বাংলাদেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। টাকা বহনের ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে ক্যাশলেস লেনদেনে ঝুঁকছে সব শ্রেণির মানুষ। এই সুযোগে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডিজিটাল প্রতারণাও। নিত্যনতুন ফাঁদে পড়ে অনেক সময় সর্বস্ব খোয়াচ্ছেন গ্রাহক। আর এসব টাকা পুনরুদ্ধারের পরিমাণ অতি নগণ্য।
Advertisement
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্ট (পিএসডি) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), চেক ও কার্ডভিত্তিক লেনদেনে মোট ৮১ হাজার ৪২৩টি প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রতারকরা হাতিয়ে নিয়েছে ৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যার মধ্যে ৮২ কোটি ৭২ লাখ টাকা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সামগ্রিক অর্থ পুনরুদ্ধারের হার মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।
আরও পড়ুন অনলাইন প্রতারণা: ৬১ জনের ৪৪৫ ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশপ্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি বাড়ার সঙ্গে নিরাপদ পেমেন্ট প্রক্রিয়া, কার্যকর প্রতারণা প্রতিরোধ ও দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলায় জোর দিতে হবে।
যেভাবে জালিয়াতির শিকার হন গ্রাহকদীর্ঘদিন ধরে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে আসছেন গণমাধ্যমকর্মী জয়নাল আবেদীন। সম্প্রতি তিনি একটি অভিনব প্রতারণার শিকার হন। তার মোবাইল ফোনে একটি কল আসে, যেখানে কলকারী নিজেকে বিকাশের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন।
Advertisement
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ খাতে তদারকি আরও জোরদার করছে এবং পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন বিভাগ নিয়মিত নমুনাভিত্তিক পরিদর্শন পরিচালনা করছে। এমএফএস অপারেটররা প্রতারণা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ এতে তাদের সুনাম ও গ্রাহকের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে।-বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান
কথোপকথনের একপর্যায়ে জয়নালের মোবাইলে একটি ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) পাঠানো হয়। এরপর প্রতারক চক্র জানায়, আপনার পাসওয়ার্ড ও আমরা যে নম্বরটি দিয়েছি, তার বিয়োগফল আমাদের জানান।
ঘটনার সময় মোবাইল ফোনটি জয়নালের স্ত্রীর কাছে থাকায় তিনি বিষয়টি সন্দেহজনক মনে করেননি। সহজ-সরল বিশ্বাসে তিনি পাসওয়ার্ড থেকে প্রতারকদের দেওয়া সংখ্যাটি বিয়োগ করে প্রাপ্ত ফল জানিয়ে দেন। এই তথ্য ব্যবহার করে প্রতারকরা মূল পাসওয়ার্ড বের করে ফেলেন এবং মুহূর্তের মধ্যেই জয়নালের বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা তুলে নেন।
আরও পড়ুন ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদে খোয়া যাচ্ছে লাখ লাখ টাকাএ বিষয়ে জয়নাল আবেদীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে লেনদেন করছি। আগে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। আমার স্ত্রী প্রতারণার কৌশলটি বুঝতে না পেরে তাদের চাওয়া তথ্য দিয়ে দেন। এরপরই তারা খুব সহজে আমাদের পাসওয়ার্ড জেনে অ্যাকাউন্টের টাকা হাতিয়ে নেয়।’
Advertisement
চেক জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার জোড়পুকুরিয়া শাখার গ্রাহক বকুল হোসেনের অ্যাকাউন্ট থেকে ১২ লাখ ২৮ হাজার টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতারণার সঙ্গে ব্যাংকের এক কর্মকর্তাও জড়িত ছিলেন। বকুল হোসেন নিজে ব্যাংকে উপস্থিত না থাকলেও জালিয়াতির মাধ্যমে তার হিসাব থেকে পুরো অর্থ তুলে নেওয়া হয়।
বকুল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘জমি-সংক্রান্ত একটি কাজে টাকার প্রয়োজন হওয়ায় ব্যাংকে গিয়ে দেখি আমার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। পরে জানতে পারি, জালিয়াতির মাধ্যমে পুরো অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়কে জানালে অভিযোগের ভিত্তিতে আমার টাকার সমন্বয় করা হয়।’
সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও ঘটনাটি স্বীকার করেন। নাম প্রকাশ না করে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রাহকের অর্থ ইতোমধ্যে সমন্বয় করা হয়েছে। চেক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছিল, সেটি সত্য।’
এমএফএসেই সর্বাধিক প্রতারণাবাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট হাতিয়ে নেওয়া অর্থের প্রায় ৮৮ শতাংশই মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস খাতের। ২০২৫ সালে এ খাতে প্রতারণার মাধ্যমে ৮১ কোটি ৩২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়, যার মধ্যে ৭৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা যায়নি। অর্থ পুনরুদ্ধারের হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
বছরের প্রথম প্রান্তিকে এমএফএসে প্রতারণার ঘটনা ছিল ১৬ হাজার ২৩০টি, যা দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেড়ে ১৮ হাজার ৬২৩টিতে পৌঁছায়। একই সময়ে আত্মসাতের পরিমাণও বেড়ে সর্বোচ্চ ২১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা হয়। পরে বছরের শেষার্ধে ঘটনার সংখ্যা ও ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমে আসে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রতারকরা চুরি করা অর্থ খুব দ্রুত একাধিক অ্যাকাউন্ট ও মধ্যবর্তী ওয়ালেটের মাধ্যমে স্থানান্তর করায় ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই অর্থ উদ্ধারের সুযোগ কমে যায়। এ কারণে পুনরুদ্ধারের হারও অত্যন্ত নিম্ন।
