রাজধানীর ফুসফুস খ্যাত হাতিরঝিলের সার্বিক পরিবেশ আগের তুলনায় অনেকটাই উন্নত ও দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে। মাত্র কিছুদিন আগেও বাড্ডা, গুলশান, রামপুরা, মগবাজার ও কারওয়ান বাজারগামী সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় এ জলাশয়ের বিভিন্ন এলাকাজুড়ে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যেত।
Advertisement
তবে সেই চেনা নেতিবাচক দৃশ্যপট বদলে এটি এখন আবার তার পুরোনো নান্দনিক ও বিনোদনমূলক রূপে ফিরছে। বর্তমানে হাতিরঝিলের চৌহদ্দিজুড়ে ঝকঝকে-তকতকে পরিবেশ বিরাজ করছে। এ পথে নিয়মিত যাতায়াতকারী নগরবাসী পরিবেশের এমন ইতিবাচক পরিবর্তন দেখে একাধারে খুশি ও বিস্মিত হচ্ছেন। সুন্দর এই পরিবেশ যেন সবসময় বজায় থাকে- এমনটাই আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।
হাতিরঝিলে ঝাড়ু দিচ্ছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা/ছবি: জাগো নিউজ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বর্তমানে হাতিরঝিলের দেখভালের দায়িত্ব পালন করছে। সংস্থাটির বিশেষ উদ্যোগে সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য সপ্তাহব্যাপী ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ বা বিশেষ অভিযান চলছে। এই কর্মসূচির আওতায় গোটা এলাকায় শ্রমিকরা দলবেঁধে কাজ করছেন। রাস্তাঘাটের ময়লা-আবর্জনা ছাড়াও সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টিতে গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতা ও ভেঙে পড়া ডালপালা কেটে দ্রুত অপসারণ করছেন তারা।
Advertisement
শনি ও রোববার (২০ ও ২১ জুন) হাতিরঝিল এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও শ্রমিকরা ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে রাস্তার পাশে রাখছেন। বিভিন্ন রাস্তায় রাজউকের ছোট ছোট ট্রাক ঘুরে ঘুরে সেই বস্তাভর্তি ময়লা-আবর্জনাগুলো তুলে নিচ্ছে। রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজে উপস্থিত থেকে পুরো কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করছেন।
ঝাড়ু নিয়ে জড়ো করা ময়লা-আবর্জনা প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে রাখছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা/ছবি: জাগো নিউজ
শুধু রাস্তার ধারের আবর্জনাই নয়, হাতিরঝিলের এক্সপ্রেসওয়ে সেতু, দৃষ্টিনন্দন ওভারপাস ও ওভারব্রিজগুলোতেও শ্রমিকদের গাছের আগাছা ও জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করতে দেখা গেছে।
তেজগাঁও কুনিপাড়া এলাকার বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন, ‘মাত্র কয়েকদিন আগেও হাতিরঝিল এলাকা বলতে গেলে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। যেখানে-সেখানে ময়লা পড়ে থাকতো। ঝড়-বৃষ্টির কারণে ভেঙে পড়া ডাল বা পাতা জমে থাকতো। কিন্তু এখন সেই চিত্র খুঁজে পাওয়া মুশকিল।’
Advertisement
তিনি জানান, গত শনিবার এফডিসির মোড় থেকে গুলশান লিংক রোড পর্যন্ত রাস্তার ডান পাশ বন্ধ রেখে বড় পরিসরে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
গুলশান পুলিশ প্লাজার সামনে আলাপকালে বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘হঠাৎ করে হাতিরঝিল এলাকার পরিবেশের এতটা উন্নতি দেখে সত্যিই অবাক হয়েছি।’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক শিক্ষার্থী মন্তব্য করেন, রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের বিশেষ নির্দেশনায় হয়তো ঝটপট এই ভোলবদল।
হাতিরঝিলে কাজ করছেন শ্রমিকরা এবং ময়লা ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে/ছবি: জাগো নিউজ
তবে রোববার বিকেলে হাতিরঝিল অ্যাম্ফিথিয়েটারের সামনের রাস্তায় কর্মরত রাজউকের সহকারী প্রকৌশলী আমিনুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি অন্য কথা বলেন।
আমিনুল ইসলাম জানান, হাতিরঝিল এলাকাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন করতেই মূলত এই সপ্তাহব্যাপী বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ চালানো হচ্ছে। কোনো বিশেষ বা ওপর মহলের আলাদা কোনো নির্দেশনার কথা তার জানা নেই। রাজউক নিজেদের নিয়মিত দায়িত্ব ও উদ্যোগ থেকেই এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
আরও পড়ুন বৈশাখের বিকেলে এক পশলা বৃষ্টি, প্রাণের পরশ হাতিরঝিলে প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষ, পরিষ্কার হচ্ছে হাতিরঝিলযদিও সূত্র বলছে, গত মাসে ঈদুল আজহার পরদিন ২৯ মে হাতিরঝিল পরিদর্শনকালে আগাছা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরদিনই সকাল থেকে সেখানে শুরু হয় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। এখন নেওয়া হলো ক্র্যাশ প্রোগ্রাম।
ইট-পাথর আর তীব্র যানজটের ব্যস্ত ঢাকা শহরে হাতিরঝিল বরাবরই নগরবাসীর জন্য এক টুকরো স্বস্তির জায়গা। প্রতিদিন বিকেলে এবং বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে হাজার হাজার মানুষ এখানে একটু মুক্ত বাতাস নিতে, পরিবার-পরিজন নিয়ে হাঁটতে কিংবা লেকের পাড়ে বসে সময় কাটাতে আসেন। সকালের দিকেও অনেকে এখানে নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণ ও শরীরচর্চা করেন।
ব্যস্ত ঢাকা শহরে হাতিরঝিল বরাবরই নগরবাসীর জন্য এক টুকরো স্বস্তির জায়গা/ফাইল ছবি
২০০৭ সালের অক্টোবরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) হাতিরঝিল প্রকল্প অনুমোদন দেয়। প্রকল্পে ব্যয়ের এক হাজার ৯৭১ কোটি ৩০ লাখ টাকার মধ্যে রাজউকের এক হাজার ১১৩ কোটি ৭ লাখ, এলজিইডির ২৭৬ কোটি এবং ঢাকা ওয়াসার ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছিল।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন’ (এসডব্লিউও) এবং রাজউকসহ বেশ কয়েকটি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এই হাতিরঝিল প্রকল্প নির্মিত হয়। এর মূল নকশা করেন বিখ্যাত স্থপতি এহসান খান। দীর্ঘদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। মাঝখানে কিছুটা মলিন হলেও, রাজউকের বর্তমান তৎপরতায় হাতিরঝিল আবার তার চিরচেনা রূপ ও সৌন্দর্য ফিরে পাচ্ছে।
এমইউ/একিউএফ