অবিশ্বাস্য মেসি! অবিশ্বাস্য!! লিওনেল মেসি আবারও দেখালেন কেন তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা। ৩৮ বছর বয়সেও দুর্দান্ত ফর্ম ধরে রেখে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-০ ব্যবধানে জয় এনে দিলেন এই কিংবদন্তি। একই সঙ্গে নিশ্চিত করেছেন দলের নকআউট পর্বও।
Advertisement
শুরুতে পেনাল্টি মিসের কারণে কিছুটা হতাশা ছড়িয়েছিল আর্জেন্টিনা শিবিরে। কিন্তু যিনি পেনাল্টি মিস করলেন, সেই লিওনেল মেসিই করলেন দুটি অবিশ্বাস্য গোল।
ম্যাচের প্রথমার্ধে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নেওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধেও থামেননি মেসি। শেষ দিকে প্রায় টানা দ্বিতীয় ম্যাচে হ্যাটট্রিকের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। পেনাল্টি মিস না হলে কিংবা শেষ দিকে একটি ফ্রি-কিক অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট না হলে হয়তো হ্যাটট্রিকও পূর্ণ হয়ে যেত। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুটি হ্যাটট্রিকের রেকর্ড তো আর কারও নেই।
৯ম মিনিটে মেসির মত ফুটবলারের পা থেকে স্পট কিক পোস্টের বাইরে চলে যাবে, তা ছিল অবিশ্বাস্য। পুরো গ্যালারি তখন উঠে দাঁড়িয়েছিল মেসির বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড উদযাপন করার জন্য। কিন্তু তখন তার পেনাল্টি মিস হতাশ করলো সবাইকে।
Advertisement
এরপর তিনি যা দেখালেন, তা রীতিমত অবিশ্বাস্য। পুরো আর্জেন্টিনা দল যেন সবগুলো বল তৈরি করে এনে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল মেসির পায়ে। প্রথমার্ধে অন্তত দুটি নিশ্চিত গোলের শট নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার স্লাগার এবং তাদের ডিফেন্ডারদের দৃঢ়তায় গোল থেকে বার বার বঞ্চিত থাকতে হচ্ছিল মেসিকে।
অবশেষে এলো সেই কাঙ্খিত মুহূর্ত। মেদিনা কাছ থেকে বল পেয়ে বুলেটের গতিতে যে শটটা নিলেন মেসি, চোখের পলকে সেটা গিয়ে ঠাঁই নিলো অস্ট্রিয়ার জালে। দ্বিতীয়ার্ধের শেষ মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন অধিনায়ক নিজেই। (৯০+৫ মিনিটে) যে গোলটা দিলেন মেসি, সেটাকে চোখ ধাঁধানো বললেও ভুল হতে পারে। দীর্ঘদিন চোখে লেগে থাকার মত একটি গোল ছিল সেটি।
দ্রুত পাল্টা আক্রমণে হুলিয়ান আলভারেজকে দারুণ একটি পাস দেন মেসি। আলভারেজ প্রথম সুযোগটি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলেও বল আবার ফিরে আসে আর্জেন্টাইন মহাতারকার কাছে। বক্সের ভেতরে ঢুকে প্রথম শটটি অস্ট্রিয়ার ডিফেন্ডাররা ঠেকালেও ফিরতি প্রচেষ্টায় জালের দেখা পান মেসি।
এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৮-তে উন্নীত করেন তিনি। ফলে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের চেয়ে দুই গোল এগিয়ে গেলেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায়।
Advertisement
চলতি বিশ্বকাপে প্রথম দুই ম্যাচেই অবিশ্বাস্য ছন্দে রয়েছেন মেসি। মাত্র দুই ম্যাচে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচে। ৩৮ বছর বয়সে এমন পারফরম্যান্স ফুটবল বিশ্বকে নতুন করে বিস্মিত করছে।
ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়া। যাদের বিপক্ষে আলজেরিয়ার মত ম্যাচটা এত সহজ হবে না, এটা আগেই জানা ছিল। মাঠেও এর প্রমাণ মিলেছে। আর্জেন্টিনার চোখে চোখ রেখে সমানভাবে লড়াই করেছে অস্ট্রিয়ানরা।
