বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরির প্রত্যাশায় বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছেন রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা। তবে উচ্চ ঘাটতি ও ঋণনির্ভর অর্থায়নের কারণে এর বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে রাজশাহীতে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
Advertisement
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগগুলো মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে সাধারণ মানুষ এই বাজেটের সুফল পাবে না। অন্যদিকে ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক শাহ মো. মাইনুল হোসেন শান্ত চৌধুরী। তিনি বলেন, নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যা ইতিবাচক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন খরচ কমানো এবং বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী উভয়ই উপকৃত হবেন।
তিনি বলেন, রাজশাহীর আম, কৃষিপণ্য, কোল্ড স্টোরেজ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতের উন্নয়নে কার্যকর বরাদ্দ এবং নীতি-সহায়তা প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ সহজলভ্য করা এবং কর ব্যবস্থায় হয়রানি কমানো গেলে ব্যবসা সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। সামগ্রিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেটকে তিনি ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে মূল্যায়ন করেন।
Advertisement
একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভাইস প্রেসিডেন্ট জিয়াউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, রাজশাহীর মতো সম্ভাবনাময় অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প, রফতানি ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। কর কাঠামো সহজীকরণ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হলে নতুন বিনিয়োগ আরও বাড়বে। বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
তবে বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একটি সংকটকালীন সময় অতিক্রম করছে। মুদ্রাস্ফীতিও অনেক বেশি। এমন পরিস্থিতিতে বাজেটের আকার নিয়ে আরও চিন্তাভাবনার প্রয়োজন ছিল বলে আমার মনে হয়।”
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ অনেক বেশি। উন্নয়নমূলক খাতে বরাদ্দ দেওয়া হলেও অনেক সময় তা পুরোপুরি ব্যয় করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। এ অবস্থায় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি বাজেট পূরণের পরিকল্পনাকে তিনি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বলে মনে করেন না।
তবে বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষকদের জন্য বিশেষ কার্ড চালুর মতো উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য সহায়ক হতে পারে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনও বাজেটে রয়েছে।
Advertisement
তবে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সমস্যা দুর্নীতি নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি। এটি কীভাবে কমানো যাবে, সে বিষয়ে বাজেটে তেমন কোনো উদ্যোগ আমার চোখে পড়েনি।
এছাড়া কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, ‘কৃষকরা বরাবরই বাজারদর নিয়ে হতাশ থাকেন। তাদের ফসল বাজারে এলে অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পান না। এ বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ বাজেটে চোখে পড়েনি।’
এদিকে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা ইতিবাচকভাবে দেখলেও অর্থনীতিবিদরা এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা, ঋণনির্ভর অর্থায়ন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে বাজেট নিয়ে রাজশাহীতে আশাবাদ ও শঙ্কা—দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই সামনে এসেছে।
মনির হোসেন মাহিন/কেএইচকে/এএসএম