নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম দিয়ে সিলেট ছাড়ছেন সদ্য প্রত্যাহার হওয়া জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম। প্রায় ৭০০ বছরের ইতিহাসে কেউ যা করতে পারেননি, বিদায়ের আগ মুহূর্তে তিনি তা করে গেলেন। তার সাহসী পদক্ষেপেই হযরত শাহজালালের (রহ.) মাজারে মাত্র চার দিনে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা জমা পড়ার খবর পেয়েছে সিলেটবাসী তথা পুরো দেশ।
Advertisement
এর আগে শত শত বছর ধরে শাহাজালাল মাজারের দানবাক্সে জমা পড়া টাকার কোনো হিসাব পাননি সিলেটবাসী। এই হিসাবে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিতেই প্রত্যাহার হন আলোচিত জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম।
আরও পড়ুন শাহজালালের মাজারের দানবাক্স সিলগালা, পাহারা বসালো প্রশাসনসাদাপাথর লুট কাণ্ডে আলোচিত সময়ে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সিলেটে এসেছিলেন সারওয়ার। এবার শাহজালালেরর মাজারের মাত্র চার দিনের টাকার হিসাব দেখিয়ে ফের আলোচনার তুঙ্গে এসে সিলেট ছাড়ছেন তিনি।
হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার শুধু সিলেটের একটি ধর্মীয় স্থান নয়; দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবেও এটি পরিচিত। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী ও ভক্তের আগমনে এখানে বিপুল পরিমাণ দান জমা হয়। কিন্তু সেই অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। কিন্তু কোনো প্রশাসনই সেখানে হস্তক্ষেপ করেনি’
Advertisement
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সোমবার রাতে সিলেট ত্যাগ করবেন সদ্য প্রত্যাহার হওয়া জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম। তবে যাওয়ার আগে তিনি সিলেটের ইতিহাসে নজির স্থাপন করে গেছেন। তার এই নজির নতুন বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আরও পড়ুন শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে ৪ দিনেই মিললো ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকাসিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন বলেন, ‘সোমবার রাতেই ডিসি সিলেট ছেড়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। তিনি চলে যাওয়ার পর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) ভারপ্রাপ্ত ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাজারের টাকা সোনালী ব্যাংকে মাজারের নামীয় একটি হিসাবে রাখা হবে। সম্প্রতি এই অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এই টাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এর আগে দুপুর আড়াইটার দিকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে মাজারের সিলগালা করা তিনটি বড় দানের ডেগ ও একটি দানবাক্স খোলা হয়। একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুটি টাকা গণনার মেশিনের সাহায্যে দীর্ঘ চার ঘণ্টায় গণনা শেষ করেন।
Advertisement
‘চার দিনে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জমা পড়েছে। সেই হিসেবে একদিনে গড়ে সাড়ে চার লাখ টাকা জমা হয়েছে। তাহলে শত শত বছর ধরে কোটি কোটি টাকা ভোগ করলো কারা?’
গণনা শেষে ওয়াক্ফ অফিসার সজল মিয়া বলেন, ‘বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকেল থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত চার দিনে মাজারের দানবাক্সে জমা পড়েছে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। পাশাপাশি পাওয়া গেছে সাত আনা সোনা, সৌদি রিয়াল, মার্কিন ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ডসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা।’
আরও পড়ুন শাহজালালের মাজারের দানবাক্সে হাত দিয়েই কি প্রত্যাহার হলেন ডিসি সারওয়ার বিতর্ক থেকে রহস্য উন্মোচনহযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার শুধু সিলেটের একটি ধর্মীয় স্থান নয়; দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবেও এটি পরিচিত। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী ও ভক্তের আগমনে এখানে বিপুল পরিমাণ দান জমা হয়। কিন্তু সেই অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। কিন্তু কোনো প্রশাসনই সেখানে হস্তক্ষেপ করেনি।
সাম্প্রতিক সময়ে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম। প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নতুন দানবাক্স স্থাপন, পুরোনো দানের ডেগ সিলগালা, ব্যাংক হিসাব খোলা হয়।
তার এ উদ্যোগের পরপরই ধর্মীয় অঙ্গন, সামাজিক মহল এবং বিভিন্ন পরিসরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কেউ এটিকে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন। আবার কেউ মাজারের প্রচলিত ব্যবস্থায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেছেন।
‘বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকেল থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত চার দিনে মাজারের দানবাক্সে জমা পড়েছে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। পাশাপাশি পাওয়া গেছে সাত আনা সোনা, সৌদি রিয়াল, মার্কিন ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ডসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা’
এমন আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়।
আরও পড়ুন সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার প্রত্যাহারের আদেশ, তবু পিছু হটেননিডিসি সারওয়ারের প্রত্যাহারের আদেশ প্রকাশের পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, মাজারের দানবাক্স গণনার উদ্যোগ হয়তো আর বাস্তবায়িত হবে না। কিন্তু প্রত্যাহারের আদেশের পরও তিনি সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি। বরং ‘নাছোড়বান্দার’ মতো সোমবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে মাজার এলাকায় উপস্থিত হন তিনি। প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে মাজারে তিনটি বড় ডেগ ও একটি দানবাক্স খুলে প্রকাশ্যে টাকা গণনা করা হয়।
গণনার পুরো সময় তিনি সামনে না এলেও নিরাপদ দূরত্বে থেকে কার্যক্রম তদারকি করেন। পরে গণনা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই তিনি এলাকা ত্যাগ করেন। তবে এসময় গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি আলোচিত এই ডিসি।
আরও পড়ুন দুই বাড়িতে বন্দি হযরত শাহজালালের তলোয়ার-খড়ম-থালা-বাটি যে প্রশ্ন দর্শনার্থীদের মনেটাকা গণনার সময় মাজারে অবস্থান করা সামির মিয়া নামের একজন দর্শনার্থী জাগো নিউজকে বলেন, ‘চার দিনে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জমা পড়েছে। সেই হিসেবে একদিনে গড়ে সাড়ে চার লাখ টাকা জমা হয়েছে। তাহলে শত শত বছর ধরে কোটি কোটি টাকা ভোগ করলো কারা?’
তিনি আরও বলেন, ডিসি সারওয়ার যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে সিলেটবাসীর কাছে মাজারের যে হিসাব তুলে ধরেছেন, সেজন্য সিলেটবাসী তার কাছে কৃতজ্ঞ।
আরও পড়ুন মাজারগুলোতে যেন মদ-গাঁজার আসর না বসে: সিলেটের ডিসি সারওয়ারআহসান উল্লাহ নামের আরেক দর্শনার্থী বলেন, ডিসি সারওয়ারের উদ্যোগ সিলেটের ইতিহাসে মাইলফলক। তবে তিনি সিলেটের মন্ত্রী-এমপি ও বিশিষ্টজনকে নিয়ে এই কাজ করলে হয়তো প্রত্যাহার হতেন না। তবে তিনি যেটা করেছেন তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এসআর/এএসএম