অর্থনীতি

জমির মালিকের ফ্ল্যাটে ১৫ শতাংশ কর আবাসনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করবে

জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ করকে আবাসন খাতের জন্য নতুন অনিশ্চয়তার কারণ হিসেবে দেখছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক। তার মতে, এ ধরনের কর নীতিগত স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি যৌথ উন্নয়ন প্রকল্প, ফ্ল্যাট হস্তান্তর এবং নগর পুনঃউন্নয়ন কার্যক্রমেও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

Advertisement

আবাসন খাতের এ উদ্যোক্তা মনে করেন, রাজস্ব আহরণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা এমনভাবে করতে হবে যাতে আবাসন খাত নিরুৎসাহিত না হয়। প্রস্তাবিত কর, এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং বিকল্প সমাধান নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ইয়াসির আরাফাত রিপন।

জাগো নিউজ: জমির মালিকের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাবকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আব্দুর রাজ্জাক: এটি শুধু একটি নতুন করের বিষয় নয়; বরং আবাসন খাতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের ক্ষেত্রে নীতিগত স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাঝপথে নতুন কর যুক্ত হলে পুরো আর্থিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের হিসাব বদলে যায়।

Advertisement

জাগো নিউজ: এই কর বাস্তবায়নের ফলে সবচেয়ে বড় সংকট কোথায় তৈরি হতে পারে?

আব্দুর রাজ্জাক: সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, করের দায় কে বহন করবে। জমির মালিক নগদ অর্থ পান না, ডেভেলপার বলতে পারেন চুক্তির সময় এমন কর ছিল না, আর ব্যাংকও এটিকে অর্থায়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করবে না। ফলে ফ্ল্যাট হস্তান্তর বিলম্বিত হওয়া এবং আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুন বাজেটে আবাসন খাতে প্রত্যাশিত সহায়তা নেই: রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট

জাগো নিউজ: কর বাস্তবায়নে কী ধরনের প্রশাসনিক সমস্যা দেখা দিতে পারে?

আব্দুর রাজ্জাক: কর নির্ধারণের ভিত্তি কী হবে বাজারমূল্য নাকি চুক্তিমূল্য এ বিষয়ে স্পষ্টতা নেই। মূল্য নির্ধারণ করবে কে, আপত্তি উঠলে তার নিষ্পত্তি কোথায় হবে, এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন। তা না হলে নতুন করে বিরোধ ও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

Advertisement

জাগো নিউজ: যৌথ উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে?

আব্দুর রাজ্জাক: দেশে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পুনর্নির্মাণে যৌথ উন্নয়ন পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর। যদি জমির মালিকরা মনে করেন যে শেষে অতিরিক্ত কর দিতে হবে, তাহলে তারা এমন প্রকল্পে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে নগর পুনঃউন্নয়ন ও নিরাপদ আবাসন নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হবে।

জাগো নিউজ: আবাসন বাজার ও বিনিয়োগে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে?

আব্দুর রাজ্জাক: নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়। নতুন প্রকল্পের সংখ্যা কমে যেতে পারে, নির্মাণ কার্যক্রম ধীর হতে পারে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব কর্মসংস্থান, সংশ্লিষ্ট শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে।

জাগো নিউজ: সরকার তো রাজস্ব বাড়াতে চায়। সে ক্ষেত্রে বিকল্প কী হতে পারে?

আরও পড়ুন ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি রিহ্যাবের

আব্দুর রাজ্জাক: আমরা রাজস্ব আহরণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছি না। তবে এমন পদ্ধতি প্রয়োজন, যাতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিরুৎসাহিত না হয়। ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময়ের পরিবর্তে বিক্রয়ের সময় কর আরোপ করা যেতে পারে, কারণ তখন প্রকৃত অর্থে আর্থিক লেনদেন ঘটে।

জাগো নিউজ: কর কাঠামো আরও গ্রহণযোগ্য করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে?

আব্দুর রাজ্জাক: নিজ বসবাসের জন্য প্রাপ্ত একটি নির্দিষ্ট সীমার ফ্ল্যাট করমুক্ত রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি এককালীন করের পরিবর্তে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিলে করদাতাদের ওপর চাপ কমবে।

জাগো নিউজ: এ বিষয়ে রিহ্যাবের সুপারিশ কী?

আব্দুর রাজ্জাক: সরকার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, রিহ্যাব, জমির মালিকদের প্রতিনিধি এবং অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটি যৌথ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা উচিত। আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধান বের হলে সরকারও রাজস্ব পাবে এবং আবাসন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

আরও পড়ুন কম দামে ফ্ল্যাট কেনা যাবে যেসব এলাকায়

জাগো নিউজ: শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রতি আপনার বার্তা কী?

আব্দুর রাজ্জাক: বর্তমানে সবচেয়ে প্রয়োজন সংলাপ, নীতিগত স্পষ্টতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। আবাসন খাতের গতি কমে গেলে তার প্রভাব শুধু ডেভেলপার বা জমির মালিকের ওপর নয়, পুরো অর্থনীতি, নগর উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও পড়ে। তাই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।

ইএআর/এমআইএইচএস