রক্ত মানবদেহের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শরীরে পূর্ণমাত্রায় রক্ত থাকলে মানবদেহ সজীব ও সক্রিয় থাকে। আর সেই রক্তশূন্যতা দেখা দিলে শরীর দুর্বল ও কর্মক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে। এছাড়া প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনা, অপারেশন এবং বিভিন্ন রোগের কারণে রক্তের প্রয়োজন হয়। আর জীবনে কঠিন সময়ে রক্তদাতা খোঁজা বা রক্ত সংগ্রহে দেশজুড়ে কাজ করছে বিভিন্ন সংগঠন। এসব সংগঠন শুধু রক্তের ব্যবস্থা করে না বরং অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচানোর নীরব কারিগর হিসেবে কাজ করে। তেমন একটি সংগঠন রক্তের বন্ধন জামালপুর। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই সংগঠনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ১৭ হাজার ব্যাগ রক্তদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
Advertisement
রক্তের বন্ধন জামালপুর এই সংগঠনের সেবা ও কার্যক্রম নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন সংঠনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের বর্তমান সদস্য আসমাউল আসিফ। তিনি এর আগে দুই মেয়াদে সংগঠনটির সভাপতি এবং এক মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ফিচার লেখক মোহাম্মদ সোহেল রানা।
জাগো নিউজ: রক্তের বন্ধন কবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কতজন রোগীর জন্য রক্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে?আসমাউল আসিফ: ২০১১ সালের ২৮ জানুয়ারি রক্তের বন্ধন জামালপুর সরকারি আশিক মাহমুদ কলেজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। কলেজের একঝাঁক উদ্যমী, তরুণ স্বপ্নবাদী শিক্ষার্থী স্বেচ্ছা এবং বিনামূল্যে রক্তদান করার উদ্দেশ্যে সংগঠনটি তারা গড়ে তুলে। রক্তের বন্ধন প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৭ হাজার ব্যাগেরও বেশি স্বেচ্ছা এবং বিনামূল্যে রক্তদান করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে তিনশ থেকে চারশটি রক্তদানের অনুরোধ আসে। রোগী ও রোগীর স্বজনরা ফোন করে যোগাযোগ করেন। কখনো কখনো এই অনুরোধের সংখ্যা প্রতি মাসে মাসে গড়ে পাঁচশো হয়ে যায়। আমরা প্রতি বছরই গড়ে প্রায় এক হাজার ব্যাগ রক্ত দান করে থাকি। গত বছরও আমাদের এক হাজার ব্যাগের মতো রক্তদান করা সম্ভব হয়েছে।
আরও পড়ুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে স্বেচ্ছাসেবীদের ভাবনা জাগো নিউজ: রক্তের বন্ধনের কার্যক্রম নিয়ে কীভাবে পরিচালনা করা হয়?আসমাউল আসিফ: রক্তের বন্ধনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত অর্থাৎ ডোনার যারা ম্যানেজ করেন এমন স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা দেড়শর মতো। আর আমাদের তালিকাভুক্ত রক্তদাতার সংখ্যা হবে এক হাজারের অধিক। আমরা দুইভাবে রক্তদাতা সংগ্রহ করে থাকি একটা অফলাইন, একটা অনলাইন। একটা হচ্ছে যে আমাদের যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিশেষ করে আশেক মাহমুদ কলেজ এখানে কোনো রোগী যদি বা রোগীর স্বজন যদি রক্তের অনুরোধ করেন কলেজের স্যারদের অনুমতি নিয়ে ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে ঘোষণা দেয় যে মুমূর্ষ রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন। যদি কেউ আগ্রহী থাকেন তাহলে আপনারা স্বেচ্ছায় রক্তদান করতে পারেন। তো এইভাবে আমাদের সেই রক্তের অনুরোধ, অনুরোধটি সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি। কলেজের শিক্ষার্থীরা অনেক সময়ই এতে অনুপ্রাণিত হয়েও তারা স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। এছাড়া আমরা অনলাইনে ক্যাম্পেইন করি। আমাদের ফেসবুক গ্রুপ আছে, পেজ আছে বিভিন্ন মেসেঞ্জার গ্রুপ আছে। সেখানে আমরা আমাদের এই অনুরোধগুলো ছড়ায় দেই। সেখান থেকেও অনেকে আগ্রহ প্রকাশ করলে যোগাযোগ করি।
