মতামত

পূর্বাচল সচল হবে কবে?

ঢাকা শহর যেন নিজের ভারেই ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন সকালে রাজধানী জেগে ওঠে যানজটের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে, আর রাতে ঘুমাতে যায় ক্লান্ত অবকাঠামো, অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও সীমাহীন নগরচাপের বোঝা বুকে নিয়ে। একসময় যে শহরটি ছিল কয়েক লাখ মানুষের আবাসস্থল, আজ সেখানে দুই কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রায় সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে রাজধানীর ওপর চাপ কমানোর প্রশ্নটি এখন আর কেবল নগর পরিকল্পনার বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের একটি অপরিহার্য অংশ।

Advertisement

এই বাস্তবতায় পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পকে অনেকেই বাংলাদেশের নগর উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু দুই দশকেরও বেশি সময় পার হওয়ার পরও প্রশ্নটি রয়ে গেছে—পূর্বাচল সচল হবে কবে?

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের যাত্রা শুরু ১৯৯৫ সালে। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন পায়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রায় ৬ হাজার একরেরও বেশি এলাকা নিয়ে গাজীপুর ও রূপগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ কমানো, একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত উপশহর গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতের নগরায়ণের জন্য বিকল্প কেন্দ্র সৃষ্টি করা।

পূর্বাচল প্রকল্পের বয়স প্রায় তিন দশক হতে চলেছে। একটি নতুন প্রজন্ম বড় হয়ে গেছে, কিন্তু প্রকল্পটির পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। যারা প্লট কিনেছেন, তারা অপেক্ষা করছেন। যারা ঢাকার যানজটে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করছেন, তারাও অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষা করছে একটি দেশ, যে দেশ তার রাজধানীকে বাসযোগ্য রাখতে চায়।

Advertisement

সেই সময় প্রকল্পটি ছিল দূরদর্শী এক উদ্যোগ। কারণ তখনই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন যে ঢাকা দীর্ঘমেয়াদে বর্তমান জনসংখ্যার চাপ বহন করতে পারবে না। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন নগর পরিকল্পনাবিদ বহুবার বলেছেন, অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত নগরায়ণ একটি দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও জীবনমান উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। ঢাকার বর্তমান বাস্তবতা সেই সতর্কবার্তারই প্রতিফলন।

পূর্বাচল ঘিরে মানুষের স্বপ্নও ছিল বড়। প্রশস্ত সড়ক, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিকল্পিত আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, বিনোদনকেন্দ্র, প্রশাসনিক অবকাঠামো এবং উন্নত যোগাযোগব্যবস্থাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন শহর গড়ে তোলার কথা ছিল। হাজার হাজার মানুষ নিজেদের সঞ্চয়, অবসরভাতা কিংবা জীবনের অর্জিত অর্থ বিনিয়োগ করে সেখানে প্লট কিনেছেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যেই সেখানে বসবাস শুরু করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা আজও ভিন্ন।

পূর্বাচলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সড়ক নির্মাণ হয়েছে, প্লট হস্তান্তর হয়েছে, কিছু অবকাঠামো দৃশ্যমান হয়েছে; কিন্তু একটি শহর শুধু রাস্তা আর প্লটের সমষ্টি নয়। একটি শহর তখনই জীবন্ত হয়, যখন সেখানে মানুষ বসবাস করে, শিশু স্কুলে যায়, রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা পায়, ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে ওঠে, গণপরিবহন চলে এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে পূর্বাচলে এখনো এই মৌলিক উপাদানগুলোর অনেকটাই অনুপস্থিত। পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই, মানসম্মত হাসপাতাল নেই, বাণিজ্যিক কার্যক্রম সীমিত, গণপরিবহন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত এবং অনেক এলাকায় বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধাও গড়ে ওঠেনি। ফলে যাঁরা প্লট পেয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাচ্ছেন না।

Advertisement

এর অন্যতম কারণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। ভূমি উন্নয়ন, নকশা অনুমোদন, ইউটিলিটি সংযোগ, সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু পূর্বাচলের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন প্রকল্পে এই দীর্ঘসূত্রতা আরও বেশি দৃশ্যমান। অথচ পূর্বাচল সচল হলে এর প্রভাব শুধু একটি নতুন আবাসিক এলাকা তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি ঢাকার নগর কাঠামোকেই বদলে দিতে পারে।

