বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বিভিন্ন দেশ নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা, রঙিন গ্যালারি আর আবেগে ভরা সমর্থকদের গল্প। ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ হিসেবে আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকো। তবে ফুটবলের বাইরেও মেক্সিকোকে আলাদা করে চেনায় তার বিস্ময়কর সংস্কৃতি, শত বছরের ঐতিহ্য এবং কিছু এমন উৎসব, যা বিশ্বের অন্য কোথাও দেখা যায় না।
Advertisement
মেক্সিকোর বিচিত্র উৎসব বা সংস্কৃতির মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী হলো ‘ডে অব দ্য ডেড’ একটি উৎসব যেখানে মৃত্যু নিয়ে শোক নয়, বরং আনন্দ, স্মৃতি আর ভালোবাসার উদযাপন করা হয়। বিশ্বের বেশিরভাগ সমাজে মৃত্যু মানেই শোক, কিন্তু মেক্সিকো দেখিয়েছে অন্য এক দৃষ্টিভঙ্গি। তাদের কাছে মৃত্যু জীবনেরই অংশ, আর প্রিয়জনদের স্মরণ করার একটি উপলক্ষ।
মৃত্যু নয়, স্মৃতির উৎসবপ্রতি বছর ১ ও ২ নভেম্বর মেক্সিকোজুড়ে পালিত হয় ডে অব দ্য ডেড। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় ‘দিয়া দি লস মুরতস’। বিশ্বাস করা হয়, এই সময়ে মৃত আত্মীয়-স্বজনদের আত্মা পৃথিবীতে ফিরে আসে এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রতীকীভাবে সময় কাটায়। এই উৎসবের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে মৃত্যু নিয়ে ভয় বা দুঃখ প্রকাশ করা হয় না। বরং মানুষ প্রিয়জনদের স্মরণ করে গান গায়, নাচে, খাবার তৈরি করে এবং নানা রঙে সাজায় তাদের বাড়ি ও কবরস্থান। নিজেরাও সাজেন বিচিত্র ভৌতিক সাজে। এরপর নাচ-গান করেন, আনন্দ করতে থাকেন সবাই।
কবরস্থান হয়ে ওঠে মিলনমেলাডে অব দ্য ডেড উপলক্ষে পরিবারগুলো কবরস্থানে গিয়ে প্রিয়জনদের সমাধি পরিষ্কার করে। সেখানে ফুল, মোমবাতি, ছবি এবং মৃত ব্যক্তির প্রিয় খাবার সাজিয়ে রাখা হয়। রাতভর অনেক পরিবার কবরের পাশে বসে গল্প করে, গান গায় এবং স্মৃতিচারণ করে। বাইরের মানুষের কাছে বিষয়টি অদ্ভুত মনে হলেও মেক্সিকানদের কাছে এটি ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধনের প্রতীক।
Advertisement
ডে অব দ্য ডেডের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক হলো রঙিন খুলি বা ‘সুগার স্কাল’। চিনি দিয়ে তৈরি এসব খুলি বিভিন্ন নকশা ও রঙে সাজানো হয়। মেক্সিকান সংস্কৃতিতে খুলি মৃত্যুর ভয় নয়, বরং জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্বের প্রতীক। এ কারণেই উৎসবজুড়ে মানুষ খুলি আকৃতির মুখোশ পরে, মুখে রং করে এবং বিভিন্ন সাজসজ্জায় এই প্রতীক ব্যবহার করে।
কমলা গাঁদা ফুলের রহস্যউৎসবের সময় সর্বত্র দেখা যায় উজ্জ্বল কমলা রঙের গাঁদা ফুল। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই ফুলের গন্ধ এবং রং মৃত আত্মাদের ঘরে ফিরে আসার পথ দেখায়। তাই বাড়ি, রাস্তা, মন্দির এবং কবরস্থান সব জায়গায় এই ফুল দিয়ে সাজানো হয়।
ইউনেস্কোর স্বীকৃত ঐতিহ্যডে অব দ্য ডেডের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এতটাই বেশি যে ২০০৮ সালে এটি ইউনেস্কোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। বর্তমানে বিশ্বের নানা দেশেও এই উৎসবের প্রভাব দেখা যায়।
