মতামত

অশান্ত দাম্পত্য পরিবারের আর্থিক অধঃপতন ডেকে আনতে পারে

সংসার সুখী হয় রমণীর গুণে—প্রাচীন এই প্রবাদটি এখন আরও বিস্তৃত ও আধুনিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশালী সংসার আসলে নারী-পুরুষ উভয়ের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানসিক শান্তি এবং বোঝাপড়ার ওপর গড়ে ওঠে। পরিবারকে যদি একটি সচল গাড়ির সাথে তুলনা করা হয়, তবে দাম্পত্য সম্পর্ক হলো তার চালিকাশক্তি। এই চালিকাশক্তিতে যখনই চিড় ধরে বা অশান্তির বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে, তখন কেবল মনের শান্তিই নষ্ট হয় না, বরং পুরো পরিবারের আর্থিক ভিত্তিটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। আমাদের সমাজে অনেকেই মানসিক অশান্তি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে দুটি ভিন্ন মেরুর বিষয় বলে মনে করেন। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অশান্ত দাম্পত্য জীবনের সাথে পরিবারের আর্থিক অধঃপতনের একটি গভীর ও অচ্ছেদ্য মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তবমুখী যোগাযোগ রয়েছে।

Advertisement

একটি পরিবারের আয়ের মূল উৎস হলো মানুষের কর্মদক্ষতা এবং মনোযোগ। মানুষ যখন মানসিকভাবে সুস্থ ও শান্ত থাকে, তখন কর্মক্ষেত্রে তার উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু যে ঘরে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা অশান্তি, কলহ আর মানসিক নির্যাতন চলে, সেই ঘরের মানুষের মানসিক শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। অশান্ত দাম্পত্যের শিকার একজন ব্যক্তি যখন কর্মক্ষেত্রে বা ব্যবসায় যান, তখন তার মনের অবচেতনে ঘরের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো ঘুরপাক খায়। ফলে কাজে মনঃসংযোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সিদ্ধান্তহীনতা, খিটখিটে মেজাজ এবং কর্মস্পৃহার অভাবের কারণে চাকরিজীবী হলে পদোন্নতি আটকে যাওয়া বা চাকরিচ্যুতির মতো ঘটনা ঘটতে পারে। আর ব্যবসায়ী হলে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বড় ধরনের আর্থিক লোকসান হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। মনের শান্তি না থাকলে কোনো সৃজনশীল বা দূরদর্শী পরিকল্পনা করা যায় না, যা পরোক্ষভাবে আয়ের পথকে সংকুচিত করে ফেলে।

দাম্পত্য কলহের আরেকটি বড় শিকার হলো সচেতন আর্থিক পরিকল্পনা বা বাজেট ব্যবস্থাপনা। একটি সফল পরিবারের পেছনে থাকে সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, নিয়মিত সঞ্চয় এবং বুদ্ধিদীপ্ত বিনিয়োগ। যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুসম্পর্ক থাকে, তখন তারা একসাথে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনেন, কোথায় খরচ কমাবেন আর কোথায় বিনিয়োগ করবেন তা নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু অশান্ত সংসারে এই সুস্থ আলোচনার পরিবেশটাই উধাও হয়ে যায়। পারস্পরিক জিদ, অহংকার আর দূরত্বের কারণে কেউ কারও পরামর্শ নিতে চান না। অনেক সময় দেখা যায়, একে অপরকে ছোট করার জন্য বা নিজের মানসিক একাকীত্ব ঢাকতে গিয়ে মানুষ অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত কেনাকাটা শুরু করে, যাকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় ‘রিটেইল থেরাপি’ বা আবেগতাড়িত খরচ বলা হয়। ঘরের অশান্তি থেকে বাঁচতে বাইরে গিয়ে অযথা টাকা ওড়ানো, দামি রেস্তোরাঁয় সময় কাটানো বা অপ্রয়োজনীয় বিলাসী সামগ্রী কেনার প্রবণতা বেড়ে যায়। এই ধরনের লাগামহীন ও সমন্বয়হীন খরচ খুব দ্রুত একটি পরিবারকে ঋণের সাগরে ডুবিয়ে দেয়।

