সম্প্রতি বাংলাদেশের একদল উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেশের নীতি-নির্ধারণী ও সচেতন মহলে কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার ১২ জন কর্মকর্তা লাহোরের ‘পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস একাডেমি’তে একটি বিশেষ প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছেন। এই সফরের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করছে পাকিস্তান সরকার। জনপ্রশাসন, শাসন সংস্কার, নীতি প্রণয়ন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার তুলনামূলক জ্ঞান অর্জনই এই প্রশিক্ষণের ঘোষিত উদ্দেশ্য বলে জানানো হয়েছে। আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতার বিনিময় একটি অপরিহার্য উপাদান। তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন এখানে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই: পাকিস্তানের বর্তমান আমলাতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে আসলে বাংলাদেশের নতুন কী শেখার আছে? আর এই সিদ্ধান্ত কি বর্তমান সরকারের ঘোষিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির সাথে আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ?
Advertisement
প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য বা প্রতীকী আয়োজন হওয়া উচিত নয়। কর্মকর্তাদের এমন সব ব্যবস্থার সংস্পর্শে আসা উচিত যা আমাদের চেয়ে দৃশ্যত উন্নত এবং বৈশ্বিক মানে উত্তীর্ণ। বিদেশের মাটিতে কর্মকর্তাদের পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সেই সব পদ্ধতি আয়ত্ত করা, যা নিজ দেশে প্রয়োগ করে নাগরিক সেবার মান বাড়ানো সম্ভব। এই মানদণ্ডে পাকিস্তানের নির্বাচন অনেক যৌক্তিক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গত পাঁচ দশকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি, নারী ক্ষমতায়ন, টিকাদান কর্মসূচি, পরিবার পরিকল্পনা এবং শিশু মৃত্যুহার হ্রাসের মতো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ বিশ্বজুড়ে এক ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ হিসেবে স্বীকৃত। এই রূপান্তর কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং কয়েক দশকের সুচিন্তিত নীতি ও দক্ষ প্রশাসনিক অভিযোজনের ফসল। যেখানে বাংলাদেশ নিজেই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে সফল উদাহরণ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে, সেখানে আমাদের কর্মকর্তাদের কি এমন দেশে প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়া সাজে যারা এই সূচকগুলোতে আমাদের চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে?
প্রশাসনিক উৎকর্ষ অর্জনই যদি মূল লক্ষ্য হয়, তবে যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো অনেক বেশি যৌক্তিক গন্তব্য হতে পারতো। সিঙ্গাপুরের দক্ষ সিভিল সার্ভিস ও বিশ্বসেরা ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, যুক্তরাজ্যের শতবর্ষী প্রশাসনিক পেশাদারিত্ব কিংবা যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে কয়েক দশকে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার আমলাতান্ত্রিক ভূমিকা থেকে বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই মূল্যবান শিক্ষা নিতে পারতো। এমনকি ই-গভর্ন্যান্সের রোল মডেল এস্তোনিয়া হতে পারতো প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট প্রশাসনিক লক্ষ্য অর্জনের আদর্শ পাঠশালা।
জাতির ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অনেকাংশেই নির্ভর করছে আমলাতন্ত্রের মেধা ও দূরদর্শিতার ওপর। আমরা যদি প্রকৃতপক্ষেই একটি স্মার্ট, সমৃদ্ধ ও স্থিতিস্থাপক দেশ গড়তে চাই, তবে আমাদের কর্মকর্তাদের পাঠ নিতে হবে বিশ্বের অগ্রগামী ও সফল প্রশাসনিক ব্যবস্থা থেকে—এমন দেশ থেকে নয় যারা এখনো সেই সব মৌলিক সংকটের সাথে লড়ছে যা বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সফলভাবে জয় করেছে। নীতি-নির্ধারকদের কাছে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে: লক্ষ্য যখন শ্রেষ্ঠত্ব, তবে আমরা কেন মানদণ্ডের শীর্ষে থাকা দেশগুলোকে বেছে নিচ্ছি না?
