ধর্ম

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়: হাজার বছরের আলোকযাত্রা

বিশ্বের ইতিহাসে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় এক অনন্য নাম। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে জ্ঞান, সংস্কৃতি, ধর্মচিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের কেন্দ্র হিসেবে আল-আজহার তার স্বতন্ত্র মর্যাদা ধরে রেখেছে।

Advertisement

মিশরের রাজধানী কায়রোর প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী জ্ঞানকেন্দ্র। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য আলেম, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও রাষ্ট্রনায়কের পদচারণায় মুখর এই প্রতিষ্ঠান আজও বিশ্বজুড়ে লাখো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের ঠিকানা।

একটি মসজিদ থেকে যাত্রা

দশম শতাব্দীর শেষভাগে ফাতেমি খেলাফতের উত্থানের সময় মিশরে একটি নতুন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা তৈরি হয়। ৯৭০ খ্রিস্টাব্দে ফাতেমি খলিফা আল-মুইজ লি-দীনিল্লাহর নির্দেশে কায়রো নগরীতে নির্মিত হয় আল-আজহার মসজিদ। মূলত এটি ছিল ইসমাঈলি শিয়া মতবাদের প্রচার ও প্রসারের কেন্দ্র।

মসজিদ নির্মাণের পরপরই এখানে নিয়মিত শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয়। ধর্মীয় আলোচনা, কোরআন শিক্ষা এবং ইসমাঈলি দর্শনের পাঠদান চলতে থাকে। ধীরে ধীরে আল-আজহার একটি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তবে সে সময় এর পরিধি ছিল সীমিত এবং পাঠ্যক্রমও একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শকেন্দ্রিক।

Advertisement

ফাতেমি শাসকদের লক্ষ্য ছিল কেবল ধর্মীয় শিক্ষা নয়; বরং একটি শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডল তৈরি করা, যার মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠা পাবে। এই উদ্দেশ্যেই আল-আজহারের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের গল্প

৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে আল-আজহারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। ফাতেমি সাম্রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রী ইয়াকুব ইবনে কিলিস উপলব্ধি করেছিলেন যে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেবল মতবাদভিত্তিক পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তার প্রভাব বিস্তার সম্ভব নয়।

তার উদ্যোগে আল-আজহারের পাঠ্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আরবি ভাষা ও সাহিত্য, ব্যাকরণ, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং অন্যান্য জ্ঞানশাখা যুক্ত করা হয়। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যসূচি প্রণয়ন এবং নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আল-আজহার ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।

এই পরিবর্তন ছিল যুগান্তকারী। কারণ মধ্যযুগে যখন অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সীমিত বিষয়ে পাঠদান করত, তখন আল-আজহার বহুমাত্রিক জ্ঞানের সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এখান থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ ‘বিশ্ববিদ্যালয়জীবন’।

Advertisement

আরও পড়ুন ইসলামে প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র দারুল আরকাম ফাতেমি থেকে আইয়ুবি: পরিবর্তনের অধ্যায়

ইতিহাসের নিয়মই হলো পরিবর্তন। ১১৭১ সালে ফাতেমি খিলাফতের পতন ঘটে এবং সালাহউদ্দিন আইয়ুবি মিশরে সুন্নি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। রাজনৈতিক এই পরিবর্তনের প্রভাব আল-আজহারের ওপরও পড়ে।

সালাহউদ্দিন প্রথমদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে এখানে শিয়া মতবাদকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল। পরবর্তীতে পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন করে শিয়া মতাদর্শের বিষয়গুলো বাদ দেওয়া হয় এবং সুন্নি ইসলামি শিক্ষার ভিত্তিতে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু হয়।

এটি ছিল আল-আজহারের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর। সুন্নি মুসলিম বিশ্বের কাছে তখন থেকে আল-আজহারের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়তে থাকে। যে প্রতিষ্ঠান একসময় একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের শিক্ষাকেন্দ্র ছিল, তা ধীরে ধীরে বৃহত্তর মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

মামলুক যুগ: পুনর্জাগরণের স্বর্ণকাল

আল-আজহারের প্রকৃত উত্থান ঘটে মামলুক শাসনামলে। অনেক ঐতিহাসিক এই সময়কে আল-আজহারের ‘পুনর্জাগরণের যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন।

তেরো শতাব্দীতে মোঙ্গলদের ভয়াবহ আক্রমণে মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রস্থল বাগদাদ ধ্বংস হয়ে যায়। ১২৫৮ সালে আব্বাসীয় খিলাফতের পতনের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের প্রধান জ্ঞানকেন্দ্রগুলোর অনেকগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।

কিন্তু মিশর তখনো নিরাপদ ছিল। ফলে বাগদাদ, সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অসংখ্য আলেম, গবেষক, লেখক ও বিদ্বান মিশরে আশ্রয় নেন। তাদের অনেকেই আল-আজহারের সঙ্গে যুক্ত হন।