Advertisement
এই সংগঠনটি স্বেচ্ছাসেবক, সদস্য, শুভাকাঙ্ক্ষী, উপদেষ্টাগণ এবং যারা বিভিন্ন সময়ে কমিটিতে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তারা তাদের নিজস্ব অর্থায়নেই এই সংগঠনের সব কার্যক্রম তারা পরিচালনা করে থাকেন। এছাড়া আমরা বিভিন্ন ব্যক্তি, সমাজকর্মী বা দানবীর যারা, তাদের কাছ থেকেও অনুদান নিয়ে থাকি। এর বাইরেও কখনো সরকারিভাবেও আমরা অনুদান পাই। কিন্তু সরকারি অনুদানের পরিমাণ খুবই কম। আমরা রক্ত সংগ্রহ এবং ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জটি অনুভব অনুভব করছি, সেটি হচ্ছে জামালপুরে মানসম্মত বা আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ কোনো ব্লাড ব্যাংক নেই। এটি থাকলে ব্লাড সংগ্রহ কাজ আরও সহজ হতো।
নিবন্ধিত অনুযারী জামালপুর জেলাতেই রক্তের বন্ধনের কাজ করতে পারি। কিন্তু যেহেতু এটি একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং মানবিক কাজ, আমরা দেশের যে কোনো জায়গায় মানবিক বিপর্যয় হলে বা রক্তের প্রয়োজন হলে মানবিকভাবে আমরা সাড়া দিয়ে থাকি। কিন্তু সেখানে আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা যতটুকু সম্ভব আমাদের যেখানে ডোনার থাকে সেখান থেকে ডোনারকে সেই রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করি। তবে আমরা সাধারণত বা বেশিরভাগ সময়ই আমরা জামালপুর জেলায় কাজ করি। জামালপুরের যে রোগীরা আছে তাদের রক্তের চাহিদা পূরণ করার ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। এর বাইরে আমরা ময়মনসিংহ এবং ঢাকাতেও আমরা অনেক সময় ডোনারকে নিয়ে যাই। বা যদি হাসপাতাল অনুমোদন দেয় তারা তুলে গ্রহণ করে সেক্ষেত্রে আমরা আইসব্যাগে করে রক্ত সাপ্লাই দিয়ে থাকি।
রক্তের বন্ধন একটি স্লোগান ব্যবহার করে। ‘আপনার এক ব্যাগ রক্তদান, বাঁচাতে পারে মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ’। পরবর্তীতে আমরা আরও একটি স্লোগান যুক্ত করি। সেটি হচ্ছে ‘আপনার জন্মদিনটি রক্তদান করে পালন করুন’। আমরা এই স্লোগানটি গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে ব্যবহার করছি। এই স্লোগান ব্যবহার করার কারণে প্রথমে আমরা আসলে তেমন সাড়া পেতাম না। কিন্তু এখন আমরা মনে করি যে এটা আমাদের অনেক বড় একটি অর্জন, যে অনেকেই এখন তাদের জন্মদিন রক্তদান করে উদযাপন করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। অনেকেই আগে থেকে জানিয়ে রাখেন তার জন্মদিন কবে। এটি আমার কাছে অনেক বড় একটি অর্জন মনে হয়েছে।
জাগো নিউজ: বিশেষ রক্তের গ্রুপের সংকট মোকাবিলা করণীয় কী?আসমাউল আসিফ: বিশেষ রক্তের গ্রুপ মানে নেগেটিভ যে রক্তের গ্রুপ আছে এই নেগেটিভ রক্তের গ্রুপধারী রক্তদাতার সংখ্যা আসলে অনেকটা কম। যদিও আসলে এই ধরনের রোগীর সংখ্যাও কম। তবে হঠাৎ যদিও সমস্যাটা হয় তখন কিন্তু আমরা ডোনার খুঁজে পাই না। যেহেতু নেগেটিভ সেক্ষেত্রে আমরা একটা যে প্রক্রিয়টা অনুসরণ করছি বা আমরা যেভাবে একটা ব্যবস্থা করছি সেটা হচ্ছে যে যারা নেগেটিভ রক্তের গ্রুপধারী যারা আছে আমরা তাদের নিয়ে আলাদা একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা করছি, যেখানে শুধু নেগেটিভ রক্তের গ্রুপধারী যারা থাকবেন। নেগেটিভ রক্তের অনুরোধ আসলে এখান থেকে পরিচালনা করা হবে।
Advertisement
