শৈশবে বাবা মানেই একধরনের শক্ত দেয়াল। যিনি সব সমস্যার সমাধান করতে পারেন, যিনি কঠিন সিদ্ধান্ত নেন, আর যিনি নিয়ম তৈরি করেন। ছোটবেলায় আমরা বাবাকে অনেকটা কঠোর নিয়ন্ত্রক হিসেবেই দেখি। কখন খেলতে যাব, কখন পড়তে বসব, কোথায় যাব, সবকিছুতেই বাবার সিদ্ধান্তই শেষ কথা। তখন অনেক সময় মনে হয়, বাবা শুধু বারণই জানেন, বুঝতে চান না।
Advertisement
কিন্তু এই ধারণা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। বিশেষ করে যখন মানুষ নিজেই দায়িত্ব নিতে শুরু করে, তখন বাবাকে দেখা হয় নতুন চোখে।
কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসাছোটবেলায় বাবার অনেক সিদ্ধান্তই আমাদের কাছে অন্যায় মনে হতো। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যেতে না দেওয়া, রাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাসায় ফেরার নির্দেশ, পড়াশোনার জন্য চাপ দেওয়া কিংবা অযথা খরচে বাধা দিতো বলে অনেকেরই অভিমান ছিল।
তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায়, সেই কঠোরতা আসলে নিয়ন্ত্রণ নয়, ছিল দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। একজন বাবা সব সময় সন্তানের বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের কথাও ভাবেন। তাই অনেক সময় তিনি এমন সিদ্ধান্ত নেন, যা তখন অপছন্দের মনে হলেও পরবর্তীতে তার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
Advertisement
অনেক মানুষই কর্মজীবনে প্রবেশ করার পর বাবাকে নতুন করে চিনতে শুরু করেন। নিজের আয়, সংসারের ব্যয়, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে হঠাৎ উপলব্ধি হয়- একজন বাবা বছরের পর বছর কতটা চাপের মধ্যে থেকেও পরিবারের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন।
মাস শেষে সংসারের খরচ মেটানো, সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করা, পরিবারের স্বপ্ন পূরণে নিজস্ব ইচ্ছাগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখা, এসব বিষয় ছোটবেলায় চোখে পড়ে না। কিন্তু যখন নিজের জীবনেও দায়িত্ব আসে, তখন বাবার নীরব ত্যাগগুলো একে একে সামনে আসে।
বাবার ভালোবাসার ভাষা একটু ভিন্নমায়েরা সাধারণত ভালোবাসা প্রকাশ করেন আবেগ দিয়ে। কিন্তু বাবাদের ভালোবাসা অনেক সময় প্রকাশ পায় দায়িত্ব ও কাজের মাধ্যমে। তারা হয়তো প্রতিদিন ‘ভালোবাসি’বলেন না, কিন্তু সন্তানের জন্য অতিরিক্ত সময় কাজ করেন, নিজের প্রয়োজন কমিয়ে তার চাহিদা পূরণ করেন।
অনেক বাবা সন্তানের কাছে আবেগ প্রকাশে স্বচ্ছন্দ নন। তবুও সন্তানের পরীক্ষার ফল নিয়ে উদ্বেগ, রাতে দেরি হলে ফোন করা, অসুস্থ হলে পাশে থাকা কিংবা প্রয়োজনের সময় নীরবে সাহায্য করা তাদের ভালোবাসার প্রকাশ। বাবা হওয়ার অনেকেই বুঝতে পারেন, ভালোবাসার সব ভাষা এক রকম হয় না।
Advertisement
শিশুকালে বাবাকে নিখুঁত মনে হলেও বড় হওয়ার পর তার ভুলগুলোও চোখে পড়ে। হয়তো তিনি সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি, হয়তো কিছু ক্ষেত্রে তিনি আরও ভালো করতে পারতেন।
তবে পরিণত বয়সে এসে আমরা উপলব্ধি করি, একজন বাবা কখনোই নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করেন না, তিনি চেষ্টা করেন তার সামর্থ্যের মধ্যে সেরাটা দিতে। সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও পরিবারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মধ্যেই তার বিশেষত্ব লুকিয়ে থাকে।
বাবা হওয়ার অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনসবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে যখন কেউ নিজে বাবা হয়। তখন হঠাৎ করে নিজের বাবার অবস্থানে নিজেকে কল্পনা করা শুরু হয়। একটি ছোট সন্তানের প্রতিটি চাহিদা, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যেরমতো দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে।
তখন বোঝা যায়, বাবা হওয়া শুধু একটি সম্পর্ক নয়, এটি একটি ২৪ ঘণ্টার দায়িত্ব। ঘুমের আগে শেষ চিন্তা আর ঘুম থেকে ওঠার প্রথম চিন্তাই থাকে সন্তানের ভবিষ্যৎ। এই অনুভূতি তখনই বোঝা যায়, যখন কেউ নিজে সেই অবস্থানে যায়।
আরও পড়ুন বাবা দিবসে যেসব জিনিস উপহার হিসেবে দিতে পারেন সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সম্পর্কের সমীকরণএকসময় বাবা সন্তানের হাত ধরে হাঁটতে শেখান। স্কুলে নিয়ে যান, বিপদ থেকে রক্ষা করেন, জীবনের প্রথম পাঠগুলো দেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই দৃশ্য বদলাতে শুরু করে।
বাবার চুলে পাক ধরে, শরীর আগের মতো শক্তিশালী থাকে না। তখন সন্তানই বাবার খোঁজ নেয়, ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যায়, ওষুধ খেতে মনে করিয়ে দেয়। এই পরিবর্তন অনেককে আবেগপ্রবণ করে তোলে। তখন বোঝা যায়, জীবন কত দ্রুত বদলে যায় এবং প্রিয় মানুষদের সঙ্গে কাটানো সময় কতটা মূল্যবান।
আরও পড়ুন বাবার সঙ্গে যোগাযোগের দূরত্ব কমানোর উপায়বাবাকে নতুন করে বুঝতে শেখা কোনো নির্দিষ্ট দিনের ঘটনা নয়। এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া, যা জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়।
মানুষ যখন দায়িত্ব নেয়, যখন নিজে বাবা হয়, যখন বাস্তব জীবনের চাপ অনুভব করে তখনই বাবার জীবনের গল্প নতুনভাবে সামনে আসে। তখন বোঝা যায়, বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন, তিনি একজন নীরব যোদ্ধা, যিনি নিজের স্বপ্নকে পিছনে রেখে সন্তানের স্বপ্ন গড়ে তোলেন। আর সেই উপলব্ধিই জীবনকে আরও গভীর করে তোলে, আর বাবাকে আরও বেশি সম্মান, করতে শেখায়।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে, দ্য ডেইলি ড্যাড , ইন মাইন্ড ও অন্যান্য
এসএকেওয়াই