জীবন পালনিজের হাতে মাছ কাটার সময় নেই। কেউ ব্যাচেলর, কেউ চাকরিজীবী, কেউ আবার গিন্নির ঝামেলা এড়াতে চান। তাই মাছ কিনেই চলে যান বাজারের মাছ কাটার জায়গায়। এই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই সিলেট নগরের বাজারগুলোতে গড়ে উঠেছে মাছ কাটার এক নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পেশা। এটি এখন কম বেশি সব বড় মাছ বাজারেই দেখা যায়।
Advertisement
সিলেট নগরের সিটি মার্কেটের ভেতরের কাঁচাবাজার বাজারে ২১ বছর বয়সী মাহমুদুল হাসান মাছ কাটার কাজ করছেন প্রায় দুই-তিন বছর ধরে। তার চাচা দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। চাচার কাজের চাপ কমাতেই তিনি এই পেশায় যুক্ত হন।
মাহমুদুল জানান, বাজারে মাছ বেশি এলে কাজও বেশি হয়, আবার মাছ কম হলে আয়ও কমে যায়। প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়, যা তিনি ও তার চাচা ভাগাভাগি করে নেন।
তিনি আরও জানান, মাছ কাটার নির্দিষ্ট কোনো মূল্যতালিকা নেই। মাছের আকার-আকৃতি অনুযায়ী পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়। চার কেজির একটি মাছ কাটতে সাধারণত ৮০ টাকা নেওয়া হয়। তবে কখনো ৫০-৬০ টাকায়, আবার কখনো ৪০ টাকাতেও কেটে দেন। কই, মাগুর, শিং, পাবদার মতো ছোট মাছ কেজিপ্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
Advertisement
মাহমুদুল বলেন, ‘কর্ম তো কর্মই। সৎভাবে আয় করতে পারলেই হলো। কেউ টাকা কম দিলে জোর করা যায় না। বরং কম নিলে সেই ক্রেতা আবারও ফিরে আসে।’
আরও পড়ুন বিশ্বের সবচেয়ে দামি চা, এক কেজির দাম কোটি টাকাএকটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত মেহেদী হাসান বাজারে মাছ কিনে কাটিয়ে নিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাচেলর মানুষ। বাসায় গিয়ে মাছ কাটার ঝামেলা এড়াতেই বাজার থেকে কেটে নিয়ে যাই। কিছু টাকা খরচ হলেও সময় বাঁচে।’
আরেক চাকরিজীবী বলেন, ‘বাজারের একজন মাছ কাটার কর্মী যে কাজ পাঁচ মিনিটে করতে পারেন, বাসায় সেটি করতে ২০ মিনিট বা তারও বেশি সময় লাগে। তাই টাকা খরচের চেয়ে সময় বাঁচানোই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
অনেকের মতে, বড় মাছ কাটতে বাসার নারীরা আগ্রহী নন কিংবা পারেন না। আবার সন্তান ও সংসারের কাজ সামলে মাছ কাটার বাড়তি ঝামেলাও নিতে চান না। ফলে বাজার থেকেই মাছ কেটে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
Advertisement
সিটি মার্কেটের ভেতরের এই বাজারের এক কিশোরকে মাছ কাটতে দেখা গেল। প্রায় এক বছর ধরে সে এই কাজ করছে। তার দাবি, এক দিনে এক মণ মাছ কাটার অভিজ্ঞতাও হয়েছে তার।
আরও পড়ুন চায়ের দোকানে শোনা যায় এমন ২০ সংলাপমাছ কাটার আরেক কর্মী তোফাজ্জল হোসেন পাঁচ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। সকাল ৯টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করেন তিনি। তার মতে, নগরজীবনের ব্যস্ততায় মাছ কাটার জন্য আলাদা সময় বের করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। ফলে এই সেবার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
প্রায় সাত-আট বছর ধরে মাছ কাটার কাজ করছেন মনির হোসেন। তিনি জানান, বর্তমানের মতো ছাউনিযুক্ত বাজার ছিল না আগে। তখন খোলা জায়গায়, ড্রেনের পাশে বসেই মাছ কাটতেন।
মনির বলেন, ‘মাছ কাটতে বেশি সময় লাগে না, কিন্তু সাহস লাগে। মনে ভয় থাকলে হাত কেটে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।’ নিজেরও তিনবার হাত কেটে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘মাছ কাটার কাজ পুরোপুরি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। কোনো দিন একটানা কাজ করতে হয়, আবার কোনো দিন দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয় ক্রেতার অপেক্ষায়।
মাছের বাজারে ক্রেতারা মাছ কিনে দ্রুত বাড়ি ফিরতে চান। আর সেই কাজটিই সহজ করে দিচ্ছেন মাছ কাটার সঙ্গে যুক্ত এসব মানুষ। নগরজীবনের ব্যস্ততার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাছ কাটার এই পেশা হয়ে উঠেছে বাজারের অপরিহার্য এক অনুষঙ্গ।
কেএসকে