কিন্তু যে দলে মেসির মত ফুটবলার আছেন, সেই দলটিকে আটকে রাখা যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্যই কঠিন। পেনাল্টি মত সহজ সুযোগ মিস করেও ঠিকই আর্জেন্টিনার জন্য অস্ট্রিয়ার গোলমুখের তালা খুলে দিলেন মেসি নিজেই।
ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচের ৩৮তম মিনিটে দুর্দান্ত এক গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন মেসি। যে গোল নিয়ে ১-০ ব্যবধানে বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা এবং অস্ট্রিয়া। ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক মুহূর্ত আগে আরেকবার বল জড়ালেন তিনি।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল আর্জেন্টিনা। চতুর্থ মিনিটে লওতারো মার্টিনেজকে বক্সের ভেতর ফাউল করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে ভিএআর পরীক্ষা শুরু হয়। জাভিয়ের স্লাগার, স্টেফান পচস- এ দ ‘জনই একই সময়ে চ্যালেঞ্জে গিয়েছিলেন।
রেফারি ভিএআর মনিটরে দেখে আর্জেন্টিনাকে পেনাল্টি দেন। ৯ম মিনিটে স্পট কিক নিতে আসেন মেসি। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে তার শট পোস্টের ডান পাশ দিয়ে বাইরে চলে যায়। বিশ্বকাপে এটি ছিল মেসির সবচেয়ে হতাশাজনক পেনাল্টি মিসগুলোর একটি। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে তিনটি পেনাল্টি মিস করেন তিনি। যা সর্বোচ্চ।
পেনাল্টি মিসের পরও আর্জেন্টিনা আক্রমণ চালিয়ে যায়। ১৯ মিনিটে মেসি বক্সের ভেতর থেকে শট নিলেও অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগার তা রুখে দেন। অন্যদিকে অস্ট্রিয়াও পাল্টা আক্রমণ করে কয়েকবার বিপদ তৈরি করলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভাঙতে পারেনি।
অবশেষে ৩৮ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। থিয়াগো আলমাদা বাম দিকে বল বাড়ান ফাকুন্দো মেদিনার কাছে। মেদিনা নিচু ক্রস ফিরিয়ে দেন বক্সের প্রান্তে ছুটে আসা মেসির দিকে। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক প্রথম ছোঁয়াতেই দারুণ বাঁকানো শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। অসহায় শ্লাগার শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারেননি।
এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজের গোলসংখ্যা ১৭-তে নিয়ে যান মেসি। ফলে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসেকে (১৬ গোল) পেছনে ফেলে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে বসেন তিনি।
গোল হজমের পর কিছুটা চাপে পড়ে যায় অস্ট্রিয়া। ৪০ মিনিটে পসচ হলুদ কার্ড দেখেন, আর ৪২ মিনিটে মেসিকে ফাউল করেও বড় শাস্তি এড়ান ড্যানসো। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে অস্ট্রিয়া একটি ফ্রি-কিক পেলেও ডেভিড আলাবার ডেলিভারি গোলকিক হয়ে যায়।
প্রথমার্ধে মেসির প্রতিটি বল স্পর্শই যেন দর্শকদের মধ্যে আলাদা উত্তেজনা তৈরি করেছে। এমনকি বিরতির আগে নিজের অর্ধে বল পেয়ে পেছনে পাস দিলেও গ্যালারির দর্শকরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানিয়েছেন।
সাত মিনিট অতিরিক্ত সময় শেষে বিরতির বাঁশি বাজলে ১-০ গোলের লিড নিয়েই মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা। পেনাল্টি মিসের আক্ষেপ ভুলে ইতিহাসগড়া গোল করে দলকে এগিয়ে দিয়েছেন মেসি।
এই জয়ে আর্জেন্টিনা নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে। গ্রুপের অন্য ম্যাচে জর্ডান যদি আলজেরিয়ার বিপক্ষে পয়েন্ট হারায়, তাহলে আর্জেন্টিনা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেও পরের পর্বে উঠবে।
আইএইচএস/