Advertisement
নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন আজ জোরালো হয়ে উঠেছে। উগ্রবাদ দমনে গত এক দশকে বাংলাদেশের কৌশল ও সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। গোয়েন্দা সমন্বয় ও সামাজিক জনমত তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশ তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান কয়েক দশক ধরে চরমপন্থা, অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও আন্তঃসীমান্ত উগ্রবাদের মতো গুরুতর চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে। বাংলাদেশ যেখানে আপেক্ষিক অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পেরেছে, সেখানে আমাদের আমলারা এমন একটি নিরাপত্তা পরিবেশ থেকে কী শিখবেন যা নিজেই দশকের পর দশক ধরে ভঙ্গুর?
অর্থনৈতিক দিকটিও এখানে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশ যখন মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন পাকিস্তানের অর্থনৈতিক মডেল আমাদের জন্য কতটা ইতিবাচক উদাহরণ হতে পারে? পাকিস্তান যেখানে প্রায় নিয়মিত বিরতিতে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার (আইএমএফ) দ্বারস্থ হচ্ছে এবং দীর্ঘ মেয়াদী সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে রপ্তানি ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। ফলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের জন্য সিঙ্গাপুর বা জার্মানির মতো দেশগুলোই বেশি ফলপ্রসূ হতো।
প্রোগ্রামটির সমর্থকরা যুক্তি দিতে পারেন যে, তুলনামূলক শিক্ষা মানেই অন্ধ অনুকরণ নয়। বিভিন্ন প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া সব সময়ই পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু যখন রাষ্ট্রীয় সীমিত সম্পদ, কর্মকর্তাদের মূল্যবান সময় এবং প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগের প্রশ্ন আসে, তখন প্রতিটি প্রশিক্ষণের উপযোগিতা কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ১২ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি জাতীয় নীতিনির্ধারণী কাজে যে শূন্যতা তৈরি করে, তার বিপরীতে লব্ধ জ্ঞান দেশের কতটুকু কাজে আসবে, সেই হিসাবটি পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কর্মরত। এই প্রতিষ্ঠানগুলোই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ এবং অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের মূল কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজন একটি আধুনিক ও ক্ষুরধার মেধার সিভিল সার্ভিস। ‘‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হওয়া উচিত আমাদের কর্মকর্তাদের বিশ্বের সেরা জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করা। প্রশিক্ষণের অংশীদারিত্ব হওয়া উচিত প্রশাসনিক শ্রেষ্ঠত্ব ও দৃশ্যমান ফলাফলের ভিত্তিতে, কোনো রাজনৈতিক প্রতীকী বা কূটনৈতিক সুবিধার খাতিরে নয়। লাহোরের একাডেমি থেকে অর্জিত জ্ঞান আমাদের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জটিলতা নিরসনে কতটা দিকনির্দেশনা দেবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
Advertisement
পরিশেষে, জাতির ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অনেকাংশেই নির্ভর করছে আমলাতন্ত্রের মেধা ও দূরদর্শিতার ওপর। আমরা যদি প্রকৃতপক্ষেই একটি স্মার্ট, সমৃদ্ধ ও স্থিতিস্থাপক দেশ গড়তে চাই, তবে আমাদের কর্মকর্তাদের পাঠ নিতে হবে বিশ্বের অগ্রগামী ও সফল প্রশাসনিক ব্যবস্থা থেকে—এমন দেশ থেকে নয় যারা এখনো সেই সব মৌলিক সংকটের সাথে লড়ছে যা বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সফলভাবে জয় করেছে। নীতি-নির্ধারকদের কাছে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে: লক্ষ্য যখন শ্রেষ্ঠত্ব, তবে আমরা কেন মানদণ্ডের শীর্ষে থাকা দেশগুলোকে বেছে নিচ্ছি না?
লেখক: কলামিস্ট ও অ্যাকটিভিস্ট।
এইচআর/জেআইএম