ফিচার

ব্রাজিলের হৃদস্পন্দন: সাম্বা নাচের পেছনে সংগ্রাম-মুক্তির ইতিহাস

ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মিষ্টি যুদ্ধ লেগেই থাকে। সারাক্ষণ চর্চা চলতে থাকে দেশগুলো নিয়ে। খেলার ইতিহাস ছাড়াও সমর্থকরা আগ্রহী হয়ে ওঠেন প্রিয় দেশগুলোর খাবার, আচার, সংস্কৃতি নিয়েও। এসময় ব্রাজিলের নামের সঙ্গে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হলো সাম্বা নাচ। রঙিন পোশাক, তালময় সুর আর প্রাণবন্ত নৃত্যভঙ্গি সব মিলিয়ে সাম্বা শুধু একটি নাচ নয়, এটি ব্রাজিলের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের প্রতীক। কিন্তু এই নাচের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, দুঃখ-সংগ্রামের গল্প এবং সাংস্কৃতিক মিশ্রণের অসাধারণ অধ্যায়।

Advertisement

সাম্বার উৎপত্তি কোথায় ও কবে

সাম্বার শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে আফ্রিকার ইতিহাসে। ১৬শ থেকে ১৯শ শতকের মধ্যে পর্তুগিজ উপনিবেশবাদীরা বিপুল সংখ্যক আফ্রিকান দাসকে ব্রাজিলে নিয়ে আসে। এই আফ্রিকান জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সংগীত, তাল ও নৃত্যধারা সঙ্গে করে নিয়ে আসে। বিশেষ করে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার ইয়োরুবা ও বান্টু সংস্কৃতি সাম্বার ভিত্তি তৈরি করে।

পরবর্তীতে ব্রাজিলের স্থানীয় সংস্কৃতি ও ইউরোপীয় সংগীতধারার সঙ্গে এই আফ্রিকান রিদম মিশে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সাম্বা। ১৯শ শতাব্দীর শেষ দিকে রিও ডি জেনেইরোতে এই নাচ ও সংগীত প্রথম সংগঠিত রূপ পেতে শুরু করে।

কেন ব্রাজিলিয়ানরা সাম্বা শুরু করেছিল

সাম্বা দে রোডা বা সাম্বার জন্ম শুধু বিনোদনের জন্য ছিল না, এটি ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও আত্মপরিচয়ের প্রকাশ। সাম্বা দে রোডা হলো সঙ্গীত, নৃত্য এবং কবিতার সমন্বয়ে গঠিত একটি জনপ্রিয় উৎসব। দাসপ্রথার সময় আফ্রিকান মানুষদের নিজেদের সংস্কৃতি প্রকাশের স্বাধীনতা ছিল সীমিত। তাই তারা সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে নিজেদের আবেগ, দুঃখ, আশা এবং প্রতিবাদ প্রকাশ করত।

Advertisement

ক্যাথলিক ছুটির দিন বা আফ্রো-ব্রাজিলীয় ধর্মীয় উৎসবের মতো নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে, এমনকি স্বতঃস্ফূর্তভাবেও মানুষকে একত্রিত করতে এই নাচ তারা নাচতেন। মূলত সেসময় এই নাচ ছিল তাদের জন্য মানসিক মুক্তির মাধ্যম, সম্প্রদায়ের বন্ধন শক্ত করার উপায়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতি সংরক্ষণের পথ। কিন্তু সাম্বা ধীরে ধীরে ব্রাজিলিয়ান পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। যা আজ পুরো বিশ্বের কাছে পরিচিত।

বিশ্বে সাম্বার পরিচিতি যেভাবে

২০শ শতকের শুরুতে সাম্বা ব্রাজিলের বাইরে পরিচিতি পেতে শুরু করে। ১৯১৭ সালে রেকর্ড হওয়া ‘পেলে টেলিফোনো’ গানটিকে অনেকেই প্রথম আধুনিক সাম্বা গান হিসেবে বিবেচনা করেন। এরপর রিও কার্নিভাল এবং সাম্বা স্কুলগুলোর মাধ্যমে এটি আরও জনপ্রিয় হয়।

১৯৩০-এর দশকে ব্রাজিল সরকার সাম্বাকে জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকেই পর্যটন, চলচ্চিত্র এবং আন্তর্জাতিক উৎসবের মাধ্যমে সাম্বা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আজ সাম্বা শুধু ব্রাজিলে নয়, ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়াসহ প্রায় সব মহাদেশেই জনপ্রিয় একটি নৃত্যশৈলী।

বিশ্বকাপ ও সাম্বার সম্পর্ক

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিলের উচ্ছ্বাস, গান আর নাচ। ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা স্টেডিয়ামে ও রাস্তায় সাম্বার মাধ্যমে তাদের দলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে। বিশেষ করে বিশ্বকাপ চলাকালে সাম্বা হয়ে ওঠে ফুটবল ফেস্টিভ্যালের প্রাণ। ব্রাজিলের পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল তাদের খেলার মতোই সাম্বার মতোই সৃজনশীল ও প্রাণবন্ত। তাই অনেক সময় সাম্বা ও ব্রাজিল ফুটবল একে অপরের প্রতীক হয়ে ওঠে।

Advertisement

সাম্বা: সংগ্রামের ইতিহাস

সাম্বার ইতিহাস যতটা আনন্দের, ততটাই কষ্টের। দাসপ্রথার ভয়াবহ বাস্তবতা, বর্ণবৈষম্য এবং সামাজিক অবহেলা এই নাচের জন্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। অনেক সময় আফ্রিকান সংস্কৃতিকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু মানুষ গোপনে এই নাচ ও সংগীত ধরে রেখেছিল।

এই সংগ্রামের কারণেই সাম্বা আজ শুধু নাচ নয় এটি একটি ইতিহাস, একটি প্রতিবাদ এবং একটি বেঁচে থাকার গল্প। সাম্বা ব্রাজিলের হৃদস্পন্দন। আফ্রিকার দুঃখ, ব্রাজিলের সংস্কৃতি এবং ইউরোপীয় প্রভাব সব মিলিয়ে এটি এক অনন্য সাংস্কৃতিক মিশ্রণ। বিশ্বকাপের সময় যখন হাজারো মানুষ সাম্বার তালে নাচে, তখন তা শুধু বিনোদন নয়, বরং ইতিহাসের এক জীবন্ত উদযাপন।

সূত্র: ইউনেস্কো আর্কাইভ, ইউনেস্কো ইন্টানজিবল কালচার হেরিটেজ, ব্রিটানিকা

কেএসকে