‘আজ নগদ, কাল বাকি’—এই ছোট্ট বাক্যটি শুধু একটি লেনদেনের পদ্ধতি নয়; এটি একটি সমাজের ভোগ-সংস্কৃতি, আর্থিক মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ নির্ভরতার জটিল প্রতিচ্ছবি। একসময় এই বাক্যটি ছিল গ্রামীণ হাট-বাজারের দোকানদারি খাতার ভাষা। আজ এটি রূপ নিয়েছে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরেও—মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, অনলাইন ক্রেডিট, এমনকি নগর জীবনের উচ্চমধ্যবিত্ত ভোগব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রবণতায়।
Advertisement
বাংলাদেশে গত দেড় দশকে আর্থিক লেনদেনে যে বিপ্লব ঘটেছে, তার প্রধান চালিকাশক্তি হলো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস। বিশেষ করে বিকাশ, নগদ এবং রকেট দেশের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। নগদ অর্থের বিকল্প হিসেবে এসব প্ল্যাটফর্ম যেমন আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়িয়েছে, তেমনি নতুন এক ‘ডিজিটাল ক্রেডিট সংস্কৃতি’ও তৈরি করেছে, যেখানে ‘আজ ব্যবহার করো, পরে পরিশোধ করো’—এই মানসিকতা ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনের মূল ভিত্তি হলো ভোগের মনস্তত্ত্ব। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় present bias—মানুষ ভবিষ্যতের তুলনায় বর্তমান সন্তুষ্টিকে বেশি মূল্য দেয়। ফলে আয়ের নিশ্চয়তা না থাকলেও ভোগের চাহিদা কমে না। বরং সহজলভ্য ঋণ ও কিস্তি ব্যবস্থার কারণে ভোগ আরও সহজ হয়ে ওঠে। শহুরে জীবনে এটি এখন বহুল দৃশ্যমান: মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিকস, গৃহস্থালি পণ্য কিংবা অনলাইন কেনাকাটায় ‘ইএমআই’ বা কিস্তি ব্যবস্থা এক ধরনের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
তবে এই প্রবণতা কেবল শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামবাংলার পুরোনো ‘বাকি খাতা’ সংস্কৃতি এখন ডিজিটাল রূপ নিয়েছে। দোকানদারের হাতে খাতার বদলে এসেছে মোবাইল নম্বরভিত্তিক লেনদেন, যেখানে মাস শেষে হিসাব মেলানো হয়। এই ব্যবস্থা আপাতদৃষ্টিতে সুবিধাজনক হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একধরনের ঝুঁকি—আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসামঞ্জস্য।
Advertisement
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে ঋণ সবসময়ই একটি দ্বিমুখী ভূমিকা পালন করেছে। একদিকে এটি দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার, অন্যদিকে অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা অনেক পরিবারকে নতুন দারিদ্র্যের চক্রে ফেলেছে। ঋণের ব্যবহার যদি উৎপাদনশীল না হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে চাপ তৈরি করতে পারে।
বর্তমান সময়ে এই চাপ আরও জটিল আকার নিয়েছে। কারণ এখন ঋণ শুধু ব্যাংক বা এনজিওর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও তা সহজলভ্য। ‘Buy Now, Pay Later’ বা কিস্তিভিত্তিক অনলাইন ক্রয়ব্যবস্থা তরুণ প্রজন্মকে দ্রুত ভোগে উৎসাহিত করছে। ফলে আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে।
এ প্রবণতার একটি বড় অর্থনৈতিক প্রভাব হলো ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়া। বাংলাদেশে জাতীয় সঞ্চয়ের হার দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়নশীল অর্থনীতির তুলনায় তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও, নগর জীবনে ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের প্রবণতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ভোগ ও ঋণনির্ভরতা ভবিষ্যতে আর্থিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন সুদের হার বৃদ্ধি বা আয় কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
‘আজ নগদ, কাল বাকি’—এই বাক্যটি আমাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক অদৃশ্য আয়না। এতে যেমন সুযোগ আছে, তেমনি বিপদের ইঙ্গিতও রয়েছে। প্রযুক্তি, নীতি এবং সচেতনতার সমন্বয়ে যদি আমরা এই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারি, তবে ঋণ হবে উন্নয়নের হাতিয়ার; আর যদি না পারি, তবে তা হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যৎ সংকটের বীজ।
Advertisement
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক সাক্ষরতা। অনেক ব্যবহারকারীই ঋণের প্রকৃত ব্যয়, সুদের হার, বা চক্রবৃদ্ধি ঋণের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন নন। ফলে তারা স্বল্পমেয়াদি সুবিধার দিকে ঝুঁকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি উপেক্ষা করেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, সামষ্টিক অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক।
বিশ্ব অর্থনীতিতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে কনজিউমার ক্রেডিট ও ক্রেডিট কার্ড সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। কিন্তু সাম্প্রতিকসময়ে অনলাইন কিস্তি ও ডিজিটাল ঋণব্যবস্থা তরুণদের মধ্যে ঋণনির্ভরতা বাড়িয়েছে। অনেক দেশে এখন ‘ডেট ট্র্যাপ’ বা ঋণের ফাঁদ একটি নীতিগত আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সমস্যাটি আরও সংবেদনশীল, কারণ এখানে আয় বৈষম্য এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে একদিকে যেমন ঋণ দরকারি, অন্যদিকে তা অপব্যবহারের ঝুঁকিও বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ডিজিটাল আর্থিক সেবার ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে এবং বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। তবে দ্রুত পরিবর্তনশীল ফিনটেক বাজারে শুধু নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গতিশীল ও প্রযুক্তি-সচেতন নীতি কাঠামো।
সমাধানের পথ একাধিক স্তরে বিস্তৃত হতে হবে। প্রথমত, আর্থিক শিক্ষাকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে শিশুকাল থেকেই সঞ্চয় ও ঋণের ধারণা পরিষ্কার হয়। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক করতে হবে—সুদের হার, শর্তাবলি এবং ঝুঁকি স্পষ্টভাবে ব্যবহারকারীর কাছে উপস্থাপন করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ সীমা নির্ধারণের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
এছাড়া সামাজিক পর্যায়ে একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও জরুরি। ভোগকে কেবল মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। ‘আজ নগদ, কাল বাকি’—এই মানসিকতা যদি দায়িত্বশীল আর্থিক পরিকল্পনার অংশ না হয়, তবে তা ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সংকট তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, সঞ্চয়কে পুনরায় সামাজিক মর্যাদার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সঞ্চয় শুধু অর্থ জমা নয়; এটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং আত্মনির্ভরতার প্রতীক। একটি সমাজ যত বেশি সঞ্চয়শীল হবে, তার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তত বেশি শক্তিশালী হবে।
কথা এই যে, ‘আজ নগদ, কাল বাকি’—এই বাক্যটি আমাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক অদৃশ্য আয়না। এতে যেমন সুযোগ আছে, তেমনি বিপদের ইঙ্গিতও রয়েছে। প্রযুক্তি, নীতি এবং সচেতনতার সমন্বয়ে যদি আমরা এই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারি, তবে ঋণ হবে উন্নয়নের হাতিয়ার; আর যদি না পারি, তবে তা হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যৎ সংকটের বীজ।
অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি ভোগে নয়, বরং দায়িত্বশীল নির্বাচনে নিহিত—এই উপলব্ধিই হয়তো আমাদের সামনে এগোনোর সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com
এইচআর/এমএফএ/জেআইএম