খেলাধুলা

শব্দ ফুরিয়ে যায়, মেসি ফুরান না!

আচ্ছা! বাংলা ভাষায় শব্দের পরিমাণ ঠিক কত? সঠিক সংখ্যাটা জানা মুশকিল। তবে এটা সত্য, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে নিয়ে লিখতে লিখতে বাংলা ভাষার শব্দ ভাণ্ডারেই যেন টান ধরে গেছে!

Advertisement

কেনই বা টান পড়বে না? এক যুগের বেশি সময় ধরে একটা মানুষ যেভাবে ধারাবাহিক পারফর্ম করছেন, সেভাবে প্রতিনিয়ত তার নামের পাশে একটা একটা করে উপমা ব্যবহার করতে হয়েছে! হয়েছে বললে ভুল হবে, এখনো হচ্ছে। একদিন পর বয়স হবে ৩৯, অথচ এখনও একটা বিশ্বকাপের সবচেয়ে কাঙ্খিত কেন্দ্রীয় চরিত্র তিনিই। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, যে টানা দুই জয়ে উড়ন্ত শুরু করলো, সেটা তো তার হাত ধরেই!

ক্যারিয়ারে সব জিতে যাওয়ার পর খেলতে নামা বিশ্বকাপটা শুরু করেছেন হ্যাটট্রিক দিয়ে। ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিকে সেদিন ছুঁয়েছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৬ গোল করা জার্মান কিংবদন্তী মিরোস্লাভ ক্লোসাকে।

ফলে আজ (সোমবার) অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে এক গোল করলেও রেকর্ডটা নিজের করে ফেলতেন! সুযোগটাও এলো তাড়াতাড়ি, পেনাল্টি পেলো আর্জেন্টিনা। তবে মেসি সেটা মিস করলেন! আরে এই মিসেও তো রেকর্ড। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি তিন পেনাল্টি মিসের রেকর্ড! মানে লোকটা যাই করুক, সেটাই যেন রেকর্ড হতে হবে। শুধু শুধু তো আর রেকর্ডের বরপুত্র বলা হয় না তাকে!

Advertisement

ম্যাচের ৯ম মিনিটে পেনাল্টি মিস করা মেসি ৩৮তম মিনিটে করেন রেকর্ড গোল। বাঁ-প্রান্ত থেকে ফাকুন্দো মেদিনার দারুণ ক্রসে থিয়াগো আলমাদা চমৎকারভাবে বল ছেড়ে দেন। আলমাদার সেই ডামিতে মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগ, তারা ভাবতেই পারেনি শটটা মেসি নিবেন। সেই সুযোগেই বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে অস্ট্রিয়ার জাল কাঁপান লিওনেল মেসি। তার নিখুঁত ফিনিশিংয়ে কোনো জবাবই ছিল না অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগারের। তিনি নড়ারই সুযোগ পেলেন না।

অথচ ৯ম মিনিটে পেনাল্টি মিস না করলে তখনই রেকর্ড গোল হয়ে যায়! কিন্তু বিধাতা হয়তো চাননি রেকর্ড গোল পেনাল্টি থেকে করুক ফুটবল যাদুকর। ক্যারিয়ারের হাজারতম গোল পেনাল্টি থেকে করেছিলেন ব্রাজিলের তিনবারের বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার পেলে। তখন সেলেসাও সমর্থকরা নাকি এটা নিয়ে আক্ষেপও করেছিলেন, এমন গোল হলো পেনাল্টি থেকে! তবে পেলে অবশ্য খুব একটা অখুশি ছিলেন না। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘হয়তো ঈশ্বর চেয়েছিলেন যে পুরো খেলা স্টপ থাকুক, সবাই শুধুমাত্র পেনাল্টিতে পেলের দিকেই ফোকাস করুক!’

মেসিকে অনেক বছর পর এই গোল নিয়ে এমন কথা আর বলতে হবে না, সমর্থকদেরও কোনো আক্ষেপ থাকবে না। সেজন্যই তো পেনাল্টি নয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হতে মেসি করলেন তার বাঁ পায়ের চিরচেনা চোখের জন্য শান্তির এক গোল। প্রথমার্ধ শেষে মেসির ওই গোলেই লিড নিয়ে বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা।

বিরতির পর কোচ লিওনেল স্কালোনি বেশ কয়েকটি পরিবর্তন আনতে বাধ্য হন। ক্রিস্টিয়ান রোমেরো অস্বস্তি বোধ করছিলেন, লওতারো মার্টিনেজ ছন্দ খুজে পাচ্ছিলেন না। এতে করে খেলাতেও কি একটু প্রভাব পড়লো কিনা! অস্ট্রিয়াই যেন মাঝেমধ্যে চড়ে বসছিল আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে।

Advertisement

ফুটবলে এক গোল কখনোই নিরাপদ নয়। আগের ম্যাচে হ্যাটট্রিক করা মেসিকে ৭৯ মিনিটে উঠিয়ে নেয় আর্জেন্টিনা। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসি খেলেছেন পুরোটা সময়। আর ঝলকটাও বাঁচিয়ে রেখেছিলেন শেষের জন্য! বর্তমান সময়ের কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা যেমন ভিডিওর শুরুতেই লিখে রাখেন, শেষে দেখুন সবচেয়ে মজার দৃশ্য! ঠিক যেন সেভাবেই ম্যাচের সবচেয়ে সেরা দৃশ্যটির জন্য দর্শকের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আটকে রেখেছিলেন মেসি।

নির্ধারিত সময় শেষে খেলা তখন অতিরিক্ত সময়ে। ৯৫তম মিনিটে অস্ট্রিয়া বক্সের ভেতরে ছোটখাটো একটা ঝড়ই বয়ে যায়। প্রথমে হুলিয়ান আলভারেজের শট অস্ট্রিয়া ডিফেন্ডারের গায়ে লাগে, ফিরতি বলটা যায় মেসির পায়ে। এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে তাঁর শট ঠেকান আরেক ডিফেন্ডার।

আবারও ফিরতি বলে মেসির শট এবং দুই-তিন ডিফেন্ডারের পায়ের ফাঁক গেলে গোল! মুহূর্তের মধ্যে অবিশ্বাস্য মনে হবে! ওই জায়গা থেকে ৫ জন ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে গোল! এটা আসলে মেসি বলেই সম্ভব…! যেটা তিনি করে চলেছেন এক যুগের বেশি সময় ধরে।

আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে করেছে সর্বমোট ১৫৭ গোল। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি এই ১৫৬ গোলের মধ্যে ১৮টি গোলই এলো মেসির পা থেকে। শুধু তাই নয়, আরও ৮টি গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। অর্থ্যাৎ, মোট ২৬টি গোলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মেসি। শতকরা হিসেব করলে যা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার মোট গোলের প্রায় ১৬ ভাগ (১৬.০৩%)। অবশ্য এই পরিসংখ্যান মেসির মাহাত্ম্য বোঝাতে যথেষ্ট নয়, মেসি যে এর চেয়েও অনেক মাইল দূরে!!!

এসকেডি/আইএইচএস