বর্তমানে দ্রুতগতির জীবনে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজের চাপ, পড়াশোনা, ট্রাফিক জ্যাম, আর্থিক উদ্বেগ নিয়ে মানুষ প্রতিনিয়ত মানসিক ক্লান্তির মধ্যে থাকে। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই বিভিন্ন উপায়ে মানসিক প্রশান্তি খোঁজেন। কেউ গান শোনেন, কেউ ভ্রমণ করেন, আবার কেউ প্রকৃতির কাছে সময় কাটান।
Advertisement
তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে যে, মোটরসাইকেল চালানো কি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে? বিভিন্ন গবেষণা ও অভিজ্ঞতা বলছে, হ্যাঁ-সঠিকভাবে এবং নিরাপদে বাইক চালানো মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউসিএলএ) স্নায়ুবিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ২০ মিনিট মোটরসাইকেল চালানোর পর চালকের কর্টিসলের (স্ট্রেস হরমোন) মাত্রা ২৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এটি ধ্যান বা যোগব্যায়ামের সমতুল্য মানসিক প্রশান্তি দেয়।
স্ট্রেস কমাতে মোটরসাইকেল রাইডিংয়ের ভূমিকাগবেষণায় দেখা গেছে, মোটরসাইকেল চালানোর সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন নিঃসৃত হয়, যা আনন্দ ও উত্তেজনা তৈরি করে। বিশেষ করে খোলা রাস্তায় দীর্ঘ দূরত্বে রাইড করলে মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে বর্তমান মুহূর্তে কেন্দ্রীভূত থাকে। এই অবস্থাকে অনেক গবেষক মাইন্ডফুলনেস স্টেট বলেন, যেখানে ব্যক্তি তার দৈনন্দিন চিন্তা-চাপ থেকে কিছু সময়ের জন্য মুক্ত থাকতে পারেন।
Advertisement
যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ট্রাফিক ও মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, নিরাপদ মোটরসাইকেল রাইডিং অংশগ্রহণকারীদের হৃদস্পন্দন কিছুটা বেড়ে গেলেও মানসিক চাপের অনুভূতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর কারণ হলো রাইডিংয়ের সময় মনোযোগ পুরোপুরি রাস্তায় ও নিয়ন্ত্রণে থাকে, ফলে দুশ্চিন্তা বা নেতিবাচক চিন্তা কমে যায়।
প্রকৃতির সংস্পর্শ ও মানসিক প্রশান্তিমোটরসাইকেল ভ্রমণের আরেকটি বড় সুবিধা হলো প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। শহরের ভিড়, কোলাহল আর দূষণ থেকে দূরে খোলা রাস্তায় চলার সময় মন স্বাভাবিকভাবেই হালকা হয়ে যায়। বিশেষ করে গ্রামীণ রাস্তা, পাহাড়ি পথ বা নদীর ধারের রুটে বাইক চালালে চোখ ও মস্তিষ্ক দুটোই প্রশান্তি অনুভব করে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানো কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন কমাতে সাহায্য করে। বাইক রাইডের সময় এই অভিজ্ঞতা আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়, কারণ বাতাসের গতি, শব্দ এবং দৃশ্য সব মিলিয়ে একটি “ইমারসিভ এক্সপেরিয়েন্স” তৈরি হয়।
আরও পড়ুন বাবা কেন মেয়েদের বন্ধু, কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে কঠোর মনোযোগ বৃদ্ধিমোটরসাইকেল চালানোর সময় একজন রাইডারকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। রাস্তার অবস্থা, ট্রাফিক, গতি নিয়ন্ত্রণ রাখা বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হয়। এই উচ্চমাত্রার মনোযোগ মস্তিষ্ককে বর্তমান মুহূর্তে রাখে, যা উদ্বেগ বা অতিরিক্ত চিন্তা কমাতে সাহায্য করে।
Advertisement
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, রাইডিংয়ের সময় মস্তিষ্কের “প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স” সক্রিয় থাকে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ফোকাস নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। ফলে রাইডিং এক ধরনের মানসিক ব্যায়াম হিসেবেও কাজ করে।
রাইড থেরাপির ধারণাবর্তমানে অনেক রাইডার কমিউনিটিতে রাইড থেরাপি বা বাইক থেরাপি শব্দটি জনপ্রিয় হচ্ছে। এর মানে হলো, মোটরসাইকেল চালানোকে এক ধরনের মানসিক থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করা। দীর্ঘ সময় একা বা গ্রুপে রাইড করলে অনেকেই মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পান। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার বা ব্যক্তিগত জীবনের চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে তারা উইকেন্ডে রাইডে বের হন। এটি তাদের মানসিক পুনরুজ্জীবন দেয়।
আরও পড়ুন সংগীত যেভাবে মন ও মস্তিষ্ক পরিবর্তন করে তবে নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণযদিও মোটরসাইকেল চালানো মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে, তবে এর জন্য নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হেলমেট, গ্লাভস, সেফ ড্রাইভিং এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক। অসতর্ক বা দ্রুতগতির রাইডিং বরং মানসিক চাপ ও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিরাপদ রাইডিংই মানসিক প্রশান্তির আসল চাবিকাঠি।
সূত্র: মোটরসাইকেল মিশন, মিডিয়াম, আমেরিকান ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন ও অন্যান্য
এসএকেওয়াই