প্রায় ১৪ বছর আগে জুবের আহমদের বাবা প্রবাসে এক দুর্ঘটনায় মারা যান। সেইসময় ছোট্ট জুবেরকে বুকে আগলে রেখে জীবনযুদ্ধ শুরু করেছিলেন তার মা। বড় হয়ে সংসারের হাল ধরতে কাতারে যান জুবের। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস। বাবার মতো একইভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন জুবের।
Advertisement
স্বামীর পর একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে জুবেরের মা জাহানারা বেগম পাগলপ্রায়। কান্নায় ভেঙে পড়েছে জুবেরের পুরো পরিবার। জুবেরের চার বছরের একটি সন্তান রয়েছে।
সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ঝিঙ্গাবাড়ী ও দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নে জুবেরের মতো আরও চারটি পরিবারে চলছে শোকের মাতম। রোববার (২১ জুন) বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টার দিকে কাতারের রাজধানী দোহা থেকে আল-শাহানিয়া শহরে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে একটি প্রাইভেটকার দুর্ঘটনায় জুবেরসহ ওই এলাকার পাঁচজনের মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন- ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের আমরপুর গ্রামের জিবাল আহমদ (৩৫), মাঝতালুক গ্রামের জসিম উদ্দিন (৩৮), আগতালুক গ্রামের মস্তাক আহমদ (২৭) ও জুবের আহমদ (২৮) এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ গাছবাড়ি গ্রামের কাদির আহমদ (৩৩)।
Advertisement
দুর্ঘটনার খবর গ্রামে পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। নিহতদের বাড়িতে ভিড় করছেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না।
আরও পড়ুন কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ বাংলাদেশি নিহত, সবাই সিলেটের বাসিন্দানিজ গাছবাড়ি গ্রামের কাদির আহমদের বাবা বাহার উদ্দিন ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘চার বছর আগে সংসারের অভাব দূর করতে কাতারে গিয়েছিল। কয়েক দিন আগেও ফোনে বলেছিল, আগামী মাসে দেশে আসবে। এখন সে আর ফিরবে না, ফিরবে শুধু তার লাশ।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, কাদিরের উপার্জনের ওপরই অনেকটা নির্ভরশীল ছিল পরিবার। তার মৃত্যুতে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
Advertisement
নিহত জসিম উদ্দিনের বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে আছে। ঘরের এক কোণে বসে থাকা স্ত্রী শাহিনা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘তিন বছর আগে সংসারের জন্য বিদেশে গিয়েছিল। দুই সন্তানকে মানুষ করার স্বপ্ন ছিল। এখন আমি দুই সন্তান নিয়ে কোথায় যাব, কীভাবে চলবো?’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহত পাঁচজনের বেশিরভাগই নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তান। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে তারা কাতারে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কেউ কয়েক বছর ধরে, কেউবা আরও আগে থেকে সেখানে কাজ করছিলেন।
স্থানীয় ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর বলেন, ‘নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজন আমার ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাদের অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। এই মৃত্যু শুধু পাঁচটি প্রাণের ক্ষতি নয়, পাঁচটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ঘটনা।’
দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লোকমান আহমদ বলেন, নিহত কাদির আহমদের পরিবারের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন।
কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান শাকিল বলেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের নিহতদের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। পাশাপাশি মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
এফএ/জেআইএম