দেশজুড়ে

ব্যবসাবান্ধব বাজেট বলছে চেম্বার, ঋণ-মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা নাগরিকদের

জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত নতুন বাজেট নিয়ে খুলনায় ভিন্ন ভিন্ন মত তৈরি হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা এ বাজেটকে সময়োপযোগী ও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে সাধারণ মানুষের ওপর ঋণ ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে নাগরিক সমাজ। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন ও সুন্দরবনের অর্থনীতিতে বিশেষ বরাদ্দের দাবি উঠেছে।

Advertisement

খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির যুগ্ম সচিব সুবর্ণা হাসান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং নারী ও প্রবীণদের জন্য ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ ইতিবাচক পদক্ষেপ। এছাড়া ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ডাল, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের ওপর কর ও শুল্ক সুবিধা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।

চেম্বারের নেতারা বলেন, শিশু খাদ্যের কাঁচামাল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের রিং, চোখের লেন্স, ক্যানসার ও সাধারণ রোগের ওষুধ তৈরির কাঁচামাল, দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ই-সিম, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সার, বীজ ও কীটনাশকের ওপর কর সুবিধা শিল্প ও বাণিজ্য খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য ভ্যাট অব্যাহতি এবং ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিকে তারা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।

তবে বাজেটের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি নানা সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

Advertisement

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, বাজেটে চিকিৎসা খাতসহ কিছু ইতিবাচক দিক আছে। তবে সামগ্রিক বাজেট অনেকটাই স্বপ্নবিলাসী বা উচ্চ বিলাসী বলেই মনে হচ্ছে। বিশাল অঙ্কের ঋণ পরিশোধের বোঝা এবং রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতি বাজেট মাথায় নিয়ে পুনরায় সিংহভাগ ঋণ নির্ভর বাজেট কতটা ফলপ্রসূ হবে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।

তিনি বলেন, বাজেটে দেশের ৯৯ শতাংশ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। কর আরোপের বিষয়ে উচ্চবিত্ত বা সচ্ছল ব্যক্তিদেরকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বিলাসী পণ্যের কর হ্রাস করে ধনিক শ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রত্যক্ষ করের পরিবর্তে পরোক্ষ করের প্রতি বেশি জোর দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

বাবুল হাওলাদার বলেন, শিল্প উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি উপেক্ষিতই রয়ে গেল। যার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবন-মান উন্নয়ন এবং জিডিপির বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। একদিক থেকে এ বাজেটে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা আরও বেড়ে গেল।

তার ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা যুগোপযোগী করার স্পষ্ট কোনো ধারণা এ বাজেটে নেই। অথচ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য-অর্থনীতি গতিশীল করতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি বা স্থিতিশীলতার কোনো বিকল্প নেই। এটি নির্বাচিত একটি নতুন সরকার হিসেবে আশার সঞ্চার করতে তো পারেইনি বরং প্রত্যাশা পূরণের বিপরীতে অনেকটাই হতাশাব্যঞ্জক বলেই আমার অভিমত।

Advertisement

‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ কমিটির খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি সাকিব রেজা বলেন, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা দেশের আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক। উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যে সহজীকরণ, সবুজ অর্থায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উন্নয়নশীল বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

তিনি বলেন, এ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আগামী এক দশকের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।

এদিকে জাতীয় রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উপকূলীয় অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ।

তিনি বলেন, সুন্দরবনকে ঘিরে মাছ, মধু ও কাঁকড়া খাতে বিপুল রাজস্ব আয়ের সুযোগ রয়েছে। জেলে ও বাওয়ালীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে মধু আহরণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে মধু প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষাগার স্থাপন এবং রপ্তানি সুবিধা সৃষ্টি করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

সংসদ সদস্যের মতে, উপকূলীয় এলাকায় মাছ ও কাঁকড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে, তেমনি জাতীয় রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেশের ২০টি উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এসব এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। বাজেটে এ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া হলে একদিকে মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতিও কমবে।

আরিফুর রহমান/কেএইচকে/এমএস