এখানেই শেষ নয়, চলুন মেক্সিকোর আরও কিছু অদ্ভুত সংস্কৃতি জেনে নেওয়া যাক। যার প্রতিটি আপনার মনে বিস্ময় জাগাবে- ১. ঝাল খাবারের প্রতি মেক্সিকানদের ভালোবাসামেক্সিকান খাবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রচুর মরিচের ব্যবহার। দেশটিতে শতাধিক ধরনের মরিচ চাষ করা হয় এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের ঝাল খাবার জনপ্রিয়। অনেক মেক্সিকান খাবারে এমন ঝাল ব্যবহার করা হয়, যে বিদেশিরা সহজে খেতে পারেন না। তাদের চোখের পানি-নাকের পানি এক হয়ে যায়। যারা এরই মধ্যে এই খাবারের স্বাদ নিয়েছেন তারা ভালো বুঝতে পারবেন এই অনুভূতি। টাকো, সালসা, এনচিলাদা কিংবা তামালের মতো জনপ্রিয় খাবারেও মরিচের উপস্থিতি অপরিহার্য। মেক্সিকানদের কাছে মরিচ শুধু স্বাদ বাড়ানোর উপাদান নয়, বরং এটি তাদের ইতিহাস, কৃষি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
Advertisement
মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী রেসলিং লুচা লিব্রে শুধু একটি খেলা নয়, এটি দেশটির জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ। এই খেলায় অংশগ্রহণকারী রেসলাররা রঙিন ও নকশাদার মুখোশ পরে লড়াই করেন। অনেক রেসলার তাদের পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে আসল পরিচয় গোপন রাখেন এবং মুখোশকে নিজের সম্মান ও পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে দেখেন। মেক্সিকোতে লুচা লিব্রের জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি যে শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষ এই খেলার ভক্ত। অনেক রেসলার দেশটির সাংস্কৃতিক আইকন হিসেবেও পরিচিত।
৩. মারিয়াচি সংগীতমেক্সিকোর কথা উঠলে মারিয়াচি সংগীতের কথা না বললেই নয়। বিশেষ ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে একদল শিল্পী গিটার, ট্রাম্পেট ও বেহালার মতো বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এই সংগীত পরিবেশন করেন। বিয়ে, জন্মদিন, জাতীয় উৎসব কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে মারিয়াচি দলের উপস্থিতি খুবই সাধারণ ব্যাপার। এই সংগীত মেক্সিকোর মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। ইউনেস্কোও মারিয়াচি সংগীতকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে।
৪. রাস্তার খাবারের স্বর্গমেক্সিকোর রাস্তার খাবারের জগৎ বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে বড় বড় বাজার পর্যন্ত সর্বত্র খাবারের স্টল দেখা যায়। টাকো, তামালে, এলোটে (ভুট্টা), কেসাদিয়া, চুরোসসহ অসংখ্য খাবার স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এসব খাবার শুধু পেট ভরানোর মাধ্যম নয়, বরং মেক্সিকোর ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিফলন। পর্যটকদের কাছে দেশটির স্ট্রিট ফুড সংস্কৃতি অন্যতম বড় আকর্ষণ, কারণ এখানে স্বল্প খরচে আসল মেক্সিকান স্বাদ উপভোগ করা যায়।
ফুটবল আর সংস্কৃতির দুর্দান্ত মেলবন্ধন২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে মেক্সিকোতে যখন ফুটবল উৎসব শুরু হয়েছে, তখন দেশটির অনন্য সংস্কৃতিও নতুন করে বিশ্ববাসীর নজর কাড়ছে। মাঠে ফুটবলের উত্তেজনা আর মাঠের বাইরে ডে অব দ্য ডেডের মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজন মেক্সিকোকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক গন্তব্যে পরিণত করেছে।
সূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউইয়ার্ক পোস্ট
কেএসকে