দেশজুড়ে

পাবনায় খাল খননে অনিয়মের অভিযোগ, হুমকির মুখে শতাধিক বসতবাড়ি

পাবনার মালিগাছা ইউনিয়নে শংকরপুরে রত্নাই নদীর খাল খননে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী দখলদারদের জায়গা বাঁচাতে নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী খাল খনন করছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। খালের দুই পাড় সঠিকভাবে বাঁধাই না করায় ভাঙন ঝুঁকিতে খালপাড়ের শতাধিক বসতি বাড়ি।

Advertisement

এদিকে প্রতিকার চেয়ে দফায় দফায় ভুক্তভোগীরা খনন কাজ বন্ধ করে দিলে জেলা প্রশাসনের আশ্বাসে মঙ্গলবার (১৬ জুন) তা আবার শুরু হয়েছে।

প্রকল্প ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার মালিগাছা ইউনিয়নের মজিদপুর থেকে নারায়ণপুর, জোতকলসা ও ধরবিলা হয়ে বয়ে যাওয়া একসময়কার প্রবহমান রত্নাই নদীর পলি পড়ে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র নদীজুড়ে আড়াআড়ি বাঁধ (ক্রসবাঁধ) দিয়ে বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুর তৈরি করায় নদীটির স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন চ্যানেল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকট ও বর্ষা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় পড়ে মালিগাছাসহ কয়েকটি ইউনিয়নের শত শত বিঘা কৃষি আবাদি জমি। সারাদেশেই এ ধরণের সংকট মেটাতে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্ধ হয়ে যাওয়া খাল খননের উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় পাবনার রত্নাই নদীর খাল খননে সম্প্রতি ৬ কোটি ৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

পাউবো বলছে, এই প্রকল্পের কাজ পায় কুষ্টিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নাসিরুদ্দিন মোল্লা। তবে এটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় ঠিকাদার কাওছার আহমেদ কনকসহ কয়েকজন। এই প্রকল্পের আওতায় মালিগাছা ইউনিয়নের মজিদপুর থেকে নারায়ণপুর, জোতকলসা ও ধরবিলা হয়ে ভজেন্দ্রপুর পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ কিলোমিটার খাল খনন করা হচ্ছে। কিন্তু শুরুতেই খনন নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে। অনিয়মের প্রতিবাদ ও নকশা অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়নের দাবিতে, ১২ জুন খননকাজ বন্ধ করে দেয় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।

Advertisement

সরেজমিনে দেখা যায়, খালটির খনন কাজ শুরু হয়েছে মালিগাছা ইউনিয়নের টেবুনিয়ার মজিদপুর মহাসড়কের পাশে থেকে।

স্থানীয়রা জানান, মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এই অংশে কিছুটা নিয়ম মেনে খনন করলেও অন্যান্য অংশে ব্যাপক অনিয়ম করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুরু থেকে এই খালের জায়গা সরকারের হলেও স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র এগুলো নিজেদের দাবি করে দখলে নেয়। এই দখলদারদের পশ্চিম পাশের জায়গা বাঁচাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিাকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে খালের সোজা পথ ধরে খনন না করে পূর্বপাশের বসতি ঘেঁষে খাল খনন শুরু করে। এতে বসতি বাড়ি ধসের পড়ার উপক্রম হয়েছে। খননকৃত মাটি দিয়ে দুইপাশে পাড় বেঁধে দেওয়ার কথা থাকলেও তা করছে না ঠিকাদার। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে লুটে নেওয়া হচ্ছে উত্তোলন করা মাটি।

মালিগাছা ইউনিয়নের নারায়ণপুরের বাসিন্দা রবিউল জাগো নিউজকে বলেন, শুরুর ৮-৯ কিলোমিটার সোজা ও সঠিক পথ বা নকশা অনুযায়ী খনন করা হয়েছে। কিন্তু জোতকলসা-নারায়ণপুর থেকে ভজেন্দ্রপুর ট্রেনলাইন পর্যন্ত এই অংশে নিয়ম মেনে খনন করা হচ্ছে না। এতে সামান্য বৃষ্টি বা পানির স্রোত এলেই এই মাটি ধসে নদীপাড়ের শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হবার উপক্রম হয়েছে।

Advertisement

আরেক ভুক্তভোগী মো. লালন বলেন, আমরা চাই সবার কল্যাণে এই খাল খনন হোক। কিন্তু সেটি অন্যায়ভাবে কারো ক্ষতি করে নয়। পাশে জায়গা রেখে আমাদের ব্যক্তি মালিকানা জায়গার বসতি কেটে খাল করা হচ্ছিলো। পাড় না বেঁধে মাটি লুটে নেওয়া হচ্ছিলো। উপায় না পেয়ে অনিয়ম ঠেকাতে আমরা কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তবে সবশেষ নিয়ম মেনে কাজ হবে বলে ডিসি আশ্বাস দিয়েছেন। আমাদের ক্ষতি বা অনিয়ম করা যাবে না।

জোতকলসা গ্রামের মোছা. হালিমা বলেন, ঠিকাদার ও পানি উন্নয়ন বোর্ড দখলদার পুকুর মালিকদের সঙ্গে মিলে বাড়িঘর প্যাচায় খাল কাটছে। এই বাড়ি তো যেকোনো সময় ধসেসে পড়বে। এই ক্ষতিপূরণ কে দেবে।

মালিগাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ মুনতাজ আলী বলেন, নদী খননের এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু যেভাবে সিএস নকশা অমান্য করে প্রভাবশালী সুবিধাভোগীদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষ চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকার এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

নকশা বাস্তবায়নে জটিলতা রয়েছে জানিয়ে পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের প্রায় ৯ কিলোমিটার খাল খনন শেষ হয়েছে। কিন্তু আইনি জটিলতায় ওই এক কিলোমিটার অংশ খননে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।

এদিকে নকশা অনুযায়ী খননের দাবিতে বিক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা কাজ বন্ধ করে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সোমবার (১৫ জুন) সকালে রত্নাই নদী পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম।

তিনি জাগো নিউজকে জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষতি না করে নকশা অনুযায়ী কাজ করার জন্য পাউবো ও ঠিকাদারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইনি জটিলতার বিষয়টিও দ্রুত সুরাহার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোন অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না।

আলমগীর হোসাইন নাবিল/এনএইচআর/জেআইএম