এমএফএস প্রতারণা কমাতে সুপারিশরিয়েল-টাইম লেনদেন পর্যবেক্ষণ, দ্রুত ওয়ালেট ফ্রিজ করার ব্যবস্থা, এজেন্টদের অর্থপাচারবিরোধী (এএমএল) প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং বিহেভিয়ারাল অ্যানালিটিক্স ব্যবহারের সুপারিশ করেছে।
চেক জালিয়াতিতে ক্ষতি বেশি, উদ্ধারও বেশি২০২৫ সালে ৩০টি চেক জালিয়াতির ঘটনায় প্রতারকরা প্রায় ৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। তবে এ খাতে অর্থ পুনরুদ্ধারের হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮১ শতাংশ।
যদিও চেক জালিয়াতির ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম, প্রতিটি ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বড় হওয়ায় এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা শাখা পর্যায়ে যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার, ইমেজভিত্তিক চেক বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করেন।
কার্ড জালিয়াতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে কার্ডভিত্তিক লেনদেনে তিন হাজার ৭৪০টি প্রতারণার ঘটনায় প্রায় দুই কোটি ৬৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। তবে পরবর্তী প্রান্তিকগুলোতে প্রতারণার সংখ্যা ও ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ঘটনার সংখ্যা নেমে আসে ১ হাজার ৭১৭টিতে এবং ক্ষতির পরিমাণ ৭ লাখ টাকারও নিচে নেমে যায়।
আরও পড়ুন অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা থেকে বাঁচার ৫ উপায়বিশ্লেষকদের মতে, ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) ব্যবহারে কঠোরতা, উন্নত প্রতারণা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং মার্চেন্ট পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করায় এ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কার্ড জালিয়াতিতে অর্থ পুনরুদ্ধারের হার ছিল প্রায় ৪৭ শতাংশ।
প্রতারণা রোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশপ্রতিবেদনে প্রতারণা নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি কৌশলগত সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এমএফএস খাতে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ‘কুলিং-অফ’ সময়সীমা, সব পেমেন্ট সেবা প্রদানকারীকে অন্তর্ভুক্ত করে কেন্দ্রীয় প্রতারণা নিবন্ধন (ফ্রড রেজিস্ট্রি) এবং রিয়েল-টাইম আন্তঃঅপারেটর ওয়ালেট ফ্রিজিং ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও এর সঙ্গে প্রতারণা প্রতিরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সমানতালে উন্নত না হলে ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিশেষ করে এমএফএস খাতে অর্থ উদ্ধারের হার অত্যন্ত কম হওয়া উদ্বেগজনক।-ব্যাংক খাত গবেষক এম হেলাল আহমেদ জনি
চেকভিত্তিক লেনদেনের জন্য উন্নত প্রমাণীকরণ প্রযুক্তি, এলোমেলো শাখা নিরীক্ষা ও অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি মূল্যায়ন জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। কার্ডভিত্তিক লেনদেনে এআইচালিত ফ্রড স্কোরিং মডেল, সীমান্তপারের ই-কমার্স লেনদেনে বাড়তি নজরদারি ও মার্চেন্ট অনবোর্ডিংয়ে কঠোর যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক যা বলছেবাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ খাতে তদারকি আরও জোরদার করছে এবং পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন বিভাগ নিয়মিত নমুনাভিত্তিক পরিদর্শন পরিচালনা করছে।’
তিনি বলেন, ‘এমএফএস অপারেটররা প্রতারণা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ এতে তাদের সুনাম ও গ্রাহকের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে।’
আরিফ হোসেন খান জানান, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), সিআইডিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে আর্থিক অপরাধ দমনে কাজ করছে।
আরও পড়ুন চীনের ৬ জনসহ গ্রেফতার ৯ / অনলাইন জুয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শুরুতেই দেন তিনগুণ লাভ, পরে নিঃস্বতার ভাষ্য, ডিজিটাল লেনদেনের সামগ্রিক পরিমাণের তুলনায় প্রতারণার হার এখনো তুলনামূলকভাবে কম হলেও ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্কতা ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ব্যাংক খাত গবেষক এম হেলাল আহমেদ জনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও এর সঙ্গে প্রতারণা প্রতিরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সমানতালে উন্নত না হলে ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিশেষ করে এমএফএস খাতে অর্থ উদ্ধারের হার অত্যন্ত কম হওয়া উদ্বেগজনক। এর অন্যতম কারণ প্রতারকরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক অ্যাকাউন্ট ও ওয়ালেট ব্যবহার করে অর্থ সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়।’
তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নয়, গ্রাহক পরিচিতি (কেওয়াইসি) যাচাই, ভুয়া সিম ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্তকরণ, রিয়েল-টাইম লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।’
একই সঙ্গে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি, কারণ অনেক প্রতারণাই ওটিপি, পিন বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার মাধ্যমে সংঘটিত হয় বলে জানান তিনি।
হেলাল আহমেদ জনি আরও বলেন, ‘ডিজিটাল লেনদেনের ওপর মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হলে প্রতারণা শনাক্তের পাশাপাশি দ্রুত অর্থ পুনরুদ্ধার ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’
ইএআর/এএসএ/এমএফএ