সন্ধ্যা ও রাতে মাঝারি বর্ষণের পানিতে পুরোনো রূপে ফিরেছে কক্সবাজার শহর। গ্রীষ্মের শেষ দিকে নালা পরিষ্কার করা হলেও পুরো পৌরসভা এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার সেই দুর্বলতা আবার প্রকাশ পেয়েছে।
Advertisement
রোববার (২১ জুন) মাগরিবের আজানের সময় এবং মাঝরাতে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে পর্যটন শহরের প্রধান সড়ক, অলিগলি ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা। ড্রেন উপচে সড়কে পানি ওঠায় সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। দশকের পর দশক চলে আসা এ সংকট উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন শহরবাসী।
রোববার (২১ জুন) সকাল থেকে মেঘলা আকাশ দিয়ে দিনের শুরু হয়। দিনের বিভিন্ন সময় গুঁড়ি বৃষ্টি হলেও সন্ধ্যার দিকে তীব্র আকার ধারণ করে বৃষ্টিপাত। টানা ঘণ্টাখানেক করে মাঝরাতেও চলে বৃষ্টি। এতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বিশেষ করে কলাতলী, সুগন্ধা, হোটেল-মোটেল জোন, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এলাকা, বার্মিজ মার্কেট, বাজারঘাটা, বিজিবি ক্যাম্প ও উপজেলা বাজার এবং শহরের প্রধান সড়কগুলো হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক স্থানে সড়ক ও ড্রেনের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
Advertisement
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন হোটেল-মোটেল জোনে অবস্থানরত পর্যটকরা। প্রধান সড়কে পানি জমে যাওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অনেক পর্যটক হোটেলে আটকা পড়েন, আবার কেউ কেউ সমুদ্রসৈকত দেখতে বের হয়ে জলাবদ্ধতার কারণে হোটেলে ফিরতে এবং স্থানীয় দর্শনার্থীরা বাড়ি ফিরতে ভোগান্তির শিকার হন।
কুমিল্লার চান্দিনা থেকে আসা পর্যটক সজীব আহসান বলেন, রাজধানী ও বিভাগীয় শহরে জলাবদ্ধতা দেখেছি, কিন্তু পর্যটন রাজধানী খ্যাত কক্সবাজারেও একই চিত্র দেখতে হবে ভাবিনি। রাস্তায় যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। হাঁটুপানি মাড়িয়ে চলাফেরা করতে হয়েছে। পর্যটকদের কাছে এটি খুবই নেতিবাচক বার্তা দেয়।
এদিকে বার্মিজ মার্কেট থেকে বাজারঘাটা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি জমে যায়। পৌরসভার পাড়া-মহল্লার সড়ক ও উপসড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক মানুষ কার্যত ঘরবন্দি হয়ে পড়েন।
লিংকরোড এলাকার ফারুক আহমেদ বলেন, শহর থেকে কাজ সেরে রাতে বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় পৌঁছে বৃষ্টিতে বন্দি হই। প্রায় ঘণ্টাখানেক মার্কেটের ছাউনিতে দাঁড়িয়ে ভেজা থেকে রক্ষা পাই। কিন্তু বৃষ্টি থামতেই দেখি ড্রেন উপচে সড়কে হাঁটুপানি। ফলে বাইক চালিয়ে যাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। আমার মতো একই ঝামেলায় পড়েন অনেকে।
Advertisement
সুগন্ধা পয়েন্টের সোহাগ গেস্ট হাউজে ওঠা আলী আমজাদ বলেন, প্রশান্তি পেতে পরিবার নিয়ে কক্সবাজার এসেছি। কিন্তু বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা অশান্তিতে ফেলেছে। শহরের কলাতলী ও কেনাকাটায় গিয়ে বার্মিজ মার্কেট এলাকায় হাঁটুপানি মাড়িয়ে চলতে চলাচল করতে হয়েছে।
শহরের বিজিবি ক্যাম্প এলাকা, গোলদিঘি, বৌদ্ধ মন্দির সড়ক, বড় বাজার, টেকপাড়া, কালুর দোকান, তারাবনিয়ারছড়া, নুরপাড়া, সমিতিপাড়া, নাজিরারটেক, ফদনারডেইল, কুতুবদিয়া পাড়া এবং হোটেল-মোটেল জোনের বিভিন্ন স্থানে একইভাবে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় বাসাবাড়িতেও পানি ঢুকে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
টেকপাড়া এলাকার বাসিন্দা আজিজ রাসেল বলেন, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নিয়মিত নালা-নর্দমা পরিষ্কার না করায় প্রতিবছর জলাবদ্ধতার সমস্যা বাড়ছে। অনেক নালা দখল হয়ে গেছে। নালার ওপর স্থাপনা নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের মতে, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল-নালা দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার অভাবের কারণে কক্সবাজারে জলাবদ্ধতা এখন দীর্ঘদিনের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জনবসতিপূর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, পর্যটননির্ভর কক্সবাজার শহরের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার, খাল-নালা দখলমুক্তকরণ এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। গত কিছু সময় নানাভাবে ড্রেন পরিষ্কারের তোড়জোড় শুরু হলেও তা লোক দেখানো হয়েছে। ফটোসেশনের পরিবর্তে সত্যিকার অর্থে নালাগুলে পরিষ্কার না করলে বর্ষা মৌসুমজুড়ে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।
কক্সবাজার পৌরসভা প্রশাসক মো. শামীম আল ইমরান জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ চলছে। আশা করছি সহসাই সমস্যা সমাধান হবে।
সায়ীদ আলমগীর/এফএ/জেআইএম