রাজধানীর বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন উত্তরার পরবর্তী অঞ্চল, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ কিংবা পূর্বাচল থেকে ঢাকায় যাতায়াত করেন। যদি পূর্বাচলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রশাসন ও আবাসনের সমন্বিত কেন্দ্র গড়ে ওঠে, তাহলে মানুষের ঢাকামুখী চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। কর্মসংস্থান বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হবে। সড়কে যানবাহনের চাপ কমবে। আবাসন ব্যয়ও তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।

বিশ্বে এমন উদাহরণ অনেক রয়েছে। মালয়েশিয়ার পুত্রজায়া সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। ১৯৯০-এর দশকে কুয়ালালামপুরের ওপর চাপ কমাতে সরকার পরিকল্পিতভাবে নতুন প্রশাসনিক রাজধানী গড়ে তোলে। আজ পুত্রজায়া শুধু সরকারি কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়; এটি আধুনিক নগর পরিকল্পনার সফল মডেল হিসেবেও স্বীকৃত।

দক্ষিণ কোরিয়ার সেজং সিটি, ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়া কিংবা মিশরের নতুন প্রশাসনিক রাজধানী—সব ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য ছিল নগর বিকেন্দ্রীকরণ। এসব প্রকল্পের সাফল্যের পেছনে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল: সরকার শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করেনি, বরং মানুষকে সেখানে বসবাস ও কাজ করতে উৎসাহিত করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান ও সেবা নিশ্চিত করেছে।

বাংলাদেশেও পূর্বাচলকে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে। সম্প্রতি রাজধানীর যানজট নিরসনে সরকার স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে মহাখালী বাস টার্মিনালের বাসগুলোর ডিপো অস্থায়ীভাবে পূর্বাচলে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানা গেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ বড় পরিবহন অবকাঠামো পূর্বাচলমুখী হলে ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বৃদ্ধি পাবে। তবে শুধু বাস ডিপো স্থানান্তর করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

পূর্বাচলকে কার্যকর করতে হলে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন জরুরি। দ্রুতগতির গণপরিবহন ব্যবস্থা, মেট্রোরেল ও বিআরটি নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, প্রশাসনিক কার্যালয় স্থানান্তর এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক নাগরিক সেবাগুলো নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সরকার যদি পূর্বাচলকে কেবল একটি আবাসন প্রকল্প হিসেবে দেখে, তাহলে এর সম্ভাবনা সীমিত থাকবে। কিন্তু যদি এটিকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নগর উন্নয়নের কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে এটি জাতীয় অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

আজ ঢাকা এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে শুধু নতুন ফ্লাইওভার বা আরও কিছু সড়ক নির্মাণ করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন জনসংখ্যা, কর্মসংস্থান ও সেবার বিকেন্দ্রীকরণ। পূর্বাচল সেই সুযোগটি তৈরি করতে পারে।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনো সেই সুযোগকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রস্তুত?

পূর্বাচল প্রকল্পের বয়স প্রায় তিন দশক হতে চলেছে। একটি নতুন প্রজন্ম বড় হয়ে গেছে, কিন্তু প্রকল্পটির পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। যারা প্লট কিনেছেন, তারা অপেক্ষা করছেন। যারা ঢাকার যানজটে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করছেন, তারাও অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষা করছে একটি দেশ, যে দেশ তার রাজধানীকে বাসযোগ্য রাখতে চায়।

পূর্বাচল কেবল একটি আবাসন প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নগর সভ্যতার পরীক্ষাগার। এই প্রকল্প সচল হলে শুধু কয়েক হাজার প্লট মালিক উপকৃত হবেন না, উপকৃত হবে পুরো দেশ। ঢাকা কিছুটা স্বস্তি পাবে, অর্থনীতি নতুন গতি পাবে, নাগরিক জীবন হবে আরও সুশৃঙ্খল।তাই এখন প্রশ্ন হলো, ‘পূর্বাচল সচল করতে আমরা আর কতদিন অপেক্ষা করব?’

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com

এইচআর/এমএফএ/এএসএম