• অবৈধ ইটভাটায় পুড়ছে বনের কাঠ• হারিয়ে যাচ্ছে বিল• বনে বাঁশ-গাছ চুরির মহোৎসব
Advertisement
প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও জলাভূমির জন্য পরিচিত মৌলভীবাজার জেলা এখন পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে। জেলার বিভিন্ন ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে গাছ ও বাঁশ চুরি, হাওর দখল ও মাছ লুটপাট এবং অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালনার মতো কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর প্রতিরোধের কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে জেলার পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।
অবৈধ ইটভাটার দাপটঅনুসন্ধানে জানা গেছে, মৌলভীবাজারে বর্তমানে সচল থাকা ৪৫টি ইটভাটার কোনোটিরই বৈধ পরিবেশগত ছাড়পত্র বা লাইসেন্স নেই। এসব ভাটায় কৃষিজমির উর্বর টপ সয়েল কেটে ইট তৈরি করা হচ্ছে। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কাঠ, যা বন উজাড়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন না থাকলেও উচ্চ আদালতে রিটের সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর এসব ইটভাটা চালিয়ে যাচ্ছেন মালিকরা। এতে একদিকে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমছে, অন্যদিকে বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
Advertisement
সরকারি হিসাব মতে, এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি হাকালুকি হাওর মৌলভীবাজারের পরিবেশ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় হাকালুকি হাওরের বিলগুলোর মোট আয়তন ছিল প্রায় ৪ হাজার ৪০০ হেক্টর। কাগজে-কলমে সেখানে ২৩৮টি বিল থাকলেও খননের অভাব ও পলি জমার কারণে প্রায় ১০০টি বিল ভরাট হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন উজাড় হচ্ছে কালাছড়া বিটের বৃক্ষ, হুমকির মুখে পরিবেশ বর্জ্য ফেলার জায়গা নেই, বাতাসে ছড়াচ্ছে বিষএকই অবস্থা জেলার হাইল ও কাউয়াদীঘি হাওরের। হাইল হাওরে ১৩১টি এবং কাউয়াদীঘি হাওরে ৬৮টি বিল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে প্রায় ১০০ বিলের অস্তিত্ব সংকুচিত বা বিলীন হওয়ার পথে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত অবৈধভাবে মাছ আহরণ, হাওরের জায়গা দখল এবং বর্জ্য ফেলার কারণে এসব জলাভূমির পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ছড়াজুড়ে বালু লুটমৌলভীবাজারের সৌন্দর্যের অন্যতম অনুষঙ্গ নদী ও ছড়া। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত রয়েছে শত শত ছড়া। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৫২টি ছড়া সিলিকা বালুর কোয়ারি হিসেবে তালিকাভুক্ত। এর মধ্যে ৩৩টি কোয়ারি খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর অনুমোদিত।
Advertisement
তবে বর্তমানে অধিকাংশ ছড়ার কোনো ইজারা না থাকলেও সারা বছর অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে একটি প্রভাবশালী চক্র এসব ছড়া থেকে বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছে। এতে ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
বনাঞ্চলে গাছ ও বাঁশ চুরিজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ বন বিভাগের চারটি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকেও নির্বিচারে গাছ ও বাঁশ কাটার অভিযোগ রয়েছে। বনজ সম্পদ চুরির ফলে বনাঞ্চলের আয়তন ও ঘনত্ব কমছে। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন এমআরএফ প্রকল্প / সিসিকের বর্জ্য থেকে সম্পদ, নাকি দূষণের নতুন ফাঁদ ময়মনসিংহ / শহরের প্রবেশমুখে ৩০ বছরের বিষাক্ত ভাগাড়বন বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় ২৩টি বাঁশ মহাল রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব মহাল ইজারা না হওয়ায় বনজ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর সুযোগে চোরচক্র বনের গাছ ও বাঁশ কেটে পাচার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, বন উজাড়ের কারণে বন্যপ্রাণীর খাদ্য সংকট বাড়ছে এবং জীববৈচিত্র্য দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
পরিবেশকর্মীদের উদ্বেগপরিবেশ কর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘মৌলভীবাজার প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি জেলা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এসব সম্পদ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। যে যার মতো সম্পদ লুটপাট করছে। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের কার্যনির্বাহী সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘বনের গাছ ও বাঁশ পাচার শুধু বন ধ্বংস করছে না, পুরো পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। হাওরের বিল ভরাট, বর্জ্য ফেলা, মাছ লুট ও বালু উত্তোলন চলতে থাকলে পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি হবে। প্রশাসনকে এখনই কঠোর অবস্থানে যেতে হবে।’
যা বলছে প্রশাসনমৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘সিলিকা বালুর বিষয়টি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। বনাঞ্চল রক্ষার দায়িত্ব বন বিভাগের। এটা সত্যি যে, জেলার কোনো ইটভাটার বৈধতা নেই। আমাদের পক্ষ থেকে পরিবেশ রক্ষায় নিয়মিত কাজ করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে জনসচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’
আরও পড়ুন বিষ-প্লাস্টিক-বর্জ্যে বিপন্ন সুন্দরবনজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আরিফ হোসেন বলেন, ‘মৌলভীবাজারের তিনটি বড় হাওরে প্রায় ৪০ শতাংশ বিল ভরাট হয়ে গেছে। এসব বিল পুনঃখনন জরুরি। একসময় হাওরে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।’
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, ‘সংরক্ষিত বন থেকে গাছ ও বাঁশ চুরির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়। বাঁশ মহাল ইজারার জন্য আগেও বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। এ বছর আবারও উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোসা. শাহীনা আক্তার জানান, ‘অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাওর উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ রয়েছে।’
এফএ/এমএস