শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বরিশাল অঞ্চল বেশ পিছিয়ে বলে অভিমত বরিশালের ব্যবসায়ীদের। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নতুন সরকারের কাছে এ অঞ্চলের জন্য শিল্পকারখানা স্থাপনে সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা ৬ লেনের রাস্তা বাস্তবায়ন ও ভোলা-বরিশাল ব্রিজ নির্মাণের দাবিও জানিয়েছেন তারা। এছাড়া ব্যবসায়ীরা জাতীয় বাজেটকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
Advertisement
এ এলাকার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু ও পায়রা বন্দর চালু হওয়ায় সারা দেশের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের সড়কপথে যোগাযোগ সহজ হয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষের আশা ছিল সেতুগুলো চালুর পর মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেবে। কিন্তু গত চার বছরেও তেমন পরিবর্তন আসেনি।
এর কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা ৬ লেনের সড়ক নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং ভোলা-বরিশাল ব্রিজ নির্মাণ না হওয়ায় এ অঞ্চলে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। ফলে কর্মসংস্থানও বাড়েনি।
ইউরোটেল বিডি প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম জাকির হোসেন বলেন, দেশি-বিদেশি শিল্পকারখানা গড়ে না উঠলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না। এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার মান উন্নয়নের জন্য সরকারকে পরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন সুবিধা দিতে হবে।
Advertisement
এই ব্যবসায়ী বলেন, এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন হলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চল হবে দেশের অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা। আর্থিকভাবে এ অঞ্চল হবে সমৃদ্ধ।
ব্যবসায়ী আকতার ফারুক শাহিন বলেন, দেশের প্রায় ৬৭ শতাংশ ইলিশ এই অঞ্চলে আহরিত হয়। অথচ মৎস্য সম্পদ রক্ষা ও জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে বাজেটে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। এছাড়া কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, শুভ সন্ধ্যা ও নিদ্রা সৈকতের মতো পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে আকর্ষণীয় করতে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থায়ন জরুরি।
বরিশাল মেট্রোপলিটন চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের সভাপতি নিজাম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রাসহ দেশের তিনটি সমুদ্রবন্দর রয়েছে। বর্তমানে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য তিন-চতুর্থাংশ চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার হয়। কিন্তু রাজধানী ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে মোংলা বন্দরের দূরত্ব ১৭০ কিলোমিটার আর বিভাগীয় শহর বরিশাল থেকে মোংলা বন্দরের দূরত্ব মাত্র ১১৫ কিলোমিটার এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরের দূরত্ব মাত্র ১০০ কিলোমিটার। অপরদিকে বরিশাল শহর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের সড়কপথে দূরত্ব এর তিন গুণেরও বেশি। যদি মোংলা ও পায়রা নৌবন্দরের সুবিধা বাড়ানো যায়, তাহলে বরিশাল অঞ্চলের শিল্প ও বাণিজ্যের উদ্যোক্তারা আমদানি-রপ্তানির জন্য এ দুটি বন্দরই ব্যবহার করবেন, তিনগুণ পথ ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দরে যাবেন না। পায়রা বন্দর পুরোপরি চালু হলে সময় এবং পরিবহন ব্যয় কমাতে ব্যবসায়ীরা পায়রা পোর্টকেই বেছে নেবে।
এছাড়া পিরোজপুরে বেকুটিয়া নদীতে সেতু নির্মাণ হওয়ায় খুলনা, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গেও যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়েছে। ব্যবসায়ীরা পায়রা ও মোংলা পোর্ট ব্যবহারের সর্বাধিক গুরুত্ব দেবেন। আহরিত মাছের জন্য আধুনিক মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের ওপর জোর দেওয়ার কথাও বলেন এই ব্যবসায়ী।
Advertisement
বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন জাগো নিউজকে বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ভোলা-বরিশাল ব্রিজ নির্মাণ না হওয়ায় পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস বরিশালে আনা যাচ্ছে না। এদিকে শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য জরুরি হচ্ছে গ্যাস। গ্যাস সংযোগ না থাকায় বরিশালে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঘরে উঠছে না। বরিশালকে বাণিজ্যিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বরিশালে আনার ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি পায়রা বন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে চালুর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
ভোলার গ্যাস বরিশালে আনলে এ অঞ্চলের দ্রুত শিল্পবিপ্লব ঘটবে উল্লেখ করে এই ব্যবসায়িক নেতা বলেন, এ অঞ্চলের হাব হচ্ছে বরিশাল। বরিশালে গ্যাস আসা মানেই পোশাকশিল্পসহ উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী নানান শিল্পের কারখানা গড়ে উঠবে। দক্ষিণাঞ্চলের বিপুল মানুষ পোশাকশিল্পের সঙ্গে জড়িত। এ অঞ্চলের দক্ষ জনশক্তি দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কাজ করছে। বরিশালে পোশাকসহ রপ্তানিমুখী বিভিন্ন কারখানা গড়ে উঠলে ওই সব জনশক্তি বরিশালে ফিরে আসবে। পাশাপাশি নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পিছিয়ে থাকা এই অঞ্চলের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে। কমে আসবে দারিদ্র্যের হারও।
এফএ/এমএস