কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পর প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আলোচনায় আওয়ামী লীগ। দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য কর্মসূচি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়াও সামনে আসছে। বিশেষ করে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি এ বিষয়ে কী ভাবছে, সেটি নিয়েও তৈরি হয়েছে কৌতূহল।
Advertisement
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য অস্থিরতা এড়াতে রাজধানী ঢাকা ও দেশের একাধিক জেলায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন আ.লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে ঢাকায় ১৮ হাজার পুলিশ মোতায়েনপ্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সেনা মোতায়েন করা হয়েছে মূলত ঢাকা মহানগর ও আশপাশের এলাকা, চট্টগ্রাম বিভাগীয় শহর, গাজীপুর শিল্পাঞ্চল, নারায়ণগঞ্জের শিল্প ও বাণিজ্য এলাকা এবং ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ জেলায়। এ ছাড়া পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) বিভিন্ন সংবেদনশীল এলাকা ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অতিরিক্ত টহল ও নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিএনপির প্রতিক্রিয়াজুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যার দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ বিষয়টিকে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন, আবার কেউ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করছেন।
Advertisement
বিষয়টি নিয়ে ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল জাগো নিউজকে বলেন, ‘যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম রুখতে জনপ্রতিনিধিরা সতর্ক ও সচেষ্ট রয়েছেন। তার মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচির আড়ালে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল থাকতে হবে।
আরও পড়ুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে যে কারণে ‘হাই অ্যালার্ট’বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় না নিয়ে বরং হুমকি-ধমকির পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা রাজনীতি করি মানুষের জন্য। রাজনীতিতে ভুল-ভ্রান্তি হতে পারে। ভুল হলে আমরা মানুষের কাছে দায়বদ্ধ থাকি এবং তা স্বীকার করি। কিন্তু আওয়ামী লীগ যে ভুলগুলো করেছে, সেগুলো তারা স্বীকার করেনি। বরং তারা যে কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছে, তাতে আমার মনে হয় তারা ভুল পথে যাচ্ছে।
দুদু আরও বলেন, আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধানের একরোখা মানসিকতার কারণে তাদের কর্মীরা আরও বিপদে পড়ছে। আমার মনে হয়, তাদের এ কর্মসূচি ঠিক হবে না।
Advertisement
এদিকে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ ইজ নো মোর পলিটিক্যাল পার্টি। আওয়ামী লীগ একটা মাফিয়া পার্টি, এটা একটা ফ্যাসিবাদী দল। সুতরাং রাজনৈতিক তকমা দিতে চাই না। আওয়ামী লীগের ডিএনএতেই গণতন্ত্র নেই।
অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বেগম সেলিমা রহমান জাগো নিউজকে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নিয়ে বিএনপির আলাদা কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নেই। তার মতে, এটি সম্পূর্ণভাবে সরকারের প্রশাসনিক ও আইনগত বিষয়।
দলীয় কর্মসূচি বা নির্দেশনা কী?এদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সাম্প্রতিক কার্যক্রম ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেন, রাষ্ট্রবিরোধী যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তবে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে বিএনপি বা এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে কোনো দলীয় কর্মসূচি বা বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।
যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহা. আবু আতিক আল হাসান মিন্টু জাগো নিউজকে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নিয়ে দলীয়ভাবে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এটি যুবদলের সাংগঠনিক বিষয় নয়। বর্তমানে সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও গতিশীল করার দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমার কাছে এখনো পর্যন্ত দলীয় কোনো নির্দেশনা আসেনি। তবে যতদূর জানি, নেতাকর্মীরা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।’
আরও পড়ুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী / প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ’লীগএদিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর বিভাগ থেকে পাঠানো এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্ভাব্য তৎপরতার প্রেক্ষাপটে আগামীকাল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয়, জেলা, মহানগর ও বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের নেতাকর্মীদের সতর্ক ও সজাগ অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, অধীনস্থ উপজেলা, পৌরসভা ও কলেজ ইউনিটগুলোকে দ্রুত এ নির্দেশনা পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন যেন জনশৃঙ্খলা বিনষ্ট, নৈরাজ্য সৃষ্টি বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাতে না পারে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এছাড়া দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা এবং আইনের শাসন বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের সহ-সভাপতি সাফি ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা এড়াতে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই, সবাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখুক এবং কোনোভাবেই জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত না হয়।’
আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মসূচিসূত্র মতে, আওয়ামী লীগ তাদের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে শ্রদ্ধা নিবেদন, দোয়া ও প্রার্থনা, অসহায় মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ, গণসংযোগ, শোভাযাত্রা, লিফলেট ও পোস্টার বিতরণসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রম।
আরও পড়ুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে ঢাকায় সতর্ক অবস্থানে পুলিশপ্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন ধানমন্ডি ৩২, বনানী কবরস্থান ও গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি রয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
দলীয় ঘোষণায় বলা হয়েছে, ২৩ জুন কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ভার্চুয়াল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন।
এছাড়া ২৪ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর পৃথক আলোচনা সভা এবং ১ জুলাই দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। তবে এসব কর্মসূচি দলীয় সূত্রে ঘোষিত হয়েছে।
কেএইচ/কেএইচকে