মতামত

সংসদ কি জানালার পর্দা ও ওভেন চাওয়ার জায়গা?

একটি সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জাতির রাজনৈতিক পরিপক্বতা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। সংসদে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, উত্থাপিত প্রতিটি দাবি এবং পরিচালিত প্রতিটি বিতর্ক শুধু সংসদ কক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো কোটি মানুষের কাছে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক নেতৃত্বের চিন্তাধারা এবং জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ববোধের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

Advertisement

এই কারণেই জাতীয় সংসদে কোনো বিষয়ে আলোচনা হলে সেটি কেবল একটি ব্যক্তিগত মতামত বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। বরং সেটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যদের সরকারি ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং জানালার পর্দা সরবরাহের দাবি ঘিরে যে আলোচনা হয়েছে, তা নতুন করে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—সংসদ কি ব্যক্তিগত গৃহস্থালি সুবিধা চাওয়ার জায়গা, নাকি জনগণের জীবনসংগ্রাম ও রাষ্ট্রীয় সংকট নিয়ে কথা বলার সর্বোচ্চ মঞ্চ?

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মু. মিজানুর রহমান সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ করা ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন ও পর্দা দেওয়ার দাবি জানান। এর পরদিন বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পার্টি-বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ সংসদে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, জনগণের প্রতিনিধি হয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে জনগণের সমস্যা নয়, বরং ওভেন, ওয়াশিং মেশিন ও পর্দা চাওয়ার বিষয়টি সংসদের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ করে। এমনকি তিনি ব্যঙ্গ করে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে নিজ খরচে ওভেন দেওয়ার এবং প্রধানমন্ত্রীকে ওয়াশিং মেশিন দেওয়ার অনুরোধও জানান। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধার কথা বলতে পারেন, যদিও বিষয়টি সংসদে না বললেও হতো।

ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু এর প্রতীকী তাৎপর্য গভীর। কারণ এটি সংসদীয় রাজনীতির অগ্রাধিকারবোধ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। বাংলাদেশ এমন এক সময় পার করছে, যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষার মান, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো অসংখ্য সমস্যা সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত কঠিন করে তুলছে।

Advertisement

দেশের বহু মানুষ চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বেকার তরুণদের সংখ্যা বাড়ছে। কৃষক উৎপাদন ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মাস শেষে হিসাব মেলাতে পারছে না। এই বাস্তবতায় জনগণ যখন সংসদের দিকে তাকায়, তখন তারা আশা করে তাদের প্রতিনিধি এসব সংকটের কথা বলবেন, সমাধানের পথ খুঁজবেন এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করবেন।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদের মূল দায়িত্ব তিনটি—আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনগণের স্বার্থ তুলে ধরা। বিশ্বের উন্নত সংসদীয় গণতন্ত্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সংসদে আলোচনার প্রধান বিষয় থাকে জননীতি, অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচার। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীকে প্রতি সপ্তাহে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা নিউজিল্যান্ডের সংসদে বিরোধী দল সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা নিয়ে নিয়মিত বিতর্ক করে। সেখানে সংসদের সময়কে একটি মূল্যবান জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশেও সংসদীয় গণতন্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিভিন্ন সময়ে সংসদের আলোচনার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কখনো ব্যক্তিগত প্রশংসা, কখনো অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য, কখনো রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি সংসদের মূল উদ্দেশ্য আড়াল করেছে। সাম্প্রতিক এই ঘটনা সেই বিতর্ককেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

সংসদ হলো জাতির বিবেকের প্রতীক। সেখানে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। তাই সংসদের মঞ্চে যখন কোনো জনপ্রতিনিধি দাঁড়াবেন, তখন তাঁর মনে রাখা উচিত—তিনি শুধু নিজের নয়, কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করছেন। সংসদ যদি জনগণের বেদনা, স্বপ্ন ও সংগ্রামের ভাষা হারিয়ে ফেলে, তাহলে তা কেবল একটি ভবনে পরিণত হবে।

Advertisement

তবে এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিও প্রয়োজন। সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি আবাসনের অবকাঠামোগত সমস্যা বা প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক নয়। যাঁরা রাজধানীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন না, তাঁদের জন্য সংসদ সদস্য হোস্টেল বা সরকারি ফ্ল্যাটে কিছু ন্যূনতম সুবিধা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব দাবি উত্থাপনের উপযুক্ত জায়গা কোথায়?

