আন্তর্জাতিক

অস্ট্রেলিয়ায় মুসলিম অভিবাসন বন্ধ চান সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী

‘কট্টর ইসলামী’ দেশগুলো থেকে অভিবাসন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার ডানপন্থি রাজনৈতিক দল ওয়ান নেশনের (One Nation) নেত্রী ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী পলিন হ্যানসন (Pauline Hanson)। সেই সঙ্গে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক নীতি বাতিলেরও আহ্বান জানিয়েছেন।

Advertisement

মঙ্গলবার (১৬ জুন) ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে পলিন হ্যানসন তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া বহুজাতিক হতে পারে, কিন্তু দেশটিকে অবশ্যই একক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের রাষ্ট্র হতে হবে।

অভিবাসন, ট্রান্সজেন্ডার অধিকার, গর্ভপাত, কর্মসংস্থান আইনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন হ্যানসন। তবে পুরো ভাষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল করোনা মহামারির পর অস্ট্রেলিয়ায় বেড়ে যাওয়া অভিবাসন।

হ্যানসনের দাবি, অতিরিক্ত অভিবাসনের কারণেই দেশটিতে আবাসন সংকট ও সাংস্কৃতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার একটি ‘অভিবাসন বিপর্যয়’ (immigration catastrophe) পরিচালনা করছে।

Advertisement

তার ভাষায়, ব্যর্থ বহুসাংস্কৃতিক নীতির অধীনে সব সংস্কৃতিকেই আমাদের সংস্কৃতির সমমর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। এর বিরোধিতা করাটা বর্ণবাদ নয়, বরং সাধারণ জ্ঞান।

পলিন হ্যানসন বলেন, অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক নীতি ‘সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ’। তার মতে, দেশটি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিয়ে গঠিত হলেও একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয় থাকা প্রয়োজন।

তিনি পুনরায় ঘোষণা করেন যে, তার দল এমন দেশগুলো থেকে অভিবাসনের বিরোধিতা করে, যেগুলো তার ভাষায় ‘কট্টর ইসলামে নিমজ্জিত’।

এর আগে ইসলাম ও এশীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ানদের নিয়ে তার বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে অন্য রাজনীতিকরা তাকে বর্ণবাদী বলে অভিযুক্ত করেছিলেন। তবে ভাষণে তিনি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন।

Advertisement

যদিও তিনি স্বীকার করেন, তার দলের অবস্থানে ‘অনেক মানুষ’ ক্ষুব্ধ বা কষ্ট পেয়েছেন।

পাকিস্তান বিতর্কের প্রসঙ্গ

২০২৪ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম মুসলিম নারী সিনেটর মেহরিন ফারুকিকে ‘পাকিস্তানে ফিরে যাও’ বলে মন্তব্য করায় হ্যানসনকে অস্ট্রেলিয়ার বর্ণবৈষম্যবিরোধী আইন লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।

তবে ভাষণে তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় ও মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে ঘরে ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলা অস্ট্রেলীয়দের প্রসঙ্গ তোলেন।

মানুষ যদি ভাষাই না বলতে পারে, তাহলে সামাজিক সংহতি কীভাবে তৈরি হবে- প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, মানুষ যেন নিজেদের পেছনে ফেলে আসা সমস্যাগুলো অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে না আসে।

তার মতে, কেউ অস্ট্রেলিয়ায় এসে দেশের মূল্যবোধ, ভাষা, ঐতিহ্য, পোশাক ও দেশটি যে প্রধানত ইহুদী-খ্রিস্টান সমাজ, তা উপেক্ষা করতে পারে না।

শ্রমনীতি ও মজুরি নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য

হ্যানসন দাবি করেন, তার দল শ্রমজীবী অস্ট্রেলিয়ানদের পক্ষে অবস্থান নেয়। তবে তিনি একইসঙ্গে বলেন, শিল্প ও শ্রম আইনের সংস্কার প্রয়োজন এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।

শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির বিরোধিতা ও ‘একই চাকরিতে সমান বেতন’ বা ‘same job, same pay’ আইনের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি তার সমালোচনা করেছে।

জবাবে হ্যানসন বলেন, অন্য দিকটাও দেখতে হবে। ব্যবসাগুলো কি সত্যিই সেই মজুরি দিতে সক্ষম? তিনি স্বীকার করেন যে মানুষ বিল পরিশোধে সমস্যায় রয়েছে, তবে তার মতে শ্রমিক ও ব্যবসার মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা দরকার।

তিনি আরও বলেন, ব্যবসাগুলোর কর্মচারী ছাঁটাইয়ের ক্ষমতা বাড়ানো উচিত। তার অভিযোগ, অনেক কর্মী মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, কাজ করে না, কাজে আসে না ও অলস আচরণ করে। তার দাবি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিবর্তন চায়।

নারী-পুরুষ মজুরি বৈষম্য নিয়ে হ্যানসনের অবস্থান

নারী ও পুরুষের মধ্যে স্থায়ী মজুরি বৈষম্য রয়েছে- এ ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেন হ্যানসন। তার ভাষায়, এসব ধোঁয়াশা ও বিভ্রম ছাড়া কিছু নয়।

তিনি বলেন, যদি কোনো নারী ছুটি নেন ও কাজ না করেন, তাহলে সেই সময় তাকে মজুরি দেওয়া হবে না- এটাই স্বাভাবিক। তার মতে, মজুরি ব্যবধানের একটি কারণ এটিও।

এদিকে, ওয়ান নেশন বর্তমানে বিবেচনা করছে, পেনশনভোগী ও শিক্ষার্থীদের সীমাহীন সময় কাজ করার সুযোগ দেওয়া যায় কি না, যাতে তাদের সরকারি সহায়তা কমে না যায়। পাশাপাশি অতিরিক্ত সময় কাজের (ওভারটাইম) ওপর কর কমানোর বিষয়টিও দলটি ভাবছে।

ট্রান্সজেন্ডার অধিকার ও গর্ভপাত নিয়ে অবস্থান

হ্যানসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ক্ষমতায় গেলে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সেক্স ডিসক্রিমিনেশন কমিশনারকে বরখাস্ত করবেন। তার দাবি, ট্রান্সজেন্ডার মতাদর্শ পুরো সমাজকে ‘দূষিত’ করছে। ‘ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলন’ একটি ‘আক্রমণাত্মক শক্তি’ ও এটিকে মোকাবিলা করতে হবে।

গর্ভপাতের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেননি, তবে জন্মের ঠিক আগ মুহূর্তে গর্ভপাতের বিরোধিতা করেন।

অস্ট্রেলিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে ২২ থেকে ২৪ সপ্তাহের পর গর্ভপাত কেবল চিকিৎসাগত কারণেই করা যায় ও দ্বিতীয় একজন চিকিৎসকের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।

তবে মায়ের জীবন ঝুঁকিতে থাকলে দেরিতে গর্ভপাতের পক্ষে তিনি এখনো সমর্থন বজায় রেখেছেন।

প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সমালোচনা

হ্যানসনের ভাষণের আগে সংবাদ সম্মেলনে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, ওয়ান নেশন অস্ট্রেলিয়াকে ঐক্যবদ্ধ নয়, বিভক্ত করতে চায়।

তিনি বলেন, তারা শ্রমজীবী মানুষের কথা বলে, কিন্তু শ্রমিকদের জন্য প্রস্তাবিত প্রতিটি উদ্যোগ- যেমন মজুরি বৃদ্ধির বিরোধিতা করে। তারা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হওয়ার দাবি করে, কিন্তু বাস্তবে তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না। তারা অস্ট্রেলিয়াকে একতাবদ্ধ নয়, বিভক্ত করে।

অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর বলেন, ওয়ান নেশন এখনো দেশের জন্য কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা’ উপস্থাপন করতে পারেনি। দলটিকে জবাবদিহি আওতায় আনা ও তাদের কার্যক্রমের কঠোর পর্যালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: এবিসি

এসএএইচ