আসমাউল আসিফ: থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার বা জরুরি রোগীদের জন্য আমরা দ্রুত সময়ে এবং জরুরি ভিত্তিতেই ডোনার ম্যানেজ করার চেষ্টা করে থাকি। তবে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে আমরা চেষ্টা করি যে তাদের ডোনার আগে থেকেই ঠিক করে রাখার এবং যথাসময়ে যেন তারা রক্ত পায় সে ব্যবস্থা করার চেষ্টা করি। পাশাপাশি থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য আমরা হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে গিয়ে রক্তের বন্ধনে স্বেচ্ছাসেবকরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন যে তাদেরকে যেন সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়া হয়। এতে তারাও ছাড় দেন। জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্তের যে ব্যাগ সেই ব্যাগটি বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়ে থাকে এবং এ ক্ষেত্রেও রক্তের বন্ধনে স্বেচ্ছাসেবকরা ভূমিকা পালন করেন।
আরও পড়ুন তরুণদের রক্তদান যেসব কারণে ভীষণ জরুরি জাগো নিউজ: সংগঠনের কার্যক্রমে স্মরণীয় বা আবেগঘন ঘটনা আছে কী?আসমাউল আসিফ: আবেগঘন অনেক ঘটনাই আছে। আমরা এমন অনেকভাবেই মুমূর্ষু রোগীকে তার জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে সহায়তা করেছি রক্তদান করে। ঝড়বৃষ্টিতে, গভীর রাতে আমরা জামালপুর ছাড়াও অন্যান্য জায়গাতেও গিয়েও আমরা স্বেচ্ছায় রক্তদান করে এসেছি। একটি ঘটনা যদি বলি, আমাদের একজন নিয়মিত রক্তদাতার নিজের স্ত্রীর সিজারের জন্য রক্তের প্রয়োজন ছিল এবং তিনি আমাদেরকে আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন। আমরা ডোনার জোগাড় করে রেখেছিলাম। কিন্তু যেদিন সিজার হওয়ার কথা, তার আগেই হঠাৎ করেই সিজার হয়ে যায় এবং বেশি পরিমাণে রক্তের প্রয়োজন হয়। তখন আমরা যে ডোনারদেরকে বলে রেখেছিলাম, তারা ঠিক তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দিতে পারছিল না।
আমরা যে দুজন ডোনারকে নিয়ে গিয়েছিলাম, তাদের রক্তে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ধরা পড়ে। এ কারণে ডোনার রেডি থাকার পরেও খুব আতঙ্কিত হয়ে গিয়েছিলাম যে আসলে আমরা শেষ পর্যন্ত কোনো খারাপ ঘটনার দিকে যাচ্ছিলাম কি না। তখন রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল, রাত একটার উপরে মধ্যরাত। আমরা এত রাতে আসলে কাউকে ফোনেও পাচ্ছিলাম না। অনেক জায়গায় আমরা যোগাযোগ করি। অনেক আগ্রহ প্রকাশ করলেও রাত গভীরের কারণে অনেক সমস্যা দেখা যায়। আবার কারো রক্তের হিমোগ্লোবিনও কম পাওয়া যায়। পরে আমাদের এক স্বেচ্ছাসেবক রক্ত দেন। তবে তিনিও একটি রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে দীর্ঘদিন রক্তদান বন্ধ রেখেছিলেন। তবে তার জীবনে কিছুটা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি রক্তদান করেন। আসলে মূলত এমন কঠিন সময়ে বাধ্য হয়েই ঝুঁকিটা নিতে হয়। তবে রক্ত নেওয়ার পর আল্লাহর রহমতে রক্তদাতা ও গ্রহীতা কারো কোনো সমস্যা হয়নি।
জাগো নিউজ: রক্তদানের বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কর্মসূচি নেনআসমাউল আসিফ: রক্তদানের বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষাসহ আমরা বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি নিয়ে থাকি। রক্তদান বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। পাঠ্যবইয়ে রক্তদান সম্পর্কিত একটি অধ্যায় রাখতে হবে। যেখানে রক্তদানের উপকারিতা, রক্তদানের স্বাস্থ্যগত দিক, রক্তদানের আগে কী করতে হয়, রক্তদানের পরে কী করণীয়, রক্তদান করলে কী হয়-এসব বিষয় নিয়ে যদি বিস্তারিত একটি অধ্যায় পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে সবাই রক্তদান সম্পর্কে অনেক বেশি জানবে ও শিখবে। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমাদের দেশে অনেক শিক্ষিত মানুষ আছেন, যারা উচ্চশিক্ষিত হলেও তারা কখনো রক্তদানের জন্য অনুরোধ পাননি বা তাদেরকে কেউ কখনো ডাকেনি যে রক্ত দিতে হবে। হয়তো তাদেরকে ডাকলে বা সচেতন করলে তারা স্বেচ্ছায় রক্তদান করতেন। তাই আমাদেরকে পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে যে স্বেচ্ছায় এবং বিনামূল্যে রক্তদান করা উচিত এবং রক্তদান করলে কোনো ক্ষতির কারণ নেই।
কেএসকে