ্চে ভূমিকা রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি জানান।
দেশের ব্যবসায়ী সমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে বড় শিল্পগোষ্ঠী সবার জন্য নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। সরকারের প্রথম ১০০ দিনেই সর্বমহলে অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেন, বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি রাখে। এই সম্মেলনকে একটি উন্মুক্ত ও ধারাবাহিক সংলাপের সূচনাবিন্দু হিসেবে উল্লেখ করে তিনি অংশগ্রহণকারীদের কর্মের মাধ্যমে সরকারকে মূল্যায়ন করার আহ্বান জানান।
এমইউ/ইএ