প্রায় প্রতিটি সংসদেই প্রশাসনিক ও কল্যাণসংক্রান্ত বিষয় দেখভালের জন্য নির্দিষ্ট কমিটি থাকে। বাংলাদেশ সংসদেও এমন কমিটি রয়েছে। আবাসন, আসবাবপত্র কিংবা সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত বিষয় সেখানে উত্থাপন করা যেতে পারে। সংসদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন, বিশেষ করে বাজেট অধিবেশন, যেখানে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়, সেখানে গৃহস্থালি সামগ্রীর দাবি জনমনে অস্বস্তি তৈরি করাই স্বাভাবিক।

রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতীকী বার্তা। জনপ্রতিনিধিরা শুধু কী করেন তা নয়, কী বলেন এবং কোথায় বলেন—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক যখন দেখে তার প্রতিনিধি সংসদে দাঁড়িয়ে ওভেন বা পর্দার কথা বলছেন, তখন তার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—আমার সমস্যাগুলো কি তবে কম গুরুত্বপূর্ণ?

এখানে আরেকটি বিষয়ও উল্লেখযোগ্য। গণমাধ্যমের যুগে সংসদের প্রতিটি বক্তব্য কয়েক মিনিটের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ছোট মন্তব্যও জনমতের বড় আলোচনায় পরিণত হতে পারে। ফলে জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বাস্তববোধ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।

আসলে সংসদের মর্যাদা কেবল বিধি-বিধান দিয়ে রক্ষা করা যায় না; এটি রক্ষা হয় সংসদ সদস্যদের আচরণ, বক্তব্য এবং দায়িত্ববোধের মাধ্যমে। সংসদে এমন আলোচনা হওয়া উচিত, যা দেশের মানুষকে ভাবায়, রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশনা তৈরি করে।

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের বিতর্কিত নির্বাচনি অভিজ্ঞতার পর জনগণ একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত ও জবাবদিহিমূলক সংসদ দেখতে চায়। তারা এমন সংসদ চায়, যেখানে কৃষকের ধানের দাম, শ্রমিকের মজুরি, তরুণদের কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়, শিক্ষার মান এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে। তারা এমন সংসদ চায়, যেখানে জাতীয় স্বার্থ ব্যক্তিগত সুবিধার ঊর্ধ্বে স্থান পাবে।

সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন থাকতে পারে, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতাও থাকতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হয় অগ্রাধিকার নির্ধারণে। জনগণের প্রতিনিধি যদি জনগণের কণ্ঠস্বর হওয়ার পরিবর্তে নিজের সুবিধার বিষয়কে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন, তাহলে গণতন্ত্রের মূল দর্শনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সংসদ হলো জাতির বিবেকের প্রতীক। সেখানে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। তাই সংসদের মঞ্চে যখন কোনো জনপ্রতিনিধি দাঁড়াবেন, তখন তাঁর মনে রাখা উচিত—তিনি শুধু নিজের নয়, কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করছেন। সংসদ যদি জনগণের বেদনা, স্বপ্ন ও সংগ্রামের ভাষা হারিয়ে ফেলে, তাহলে তা কেবল একটি ভবনে পরিণত হবে; কিন্তু যদি সংসদ জনগণের বাস্তব সমস্যার প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে, তাহলে সেটিই হবে গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রাণকেন্দ্র।

প্রশ্নটি তাই শুধু একটি ওভেন, একটি ওয়াশিং মেশিন বা কয়েকটি জানালার পর্দা নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো আমাদের সংসদ কোন পথে হাঁটবে—ব্যক্তিগত সুবিধার আলোচনায়, নাকি জনগণের স্বার্থ রক্ষার উচ্চতম দায়িত্ব পালনের পথে? সেই উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র কতটা পরিণত, কতটা দায়িত্বশীল এবং কতটা জনগণমুখী।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম