কর্মজীবনের প্রায় প্রতিটি কাজই মূলত নির্ভর করে ‘অগ্রাধিকার নির্ধারণের’ ওপর। কোথায় অর্থ ব্যয় করা হবে, কোন প্রকল্পে বেশি মনোযোগ দেওয়া হবে, কোন লক্ষ্য আগে অর্জন করতে হবে কিংবা দিনের পর দিন একজন কর্মী কীভাবে নিজের সময় ব্যবহার করবেন- এসব সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে একটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য।
Advertisement
তবে গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, মানুষ অগ্রাধিকার নির্ধারণে আশ্চর্যজনকভাবে দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের বদলে এমন কাজ বেছে নেয়, যা দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব বা যেখানে অল্প সময়ের মধ্যে সাফল্যের অনুভূতি পাওয়া যায়।
কখনো কখনো পরিস্থিতিই অগ্রাধিকার ঠিক করে দেয়
কিছু কিছু ঘটনা এমন হয়, যেখানে কীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে তা নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি থাকে না। উদাহরণ হিসেবে ২০২০ সালের করোনা মহামারির কথা বলা যায়। বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন কোম্পানিগুলোর জন্য কোন সমস্যাগুলো আগে সমাধান করা প্রয়োজন, তা মোটামুটি স্পষ্ট ছিল।
Advertisement
কিন্তু সাধারণ সময়ে পরিস্থিতি এত সহজ হয় না। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কোথায় মূলধন বিনিয়োগ করা হবে, কোন উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হবে ও কোন সূচক বা সংখ্যাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
পণ্য উন্নয়ন দলের সদস্যদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কোন ফিচার আগে তৈরি করা হবে। বিক্রয় দলকে নির্ধারণ করতে হয়, কোন গ্রাহকদের ওপর বেশি মনোযোগ দেওয়া হবে।
একইভাবে প্রতিদিন, এমনকি প্রতি ঘণ্টায়, একজন ব্যক্তিকেও ঠিক করতে হয় তার পরবর্তী সময়টুকু কীভাবে ব্যয় করা হবে।
মানুষ লক্ষ্য ছাড়তে চায় না
Advertisement
সমস্যা হলো, মানুষ প্রায়ই অগ্রাধিকার নির্ধারণে ব্যর্থ হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো লক্ষ্য অর্জনের প্রতি মানুষ এতটাই অনুপ্রাণিত থাকে যে তারা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় লক্ষ্যও ত্যাগ করতে পারে না।
অস্ট্রেলিয়ার টিমোথি ব্যালার্ড ও তার সহকর্মীরা একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের সামনে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী লক্ষ্য স্থির করেছিলেন। এরপর লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন মাত্রার আর্থিক পুরস্কার নির্ধারণ করা হয়।
পরীক্ষায় দেখা যায়, এমন পরিস্থিতিতেও অংশগ্রহণকারীরা দুটি লক্ষ্যই অর্জনের চেষ্টা করেন, যখন একটি লক্ষ্য পূরণ করলেই একই পরিমাণ পুরস্কার পাওয়া যেত। এমনকি, দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অনুসরণ করলে কোনো লক্ষ্যই অর্জিত না হওয়ার ঝুঁকি বেশি ছিল। তবুও অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী দুটি লক্ষ্যই পূরণ করার চেষ্টা করেছেন।
গুরুত্বপূর্ণ নয়, সহজ কাজ বেছে নেওয়ার প্রবণতা
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ অনেক সময় নিজের স্বার্থের পরিপন্থী সিদ্ধান্তও নেয় শুধুমাত্র দ্রুত অগ্রগতির অনুভূতি পাওয়ার জন্য।
মতি আমার নামে এক গবেষক ও তার সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা যায়, ঋণে জর্জরিত অনেক ভোক্তা বড় ঋণ এবং উচ্চ সুদের ঋণ আগে পরিশোধ করার বদলে ছোট ঋণগুলো আগে শোধ করতে আগ্রহী।
অর্থনৈতিকভাবে এটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়। তবে তাদের কাছে ঋণের সংখ্যা কমে যাওয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, মানুষের কাছে বাস্তব অগ্রগতির অনুভূতি অনেক সময় যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
অফিসেও একই প্রবণতা
এই আচরণ শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, কর্মক্ষেত্রেও দেখা যায়।
ধরা যাক, একটি নথি ইতোমধ্যে ৩৯৯ জন পর্যালোচনা করেছেন। সেখানে ৪০০তম ব্যক্তি হিসেবে আবারও সেটি দেখে নতুন কোনো মূল্য সংযোজন না-ও হতে পারে। কিন্তু তবুও কেউ সেটি করতে পারেন, কারণ দিনের শেষে অন্তত তিনি বলতে পারবেন যে একটি কাজ সম্পন্ন করেছেন।
অর্থাৎ কাজটির প্রকৃত গুরুত্বের চেয়ে সম্পন্ন হওয়ার অনুভূতি অনেক সময় বেশি প্রভাব ফেলে।
প্রতিষ্ঠানগুলোও খুব একটা ভালো নয়
শুধু ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানও প্রায়ই অগ্রাধিকার নির্ধারণে সমস্যায় পড়ে। অনেক ব্যবস্থাপক এমনভাবে কাজ দেন যেন প্রতিটি বিষয়ই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। আবার কখনো তারা তা না ভাবলেও কর্মীরা এমনভাবে আচরণ করেন যেন সব কাজই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে এত বেশি অগ্রাধিকার জমা হয় যে মনোযোগ ও সম্পদ সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।
এই সমস্যাকে বলা হয় ‘পিনাট বাটার প্রবলেম’। অর্থাৎ যেমন রুটির ওপর পিনাট বাটার খুব পাতলা করে ছড়িয়ে দিলে কোথাও যথেষ্ট পরিমাণে থাকে না, তেমনি সম্পদ ও মনোযোগও সব প্রকল্পে ভাগ হয়ে গিয়ে কার্যকারিতা হারায়।
লেগোর সিইওর অভিজ্ঞতা
খেলনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লেগো’র (LEGO) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিলস ক্রিস্টিয়ানসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর এমন সমস্যার বহু উদাহরণ খুঁজে পান। তিনি দেখেন, প্রতিষ্ঠানে ১০০টি ‘মূল ঝুঁকি’ তালিকাভুক্ত রয়েছে।
এ নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আপনি কীভাবে ১০০টি ভিন্ন ঝুঁকি একসঙ্গে সামলাবেন, অথচ প্রতিটি কাজেই অতিরিক্ত ঝুঁকিভীতিতে আক্রান্ত হবেন না?
তার মতে, অগ্রাধিকার এত বেশি হলে প্রকৃত অগ্রাধিকার বলে আর কিছু থাকে না।
অগ্রাধিকার নির্ধারণের জন্য রয়েছে নানা পদ্ধতি
মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকরভাবে অগ্রাধিকার নির্ধারণে সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে পরিচিত একটি হলো আইজেনহাওয়ার ম্যাট্রিক্স।
এটি সময় ব্যবস্থাপনার একটি পদ্ধতি, যেখানে কাজগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়।
যে কাজ জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ, সেটি সবার আগে করা উচিত।
যে কাজ গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জরুরি নয়, সেটির জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
আর যদি কেউ নিয়মিত এমন কাজ করেন যা না জরুরি, না গুরুত্বপূর্ণ- তাহলে তার নিজের কাজের ধরন নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত।
অ্যাকশন-প্রায়োরিটি ম্যাট্রিক্স
আরেকটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো অ্যাকশন-প্রায়োরিটি ম্যাট্রিক্স। এখানে কাজগুলোকে প্রভাব ও পরিশ্রম -এর ভিত্তিতে ভাগ করা হয়।
প্রোডাক্ট টিমগুলো প্রায়ই রাইস (RICE) নামে একটি স্কোরিং মডেল ব্যবহার করে।
রাইস-এর চারটি উপাদান হলো:
পৌঁছানোর পরিসর- Reachপ্রভাব - Impactআত্মবিশ্বাস বা নিশ্চিয়তা- Confidenceপ্রচেষ্টা - Effort
