কাজী মনজুর করিম মিতুল, প্রকৌশলী ও প্রাবন্ধিক
Advertisement
বাংলাদেশে ‘বাবা দিবস’ পালিত হতে যখন শুরু করেছে, তখন আমার বাবা পৃথিবীতে নেই। কাজেই আমার প্রজন্মের অনেকের মতোই, বাবা দিবস আসেনি আমার জীবনে। আমার পুত্র এক সময় বাবা দিবসে কার্ড-টার্ড বানাতো, পরে সেটা থেমে গেছে আমারই অনাগ্রহে।
আমি মনে করি আমাদের সংস্কৃতিতে আলাদা করে বাবা দিবস পালন করা নিষ্প্রয়োজন। বছরের সকল দিবসেই বাবাকে বলা উচিত, ‘বাবা, তোমাকে ভালবাসি’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে বলা যায়? আর মুখে বলার চেয়ে কাজে প্রমাণ করাটা কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়?
বয়স ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ভেদে এই ভালোবাসার প্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া তরুণ তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারে না, ‘আই লাভ ইউ, বাবা’। কিন্তু একই বয়সের একজন তরুণী অবলীলায় বলতে পারে। প্রি-স্কুল পড়ুয়া কোনো পুত্র তার বাবার চুলে রাবার ব্যান্ড বাঁধার খেলাটি খেলতে পারে না, বাবার নখে নেইল পলিশ লাগাতে পারে না। একই বয়সী কন্যা সন্তান তা হাসতে হাসতে পারে। ছেলেদের ভালোবাসার প্রকাশ বড় নীরব, বড্ড অপ্রকাশিত।
Advertisement
একইভাবে, বাবারা কন্যাদের প্রতি যতটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন, পুত্ররা সেটা থেকে বঞ্চিত। কিন্তু তাই বলে কি ভালোবাসা নেই? নিশ্চয়ই আছে। এবার আমার নিজের গল্পটা বলি।
আমার বাবার কাছে আমি ছিলাম গোটা পৃথিবী। আমার কাছে বাবা যেন চাঁদ। অন্ধকারে তিনি আলোর দ্যূতি। আমার শৈশব-কৈশোরের সারাদিন কাটতো মায়ের সঙ্গে, তিনি আমার স্কুলেই শিক্ষকতা করতেন। বাবাকে কাছে পেতাম সন্ধ্যার পর, তিনি ছিলেন ব্যাংকার।
শুক্রবার বাদ দিলে বাকি দিনগুলোতে তিনি অফিস থেকে বাড়ি ফিরতেন সূর্য ডোবার পর, আমরা এক সাথে নাশতা করতাম, কথা হতো খেলা আর রাজনীতি নিয়ে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট বা ফুটবল নিয়ে বাবার উচ্ছ্বাস ছিল মাত্রাতিরিক্ত। বাবার কারণে আমার ছেলেবেলাটা ছিল ম্যারাডোনাময়। ৮৬-র বিশ্বকাপের সময় বেডরুমের দেয়ালে বাবা ম্যারাডোনার বেশ কিছু ছবি (পত্রিকার কাট-আউট) লাগিয়েছিলেন, আর আমিও সেই থেকে আর্জেন্টিনার ভক্ত।
তখন খেলা হতো শুধু বিটিভিতে। আমাদের প্রতিবেশীদের ঘরে রঙিন টিভি ছিল না। ওরা চলে আসতো আমাদের বাড়িতে। আমাদের একতলা বাড়ির বারান্দাটা হয়ে যেত এক মুখর গ্যালারি। সেখানে সবচেয়ে বেশি হৈচৈ করা মানুষ ছিলেন আমার বাবা, সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। কখনো কখনো গভীর রাতে ঝাল-মুড়ি মাখানো হতো, আর ফাইনাল খেলার রাতে ছিল পিকনিকের আমেজ!
