বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যখন বিএসএফের পুশ-ইন তৎপরতা বাড়ছে, যখন প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নানা সমীকরণে ঝুলে আছে এবং যখন প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাকে দিল্লি বিমানবন্দরে হয়রানির প্রতিবাদে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—সেই সময়ে প্রথম বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর কি কূটনীতির নতুন কোনো মারপ্যাঁচের ইঙ্গিত?
Advertisement
এই অঞ্চলে ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যে চীন, সেটি সর্বজনবিদিত। এটিও সবার জানা যে অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগের পতনের ঠিক আগমুহূর্তে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বশেষ সফর ছিল চীন এবং সেখান থেকে সফর সংক্ষিপ্ত করে তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন। রাজনৈতিক মহলে এরকম কথাও প্রচলিত আছে যে, শেখ হাসিনার চীন সফরের ব্যর্থতাই তার পতনের গতি ত্বরান্বিত করেছে। আবার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে শেখ হাসিনার ভারতে চলে যাওয়া এবং আওয়ামী লীগের আরও অনেক শীর্ষ ও মাঝারি, এমনকি ছোট নেতাও এখন ভারতে অবস্থান করছেন। যে কারণে অভ্যুত্থানের পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। শুধু তা-ই নয়, দুই দেশের কিছু উগ্রবাদীর উসকানি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।
এরকম পরিস্থিতিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটারের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ধারণা করা হচ্ছিল, যেহেতু একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আছে, অতএব প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন কিছুটা কমবে। অন্তত দুই দেশের মধ্যে ভিসা আদান-প্রদান স্বাভাবিক হবে। সেই প্রক্রিয়া অবশ্য শুরুও হয়েছিল। এমনকি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হবে ভারত—এমন গুঞ্জনও উঠেছিল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর চীন—এ কথাও জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। কেননা, প্রথমে তিনি গেছেন মালয়েশিয়া। যে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে বেশি ব্যবসায়িক। তাছাড়া দেশ হিসেবে মালয়েশিয়া অনেকটা নিরপেক্ষ বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মালয়েশিয়া কখনোই বড় ফ্যাক্টর নয়—যতটা ফ্যাক্টর ভারত, পাকিস্তান, চীন ও আমেরিকা। ফলে প্রথম সফরের ভেন্যু হিসেবে মালয়েশিয়ার মতো একটি নিরপেক্ষ এবং অরাজনৈতিক দেশকে বেছে নেওয়া তারেক রহমানের দূরদর্শী কূটনীতির পরিচায়ক—তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
Advertisement
তার বা তার সরকারের কূটনৈতিক দূরদর্শিতার আরেকটি উদাহরণ হলো, একই সফরে তার চীন সফর। অর্থাৎ, অফিসিয়ালি তার প্রথম সফর মালয়েশিয়া হলেও একই সফরে তিনি যাচ্ছেন চীনে। এটা অনেকটা সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না—এমন কৌশল। কেননা, তিনি প্রথমেই চীনে গেলে এটি হয়তো ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হতো। বিএনপি সরকার হয়তো শুরুতেই এরকম অস্বস্তির জন্ম দিতে চায়নি। দ্বিতীয়ত, প্রথম সফরের দ্বিতীয় দেশ হিসেবে চীনে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান তথা বিএনপি সরকার হয়তো ভারতকে এই বার্তা দিতে চাইল যে, বাংলাদেশ এখন আর অতীতের মতো ‘ভারতনির্ভর’ হয়ে থাকতে চায় না। উপরন্তু, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যেসব বিষয় অমীমাংসিত বা যেসব বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রতিনিয়তই টানাপোড়েন তৈরি হয়, সেগুলো সমাধানে ভারত যাতে চাপ বোধ করে, সেজন্যও হয়তো প্রধানমন্ত্রী প্রথম সফরের সঙ্গেই চীনকে যুক্ত করলেন।
অবশ্য এখানে শুধু ভারতকে চাপে ফেলাই নয়, বরং বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্পসহ আরও একাধিক বড় প্রকল্পে চীনের আগ্রহের কথা সবার জানা। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে এসব বিষয়ে চুক্তি ও সমঝোতা হলে নতুন সরকারের জন্য সেটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কেননা, জুলাই অভ্যুত্থানের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশ যেভাবে অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর হয়েছে, সেখান থেকে উত্তরণের জন্য বড় বিদেশি বিনিয়োগের আপাতত কোনো বিকল্প নেই। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগও বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে আমদানি-রপ্তানিনির্ভর ব্যবসা ও শিল্পকারখানার সংকট চিহ্নিত করে ধারাবাহিকভাবে সেগুলো সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি চীনের মতো দেশ যদি একাধিক বড় প্রকল্পে যুক্ত হয়, সেটিও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।