এই ঘটনাই আল-আজহারকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। বিভিন্ন অঞ্চল, ভাষা ও সংস্কৃতির জ্ঞানীরা একত্রিত হওয়ায় এখানে জ্ঞানচর্চার এক অসাধারণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ফিকহ, হাদিস, তাফসির, ভাষাবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস এবং সাহিত্যচর্চা নতুন মাত্রা লাভ করে।

সেই সময় থেকে আল-আজহার সুন্নি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

ওসমানীয় আমলে ধারাবাহিকতা

মামলুকদের পতনের পর মিশর ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। কিন্তু শাসন পরিবর্তন হলেও আল-আজহারের গুরুত্ব কমেনি।

বরং এই সময়েও আল-আজহার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে তার মর্যাদা বজায় রাখে। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসতেন। বহু খ্যাতিমান আলেম ও চিন্তাবিদ এখানে শিক্ষকতা করেছেন।

ওসমানীয় আমলে সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আল-আজহারের মতামত পুরো মুসলিম বিশ্বেই বিশেষ গুরুত্ব পেত।

আধুনিক যুগের নতুন অভিযাত্রা

বিশ শতকে বিশ্বব্যাপী জাতীয়তাবাদ ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্থান নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করে। মিশর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর আল-আজহারও আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে যায়।

১৯৬২ সালে প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের বিশ্ববিদ্যালয়টিকে জাতীয়করণ করেন। একই সঙ্গে পাঠ্যক্রমে ব্যাপক সংস্কার আনা হয়। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ব্যবসা প্রশাসন, কৃষিবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং মানবিক বিদ্যার নানা শাখা যুক্ত করা হয়।

এই সংস্কারের ফলে আল-আজহার একটি আধুনিক আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ের যে মডেল আজ বিশ্বজুড়ে আলোচিত, আল-আজহার তার একটি সফল উদাহরণ।

জ্ঞানের বিশ্বজনীন কেন্দ্র

বর্তমানে আল-আজহার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করেন। আরব বিশ্ব, আফ্রিকা, এশিয়া এবং ইউরোপের বহু দেশের শিক্ষার্থীদের মিলনস্থল এই বিশ্ববিদ্যালয়।

এখানে রয়েছে অসংখ্য অনুষদ ও শত শত বিভাগ। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক পেশাভিত্তিক শিক্ষা সমান গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালিত হয়। নারী শিক্ষার্থীদের জন্যও রয়েছে পৃথক অনুষদ ও বিশেষ ব্যবস্থা।

আল-আজহারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর আন্তর্জাতিক চরিত্র। জাতি, ভাষা কিংবা ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে এটি মুসলিম বিশ্বের একটি মিলনমঞ্চে পরিণত হয়েছে। একজন আফ্রিকান শিক্ষার্থী যেমন এখানে পড়াশোনা করেন, তেমনি দক্ষিণ এশিয়া কিংবা মধ্য এশিয়ার শিক্ষার্থীরাও সমানভাবে সুযোগ পান।

বাংলাদেশ ও আল-আজহার

বাংলাদেশের সঙ্গেও আল-আজহারের সম্পর্ক গভীর। বহু বাংলাদেশি আলেম ও গবেষক আল-আজহারে অধ্যয়ন করেছেন। তাদের অনেকেই দেশে ফিরে ইসলামি শিক্ষা, গবেষণা ও সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষার অনেক ক্ষেত্রে আল-আজহারের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বিশেষত আরবি ভাষা শিক্ষা, ইসলামি গবেষণা এবং মধ্যপন্থী ধর্মীয় চিন্তার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য।

আজও অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে আল-আজহারে পড়ার। কারণ এটি শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়; বরং একটি সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠার সুযোগ।

আরও পড়ুন মধ্যযুগে মুসলিম সভ্যতায় আলো জ্বেলেছিলেন যারা এক হাজার বছরের আলোকবর্তিকা

পৃথিবীতে গত এক হাজার বছরের ইতিহাসে বহু সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আবার ধ্বংসও হয়ে গেছে। ফাতেমি, আইয়ুবি, মামলুক, ওসমানীয়—কত শাসক, কত রাজবংশ সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। কিন্তু আল-আজহার রয়ে গেছে।

এর কারণ হলো, সময়ের সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করার অসাধারণ ক্ষমতা। যুগে আল-আজহার নিজেকে যুগোপযোগী করে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে।

আজ কায়রোর আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আল-আজহার যেন মুসলমানদের জ্ঞানচর্চার এক জীবন্ত ইতিহাস। এর মিনারগুলো শুধু একটি মসজিদের সৌন্দর্য বহন করে না; বরং বহন করে এক সহস্রাব্দের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, বিতর্ক, চিন্তা ও সৃজনশীলতার স্মৃতি।

ওএফএফ