মানুষের প্রতিটি মস্তিষ্ক একরকম নয়। কেউ দ্রুত কথা বলেন, কেউ চুপচাপ থাকতে পছন্দ করেন। কেউ ভিড় এড়িয়ে চলেন, আবার কেউ ছোট ছোট বিষয়ে অসাধারণ মনোযোগ দিতে পারেন। এই ভিন্নতাই মানুষকে আলাদা করে তোলে। অথচ সমাজ এখনো অনেক ক্ষেত্রে ‘স্বাভাবিক’ হওয়ার একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি করে রেখেছে। সেই মানদণ্ডের বাইরে গেলেই শুরু হয় ভুল বোঝাবুঝি, অবহেলা কিংবা বৈষম্য।
Advertisement
আজ অটিস্টিক প্রাইড ডে। প্রতি বছর ১৮ জুন দিবসটি পালিত হয় বিশ্বজুড়ে। এই দিনটি কোনো সহানুভূতি দেখানোর দিন নয়, বরং অটিজমকে মানুষের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যের একটি অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দিন। এটি আত্মমর্যাদা, গ্রহণযোগ্যতা এবং সম্ভাবনার কথা বলে।
আরও পড়ুন বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস / আসক্তির ধোঁয়ায় নিঃশেষ হয় স্বপ্ন আর স্বাস্থ্য অটিজম মানেই সীমাবদ্ধতা নয়অনেকেই এখনো মনে করেন অটিজম একটি ‘সমস্যা’ বা ‘অক্ষমতা’। বাস্তবে অটিজম হলো নিউরোডাইভারসিটির একটি অংশ। অর্থাৎ কিছু মানুষের মস্তিষ্ক অন্যদের তুলনায় একটু ভিন্নভাবে কাজ করে। তারা পৃথিবীকে দেখেন, বোঝেন এবং অনুভব করেন আলাদা উপায়ে।
কেউ হয়তো সামাজিক যোগাযোগে অস্বস্তি বোধ করেন, কেউ শব্দ বা আলোতে বেশি সংবেদনশীল হন, আবার কেউ নির্দিষ্ট বিষয়ে অসাধারণ দক্ষতা দেখান। অনেক অটিস্টিক ব্যক্তি গণিত, প্রযুক্তি, সংগীত, শিল্প কিংবা বিশ্লেষণধর্মী কাজে দারুণ পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
Advertisement
বিশ্বখ্যাত অনেক বিজ্ঞানী, শিল্পী ও প্রযুক্তিবিদের মধ্যেও অটিস্টিক বৈশিষ্ট্য ছিল বলে ধারণা করা হয়। কারণ ভিন্নভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাই অনেক সময় নতুন আবিষ্কার ও সৃজনশীলতার জন্ম দেয়।
আরও পড়ুন বিশ্ব এমএস দিবস / নীরব যুদ্ধে মানবদেহের অদৃশ্য প্রতিরক্ষা গল্প সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিই বড় চ্যালেঞ্জঅটিস্টিক ব্যক্তিদের সবচেয়ে বড় সমস্যা সবসময় অটিজম নয়, বরং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক পরিবার এখনো বিষয়টি লুকিয়ে রাখতে চান। স্কুল, কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক পরিবেশেও তারা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হন। কেউ চোখে চোখ রেখে কথা বলেন না বলে তাকে অহংকারী ভাবা হয়। কেউ বেশি চুপচাপ থাকলে তাকে অস্বাভাবিক বলা হয়। অথচ তারা শুধু পৃথিবীকে একটু ভিন্নভাবে অনুভব করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অটিস্টিক ব্যক্তিদের “পরিবর্তন” করার চেয়ে তাদের বোঝা এবং সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিটি মানুষই নিজের মতো করে শেখে, বেড়ে ওঠে এবং প্রকাশ করে।
আরও পড়ুন সুস্থ পরিপাকতন্ত্র ছাড়া সুস্থ জীবন অসম্ভব পরিবার ও সচেতনতার ভূমিকাএকজন অটিস্টিক শিশুর বিকাশে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধৈর্য, ভালোবাসা এবং সঠিক সহযোগিতা তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে। শিশুকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা না করে তার নিজস্ব দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
Advertisement
বর্তমানে বাংলাদেশেও অটিজম নিয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় বেড়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংগঠন এবং অভিভাবকরা এ বিষয়ে কাজ করছেন। তবে এখনো অনেক পথ বাকি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
আরও পড়ুন একজন ধূমপায়ী, ঝুঁকিতে পুরো পরিবার ‘স্বাভাবিক’ হওয়ার চাপ কেন?সমাজে এখনো একটি ধারণা প্রচলিত-সবাইকে একইভাবে আচরণ করতে হবে, একইভাবে কথা বলতে হবে কিংবা একই গতিতে চলতে হবে। কিন্তু বাস্তবে মানুষ কখনোই একরকম নয়। অটিস্টিক প্রাইড ডে সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এটি বলে, ভিন্ন হওয়া কোনো লজ্জার বিষয় নয়। বরং এই ভিন্নতার মাঝেই লুকিয়ে থাকতে পারে অসাধারণ প্রতিভা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং সৃজনশীল শক্তি।
একজন অটিস্টিক শিশু হয়তো প্রচলিত নিয়মে কথা বলতে দেরি করে, কিন্তু ছবি আঁকায় অসাধারণ হতে পারে। কেউ হয়তো সামাজিক মেলামেশায় অস্বস্তি বোধ করেন, কিন্তু জটিল কোনো সমস্যার সমাধান খুব সহজে বের করতে পারেন।
সহানুভূতি নয়, দরকার সম্মানঅটিস্টিক ব্যক্তিদের করুণা নয়, প্রয়োজন সম্মান ও সমান সুযোগ। তাদের নিয়ে উপহাস করা, অবহেলা করা কিংবা আলাদা করে দেখা সমাজকে আরও সংকীর্ণ করে তোলে। বরং আমাদের উচিত এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে প্রত্যেকে নিজের স্বকীয়তা নিয়ে বাঁচতে পারেন। যেখানে ‘ভিন্ন’ হওয়াকে দুর্বলতা নয়, মানবিক বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য হিসেবে দেখা হবে।
আরও পড়ুন সুস্থ বার্ধক্যে প্রয়োজন ভালোবাসা ও সম্মান ভিন্নতার মধ্যেই ভবিষ্যতের শক্তিআজকের পৃথিবী দ্রুত বদলাচ্ছে। নতুন চিন্তা, সৃজনশীলতা এবং আলাদা দৃষ্টিভঙ্গিই ভবিষ্যতের বড় শক্তি হয়ে উঠছে। তাই অটিস্টিক মানুষদের সম্ভাবনাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
অটিস্টিক প্রাইড ডে আমাদের মনে করিয়ে দেয়-প্রতিটি মানুষ গুরুত্বপূর্ণ। কেউ হয়তো প্রচলিত পথে হাঁটেন না, কিন্তু তার মধ্যেও রয়েছে আলো ছড়ানোর ক্ষমতা। কারণ মানুষকে ‘স্বাভাবিক’ হওয়ার ছাঁচে ফেলার চেয়ে তার নিজস্বতাকে সম্মান করাই একটি সভ্য সমাজের পরিচয়।
জেএস/