এর পাশাপাশি রয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্যগত খরচের দিকটি। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতা মানুষের শরীরের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, অশান্ত পারিবারিক পরিবেশের কারণে মানুষ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, গ্যাস্ট্রিক আলসার, অনিদ্রা এবং তীব্র মানসিক অবসাদের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। এই অসুস্থতাগুলোর চিকিৎসা মোটেও সস্তা নয়। ডাক্তারের ফি, নিয়মিত ওষুধের খরচ এবং হাসপাতালের বিল মেটাতে গিয়ে পরিবারের জমানো সঞ্চয়ের বড় একটি অংশ নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। অর্থাৎ, যে টাকাটি কোনো লাভজনক ব্যবসায় বা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হতে পারত, তা চলে যায় অসুস্থতার পেছনে। অশান্তি কেবল মনকে নয়, শরীরকেও রুগ্ন করে দেয় এবং সেই রুগ্নতার মাশুল দিতে হয় পকেটের টাকা দিয়ে।

Advertisement

দাম্পত্যের এই টানাপোড়েন সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর। কলহপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা সন্তানরা চরম মানসিক ট্রমার শিকার হয়। তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট হয় এবং অনেক সময় তারা ভুল পথে পা বাড়ায়। সন্তানদের এই মানসিক ও শিক্ষাগত বিপর্যয় সামাল দিতে গিয়ে বাবা-মাকে অতিরিক্ত গৃহশিক্ষক, কাউন্সিলিং বা ব্যয়বহুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হলো, যে সন্তানরা আগামী দিনে পরিবারের হাল ধরবে, তারা যদি শুরুতেই মেন্টাল ট্রমার কারণে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে ব্যর্থ হয়, তবে পরিবারের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়। সন্তানের ব্যর্থতা একটি পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়।

সবচেয়ে চরম এবং দৃশ্যমান আর্থিক ধাক্কাটি আসে তখন, যখন এই অশান্তি বিবাহবিচ্ছেদ বা আইনি লড়াই পর্যন্ত গড়ায়। বর্তমান সময়ে যেকোনো আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদী। উকিল বা আইনজীবীর ফি, আদালতের চক্কর এবং আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে যায়। এর সাথে যদি যুক্ত হয় দেনমোহর বা খোরপোশ প্রদানের বিষয় এবং যৌথ সম্পত্তি ভাগের জটিলতা, তবে আর্থিক মেরুদণ্ডটি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। একটি দীর্ঘদিনের সাজানো সংসার যখন ভেঙে যায়, তখন কেবল দুটি মন আলাদা হয় না, বরং দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা আর্থিক ইমারতটিও ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বিচ্ছেদের পর নতুন করে এককভাবে জীবন শুরু করা এবং একা হাতে সব খরচ সামলানো অনেক সময়ই অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গুত্বের শামিল।

সুতরাং, এটি স্পষ্ট যে দাম্পত্য জীবনের শান্তি বা অশান্তি কেবল চার দেয়ালের ভেতরের কোনো ব্যক্তিগত আবেগীয় বিষয় নয়; এটি একটি পরিবারের সামষ্টিক অর্থনীতি, সমৃদ্ধি এবং টিকে থাকার লড়াইয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত। অর্থ দিয়ে হয়তো সাময়িক সুখের উপকরণ কেনা যায়, কিন্তু ঘরের ভেতরের প্রকৃত শান্তি ছাড়া সেই অর্থকে ধরে রাখা বা বৃদ্ধি করা অসম্ভব। সুখী দাম্পত্য সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, যা মানুষকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে এবং জীবনের যেকোনো অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করার সাহস জোগায়। তাই পরিবারের আর্থিক অধঃপতন রোধ করতে এবং একটি টেকসই ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কেবল আয়ের পেছনে না ছুটে, দাম্পত্য সম্পর্কের যত্ন নেওয়া এবং ঘরের ভেতরের শান্তি বজায় রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

লেখক: করপোরেট ট্রেইনার, ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট, প্রফেসর অব প্র্যাকটিস, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

Advertisement

এইচআর/এএসএম