লাইফস্টাইল

স্বাদে ঐতিহ্য, চর্চায় টেকসই খাদ্যব্যবস্থা

খাবার শুধু ক্ষুধা মেটানোর উপকরণ নয়, এটি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি দেশের ইতিহাস, কৃষি, আবহাওয়া ও মানুষের জীবনধারার প্রতিফলনও দেখা যায় তার খাদ্যাভ্যাসে।

Advertisement

তবে আধুনিক ভোগবাদী পৃথিবীতে খাবারের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একদিকে বাড়ছে অপচয়, অন্যদিকে পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থার ওপর তৈরি হচ্ছে চাপ। এমন বাস্তবতায় টেকসই খাদ্যব্যবস্থার গুরুত্ব দিন দিন আরও বাড়ছে।

আজ টেকসই গ্যাস্ট্রোনমি দিবস। প্রতি বছর ১৮ জুন দিবসটি পালিত হয় বিশ্বজুড়ে। জাতিসংঘের উদ্যোগে চালু হওয়া এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো এমন খাদ্যব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা, যা পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যসম্মত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ।

আরও পড়ুন সুস্থ পরিপাকতন্ত্র ছাড়া সুস্থ জীবন অসম্ভব গ্যাস্ট্রোনমি মানে শুধু সুস্বাদু খাবার নয়

‘গ্যাস্ট্রোনমি’ শব্দটি অনেকের কাছে শুধু বিলাসবহুল খাবার বা রেস্তোরাঁ সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত মনে হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ আরও বিস্তৃত। এটি খাবারের ইতিহাস, রান্নার পদ্ধতি, কৃষি, সংস্কৃতি এবং মানুষের খাদ্যচর্চার সামগ্রিক ধারণাকে বোঝায়।

Advertisement

অন্যদিকে ‘টেকসই গ্যাস্ট্রোনমি’ বলতে বোঝায় এমন খাদ্যচর্চা, যেখানে খাবার উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবেশন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পরিবেশ, কৃষক, সংস্কৃতি এবং মানুষের স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

সহজভাবে বললে, এমন খাবার ব্যবস্থা যেখানে প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, কৃষক ন্যায্য মূল্য পান এবং মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করতে পারেন-সেটিই টেকসই খাদ্যব্যবস্থা।

আরও পড়ুন ফিস্টুলামুক্ত জীবন হোক প্রতিটি নারীর অধিকার খাবারের অপচয় এখন বৈশ্বিক সমস্যা

বর্তমান বিশ্বে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট হয়। অথচ একই সময়ে কোটি কোটি মানুষ অপুষ্টি ও খাদ্যসংকটে ভুগছেন। অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত খাবার তৈরি, রেস্তোরাঁয় অপচয় কিংবা বাসাবাড়িতে অপ্রয়োজনীয় খাবার ফেলে দেওয়া এখন সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খাবারের এই অপচয় শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, পরিবেশের ওপরও বড় প্রভাব ফেলে। কারণ একটি খাবার উৎপাদনের পেছনে ব্যবহৃত হয় পানি, জমি, শ্রম ও জ্বালানি। খাবার নষ্ট হওয়া মানে সেই সম্পদেরও অপচয়।

Advertisement

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়তে হলে প্রথমেই কমাতে হবে খাবারের অপচয়। যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু গ্রহণ এবং অবশিষ্ট খাবারের সঠিক ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন প্রি-এক্লাম্পসিয়া দিবস / গর্ভকালীন জটিলতা রোধে সচেতনতাই হতে পারে সমাধান স্থানীয় খাবার ও কৃষির গুরুত্ব

টেকসই খাদ্যব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্থানীয় খাবার ও কৃষিকে গুরুত্ব দেওয়া। বিদেশি প্রক্রিয়াজাত খাবারের চেয়ে স্থানীয় ও মৌসুমি খাবার পরিবেশের জন্য তুলনামূলক ভালো।

বাংলাদেশের গ্রামীণ খাবারের সংস্কৃতিতে টেকসই খাদ্যচর্চার অনেক উদাহরণ রয়েছে। একসময় মানুষ মৌসুমি শাকসবজি, দেশীয় মাছ, ভাত, ডাল ও ঘরোয়া রান্নার ওপর নির্ভর করতেন। এতে যেমন পুষ্টি নিশ্চিত হতো, তেমনি স্থানীয় কৃষকরাও উপকৃত হতেন।

কিন্তু এখন ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিও হারিয়ে যেতে বসেছে।

খাদ্য ও পরিবেশের গভীর সম্পর্ক

খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার, বন উজাড়, প্লাস্টিক প্যাকেজিং এবং শিল্পভিত্তিক কৃষি পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশ্ব উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানির সংকটের মতো সমস্যার সঙ্গেও খাদ্যব্যবস্থা জড়িত। তাই এখন অনেক দেশ পরিবেশবান্ধব কৃষি ও জৈব খাদ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে।

আরও পড়ুন বিশ্ব থাইরয়েড দিবস / শিক্ষা ও সচেতনতাই পারে থাইরয়েড ঝুঁকি কমাতে পরিবার থেকেই শুরু হতে পারে পরিবর্তন

টেকসই খাদ্যচর্চা গড়ে তুলতে বড় কোনো উদ্যোগের অপেক্ষা করতে হয় না। ছোট ছোট অভ্যাস থেকেও পরিবর্তন শুরু হতে পারে। যেমন-

প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার না কেনা অবশিষ্ট খাবার পুনরায় ব্যবহার করা স্থানীয় কৃষিপণ্য কেনা প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো মৌসুমি ফল ও সবজি খাওয়া অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা

এসব ছোট উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

খাবারের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সংস্কৃতি

একটি দেশের খাবার শুধু স্বাদের পরিচয় নয়, এটি তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও অংশ। পান্তা-ইলিশ, ভর্তা, পিঠা কিংবা গ্রামের মাটির চুলার রান্না-এসব শুধু খাবার নয়, বাঙালির আবেগ ও পরিচয়ের অংশ।

টেকসই গ্যাস্ট্রোনমি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খাবারকে শুধু ভোগের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষক, প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা।

আরও পড়ুন মানসিক স্বাস্থ্যে সহানুভূতিই হোক সবচেয়ে বড় শক্তি ভবিষ্যতের জন্য দরকার সচেতন খাদ্যচর্চা

আজকের শিশুরা কী খাবার খাবে, ভবিষ্যতের পৃথিবী কতটা নিরাপদ থাকবে-এসবই অনেকাংশে নির্ভর করছে বর্তমান খাদ্যব্যবস্থার ওপর। তাই এখনই সচেতন হওয়া জরুরি।

টেকসই গ্যাস্ট্রোনমি দিবস শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়, বরং মানুষকে দায়িত্বশীল খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান। এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখার দিন, যেখানে খাবার হবে স্বাস্থ্যকর, পরিবেশবান্ধব এবং সবার জন্য নিরাপদ।কারণ সুস্বাদু খাবারের আসল সৌন্দর্য তখনই, যখন তা মানুষ ও প্রকৃতি দুয়ের জন্যই কল্যাণকর হয়।

জেএস/