মনে রাখতে হবে, তারেক রহমান এমন একটি সময়ে মালয়েশিয়া ও চীন সফরে যাচ্ছেন, যখন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের পুশইন তৎপরতায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের অন্যতম দেশ চীন হওয়ায় এটিকে তার ‘চীনমুখী নীতি’ বলা যাবে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এটি যে তার এবং তার সরকারের একটি দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক কৌশল, তাতে সন্দেহ নেই। এর সাফল্য নির্ভর করবে চীনের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কী কী চুক্তি ও সমঝোতা সই হয় এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হলো—তার ওপর।
Advertisement
বাস্তবতা হলো, ভারত বরাবরই নিজেদের তার সব প্রতিবেশীর চেয়ে বেশি প্রভাবশালী মনে করে। এই মনে করার যথেষ্ট কারণও আছে। কিন্তু আকারে, জনসংখ্যায় ও সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকার মানেই যে প্রতিবেশীর ওপর খবরদারি করা নয়, বরং প্রতিটি স্বাধীন দেশকেই যে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে হয়; কূটনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়—বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারত এই নীতি কখনোই প্রয়োগ করেনি, এই অভিযোগ বেশ পুরোনো। তাহলে কি বাংলাদেশকে তৃতীয় কোনো একটি দেশের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভারত মনে করে যে বাংলাদেশ একা নয় বা দুর্বল নয়?
পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনসহ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানে বাংলাদেশ কি তাহলে এমন একটি কৌশলে এগোচ্ছে, যাতে ভারত নিজের সিদ্ধান্ত ও পছন্দ চাপিয়ে দিতে না পারে এবং বাংলাদেশকে সমীহ করতে বাধ্য হয়? আপাতদৃষ্টিতে এর বিকল্পও নেই। কেননা, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে টানাপোড়েন বেড়েছে, সেখান থেকে উত্তরণ এককভাবে বাংলাদেশের ওপর নির্ভর করে না। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন নির্ভর করে দুই দেশের ওপর। একজন এক হাত এগোলে, আরেকজনকেও এক হাত এগোতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পরে যখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হচ্ছিল, দুই দেশের মধ্যে ভিসা আদান-প্রদান স্বাভাবিক হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলো, তখনই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলো বিজেপি এবং তারপরই সীমান্তে পুশ-ইন বেড়ে গেল। এই ইস্যুতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বিএসএফ যাদের পুশ-ইনের চেষ্টা করছে, তাদের সবাই কি সত্যিকারের বাংলাদেশি? যারা সত্যিকারের বাংলাদেশি, তাদেরও সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া সম্মানজনক আচরণ নয়। বরং দুই দেশের কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রকৃত বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। কিন্তু কে বাংলাদেশি আর কে বাংলাদেশি নয়, এটা প্রমাণসাপেক্ষ। আবার পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে যেভাবে লাখ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যেসব শর্তে তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হচ্ছে, তার পেছনেও আছে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির খেলা। সুতরাং এতসব রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের লড়াই করে জিতে আসা সহজ নয়। তার বিপরীতে জুলাই অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট যেভাবে বেড়েছে এবং বাড়ছে, সেটিও বাংলাদেশকে নতুন কোনো বিপদের দিকে ঠেলে দেয় কি না, সেদিকেও সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে।
অনেকে মনে করেন, ভারত যে যুক্তিতেই পুশইনের চেষ্টা বাড়াক না কেন, এটি যে বাংলাদেশকে চাপে রাখারও একটি কৌশল, সেটি না বোঝার কোনো কারণ নেই। সুতরাং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের এই সমস্যা সমাধানে শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনাই নয়, বরং এখানে তৃতীয় কোনো দেশকে যুক্ত করা এবং পুশ-ইন যেহেতু একটি মানবাধিকারেরও ইস্যু, অতএব এখানে জাতিসংঘকেও যুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের অন্যতম দেশ চীন হওয়ায় এটিকে তার ‘চীনমুখী নীতি’ বলা যাবে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এটি যে তার এবং তার সরকারের একটি দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক কৌশল, তাতে সন্দেহ নেই। এর সাফল্য নির্ভর করবে চীনের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কী কী চুক্তি ও সমঝোতা সই হয় এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হলো—তার ওপর।
লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।
এইচআর/এমএফএ/জেআইএম