এছাড়া মস্কো বা MoSCoW নামে আরেকটি কাঠামো ব্যবহার করা হয়।
এতে কাজ বা ফিচারগুলোকে চার ভাগে ভাগ করা হয়:
অবশ্যই প্রয়োজন - Must-have থাকা উচিত - Should-haveথাকলে ভালো - Could-have Won’t-have (থাকবে না)
গুগলের ৭০:২০:১০ নিয়ম
উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সম্পদ বণ্টনের জন্য গুগুল এই নীতি অনুসরণ করে। এটি অনুযায়ী,
৭০ শতাংশ সম্পদ মূল ব্যবসায়, ২০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট বা পার্শ্ববর্তী কর্মকাণ্ডে ও ১০ শতাংশ সম্পূর্ণ নতুন ধারণায় বিনিয়োগ করা উচিত।
প্রবন্ধটির লেখক রসিকতা করে বলেছেন, যদি এতগুলো অগ্রাধিকার নির্ধারণের পদ্ধতির মধ্যে কোনটি বেছে নেবেন তা নিয়েই আপনি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে যেকোনো একটি এলোমেলোভাবে বেছে নিন।
শুধু অগ্রাধিকার নির্ধারণ করলেই হবে না
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়। যদি কেউ একটি দলের জন্য অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন, তাহলে সেটি সঠিকভাবে অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি।
২০১৭ সালে ডোনাল্ড সুল ও তার সহকর্মীরা ১২৪টি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের কাছে তাদের প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত অগ্রাধিকার কী, তা জানতে চান।
গবেষণায় দেখা যায়, একটি সাধারণ প্রতিষ্ঠানে মাত্র অর্ধেক নেতা একই বিষয়ে একমত ছিলেন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য কী, সে বিষয়েই নেতৃত্বের মধ্যে স্পষ্ট ঐক্য ছিল না।
নতুন কিছুকে অগ্রাধিকার দিলে পুরোনো কিছু বাদ দিতেই হবে
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কোনো বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া মানেই পুরোনো কোনো বিষয়কে কম গুরুত্ব দেওয়া।
‘দ্য অক্টোপাস অরগানাইজেশ’ নামের বইয়ে অ্যামাজনের দুই নির্বাহী ফিল লে-বার্ন ও জানা ওয়ের্নার প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকল্প বাতিল করার জন্য স্পষ্ট নিয়ম তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন।
তারা এমন প্রকল্পের উদাহরণ দিয়েছেন যেখানে নির্দিষ্ট ‘চালিয়ে যাওয়া/বন্ধ বা বাতিল করে দেওয়া’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধাপ থাকে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় প্রকল্পটি চালানো হবে নাকি বন্ধ করা হবে।
সফটওয়্যার প্রকল্পের ক্ষেত্রেও তারা ‘বন্ধ বা বাতিল করে দেওয়া’ ব্যবহারের কথা বলেছেন।
যেমন- দল থেকে কর্মী চলে যাওয়ার হার নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেলে, সময়ের চাহিদা নির্ধারিত সীমার বেশি হয়ে গেলে, প্রকল্প বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
কার্যকর অগ্রাধিকার নির্ধারণের তিন স্তম্ভ
লেখকদের মতে, ‘বাতিল’ শব্দটি কিছুটা যুদ্ধংদেহী শোনালেও মূল ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কার্যকর অগ্রাধিকার নির্ধারণের জন্য তিনটি কাজ অপরিহার্য- নির্বাচন করা (Choose), সেটি অন্যদের জানানো (Communicate) ও প্রয়োজন হলে কিছু বন্ধ করা (Stop)।
তারা এই তিনটি ধাপকে সংক্ষেপে ‘ক্যারাকাস (CaraCaS)’ নামে অভিহিত করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তি হোক বা প্রতিষ্ঠান- সফল হতে চাইলে শুধু নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই চলবে না; অপ্রয়োজনীয় লক্ষ্য পরিত্যাগ করার সাহসও থাকতে হবে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
এসএএইচ