Advertisement
সেই ৮০-র দশকে আমাদের গ্রামে প্রত্যেক সন্ধ্যায় ঘণ্টা দুয়েক লোডশেডিং হতো। হারিকেনের আলোয় মা আমাকে পড়াতেন বারান্দায় বসে। বাবা পাশে মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে থাকতেন। আমি অপেক্ষা করতাম, কখন পড়া শেষ হবে, আর বাবার সাথে ‘রেসলিং’ খেলব। বাবা প্রত্যেক দিন আমাকে জিতিয়ে দিতেন। ঘেমে নেয়ে ওঠা আমি জয়ের আনন্দে বিহবল হতাম। এটাই ছিল আমাদের ভালোবাসার আদান-প্রদান। কেউ কাউকে মুখে বলিনি, ভালোবাসি।
শীতকালে বাড়ির সামনের মাঠে ব্যাডমিন্টনের কোর্ট কাটার উদ্যোগ বাবাই নিতেন। কলেজ জীবনে তিনি ক্যারমের চ্যাম্পিয়ন ছিলেন৷ কাজেই আমাদের বাড়িতে খেলা নিয়ে মাতামাতি তার একটু বেশিই ছিল। আমি বরং খেলার চেয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় বেশি আগ্রহ পেতাম।
আমি যখন খুলনা ছেড়ে ঢাকায় চলে এলাম বুয়েটে পড়তে, বাবা খুশি হন নি। তার ইচ্ছা ছিল আমি খুলনাতেই পড়ি। কুয়েট বা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়লেই বাবা খুশি হতেন। আমি তার মন খারাপ করিয়ে দিয়ে প্রত্যেক ছুটি শেষে ঢাকায় যখন ফিরতাম, তিনি বাসে আমাকে তুলে দিতে এসে আমার সাথে বাসের ভেতর কখনো উঠতেন না, আমাকে জড়িয়েও ধরতেন না।
এ নিয়ে আমার গোপন আক্ষেপ ছিল। তখন তার মুখের মেঘ আমি দেখতে পেতাম না। এখন স্মৃতি হাতড়ে সেই দৃশ্য যখন দেখি, তখন সেই মেঘে ঢাকা চাঁদটা চোখে পড়ে বারবার। নিজের অজান্তেই চোখের কোনে অশ্রুবিন্দু এসে আবার উষ্ণ বাতাসে বাষ্প হয়ে হারিয়ে যায়।
আমাদের যুগের বাবারা এমনই ছিলেন। সন্তানের কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতেন না। হয়তো সে কারণেই আমরা, বিশেষ করে পুত্ররা, বাবাদের ভালোবাসার মূল্যায়ন করতে পারিনি। বাবারা চিরকাল বঞ্চিত রয়ে গেলেন। বাবাকে নিজের প্রয়োজন মেটাবার একটা যন্ত্র হিসেবে দেখে অভ্যস্ত আমরা। মায়েরা ছিলেন আবেগের জায়গা, বাবারা শুধু আটপৌরে প্রয়োজন মেটাবার জন্য উদয়াস্ত খেটে মরবেন - এটাই যেন স্বাভাবিক ছিল আমাদের কাছে। তাই আমার বাবা কোনোদিন অনুভব করতে পারেননি, কতটা ভালবাসতাম আমি তাকে।
বাবা যখন হঠাৎ চলে গেলেন, আমি তখন এম.বি.এ-র ছাত্র। চাকরি ও সংসার সামলে স্নাতকোত্তর পড়ার ধকল আর জীবনযুদ্ধে প্রাণ বাজি রাখা ভীষণ ব্যস্ত এই আমি বাবার অকাল প্রয়াণে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলাম। কবরে তার লাশ নামাতে নামাতে মনে হচ্ছিল, বাবাকে তো কোনো দিন বলাই হলো না, বাবা আমার জীবনের চাঁদ। তার নাম ছিল কাজী কামরুল ইসলাম (আরবি ‘ক্বমর’ অর্থ চাঁদ)।
যাদের বাবা এখনো বর্তমান, তাদের তাই বোঝাবার চেষ্টা করি, বাবাকে নিয়ে আলাদাভাবে সময় কাটান, তার মনের কথা বোঝার চেষ্টা করুন। তিনি না চাইতেই তার কী প্রয়োজন - সেটা তার হাতে পৌঁছে দিন। শুধু বাবা দিবসে, তার ছবি বা তাকে নিয়ে লেখার কোনো মূল্য তার কাছে নেই, যদি তার প্রয়োজনে তিনি সন্তানকে কাছে না পান।
এমআরএম