প্রবাস

‘যুদ্ধজয়ের চেয়ে যুদ্ধ প্রতিরোধে সক্ষম প্রজ্ঞাবান মানুষ বেশি দরকার’

বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান সংঘাত, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও উগ্রবাদের প্রেক্ষাপটে শান্তি প্রতিষ্ঠা, সহাবস্থান নিশ্চিতকরণ এবং তরুণদের ইতিবাচক সম্পৃক্ততায় ধর্মীয় নেতাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ধর্মীয় নেতাদের এক সম্মেলনে।

Advertisement

শুক্রবার কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত তৃতীয় আন্তর্জাতিক ধর্মীয় নেতাদের সম্মেলন উদ্বোধন করেন পেরাকের সুলতান সুলতান নাজরিন শাহ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ-এর মহাসচিব মোহাম্মদ আল-ইসা।

‘ধর্মীয় নেতা ও যুব ক্ষমতায়ন’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সম্মেলনের যৌথ আয়োজন করে মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এতে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রায় দুই হাজার তরুণ অংশগ্রহণ করেন।

সম্মেলনে মোহাম্মদ আল-ইসা ‘প্রতিরোধমূলক শান্তি’ (প্রিভেন্টিভ পিস) ধারণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, মানবজাতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তা থামানো নয়, বরং যুদ্ধের আগেই সংঘাত প্রতিরোধ করা।

Advertisement

তিনি বলেন, মানবতার পরীক্ষা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে নয়, বরং যুদ্ধ শুরুর আগেই হয়। বিশ্বকে যুদ্ধজয়ী বীরের চেয়ে যুদ্ধ প্রতিরোধে সক্ষম প্রজ্ঞাবান মানুষের বেশি প্রয়োজন।

আল-ইসা সতর্ক করে বলেন, ধর্মীয় বিদ্বেষ, ইসলামভীতি, বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে উগ্রবাদী গোষ্ঠী এবং কিছু রাজনৈতিক শক্তি বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষা, সংলাপ ও বাস্তব উদ্যোগের মাধ্যমে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

তার ভাষায়, সত্যিকারের সম্প্রীতি সংঘাতের আগুন নেভানোর মধ্যে নয়, বরং সেই আগুন জ্বলে ওঠার আগেই তা প্রতিরোধ করার মধ্যে নিহিত।

Advertisement

তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় কূটনীতি প্রচলিত রাজনৈতিক কূটনীতির পরিপূরক হিসেবে বিরোধ মীমাংসা, বিভাজন দূরীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ফিলিস্তিন সংকট প্রসঙ্গে আল-ইসা ন্যায়ভিত্তিক দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে মত দেন এবং বৈশ্বিক সম্প্রীতি ও সহযোগিতা উৎসাহিত করতে একটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি পুরস্কার চালুর ঘোষণা দেন।

প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, বর্তমান বিশ্বে ভূরাজনৈতিক বিভাজন, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং গাজাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের চলমান সংঘাত ধর্মীয় নেতাদের মধ্যপন্থা ও নৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি কেবল প্রতীকী কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ নিতে হবে। বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রকৃত সম্প্রীতি অভিন্নতার ওপর নয়, বরং ভিন্নতাকে ন্যায়সঙ্গতভাবে পরিচালনার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

পেরাক রাজ্যের সুলতান নাজরিন শাহ বলেন, অ্যালগরিদম-নির্ভর ডিজিটাল পরিবেশ তরুণদের মধ্যে বিভাজন ও অবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলছে। অনেক তরুণ আজ জানতে চাইছে। আমি কোথায় অন্তর্ভুক্ত? কাকে বিশ্বাস করব? কোন মূল্যবোধ এখনও গুরুত্বপূর্ণ?

তিনি বলেন, শান্তি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ঘোষণা করলেই প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং তা সমাজ ও দৈনন্দিন সম্পর্কের ভেতর লালন করতে হয়। বিভক্তির এই যুগে সহাবস্থান নিজেই এক সাহসী কাজ, যোগ করেন তিনি।

সম্মেলনের ফাঁকে আরব নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সামি আল-শরীফ বলেন, তরুণদের ধর্ম থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা কেবল মুসলিম সমাজের নয়, বরং একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। ধর্মীয় নেতৃত্ব ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি এবং ডিজিটাল দক্ষতার অভাবকে তিনি এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে বাদরিয়াহ সালিম বলেন, প্রযুক্তি যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তেমনি নতুন সুযোগও সৃষ্টি করছে। ধর্মীয় শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং তরুণ-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রজন্মগত ব্যবধান কমানো সম্ভব।

বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, অনলাইন উগ্রবাদ এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা শান্তি, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারে ধর্মীয় নেতা, সরকার এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে আরও শক্তিশালী সহযোগিতার আহ্বান জানান।

এমআরএম