খেলাটা তখন মাত্র শেষ হয়েছে, ব্রডকাস্টিং ক্যামেরা খুঁজে নিলো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে। আর তিনি?স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, ‘আই আম ব্যাক।’ হ্যাঁ রোনালদো ফিরলেন, ফেরায় থাকলো দম্ভ, থাকলো দাপট আর তার নিত্যদিনের সঙ্গী রেকর্ড। চন্দ্রবিন্দু ব্যান্ডের একটি বিখ্যাত গান আছে, ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়।’
Advertisement
বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি মেইল দূরত্বে জন্ম নেওয়া ক্রিশ্চিয়ানোর এই গান শোনার কথা নয়। তবে মঙ্গলবার আমেরিকার টেক্সার প্রদেশের হাউস্টন স্টেডিয়ামে রোনালদো যেটা করলেন, তাতে শুধু ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়’ লাইনটাই মানায়।
বেশ কয়েকদিন ধরে সময়টা ভালো যাচ্ছিল না রোনালদোর। চলতি বিশ্বকাপেই তার শুরুটা হয়েছে যতটা সম্ভব বাজে হতে পারে! ডি আর কঙ্গোর বিপক্ষে ওই ম্যাচে তাকে খুজেই পাওয়া যায়নি। ম্যাচের পর তার নেতৃত্বগুন নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। কথা উঠেছে, রোনালদো পুরো দলকে এক সূতোয় গাথতে পারেননি। এ কারণেই মাঠে তাকে পাস দেন না সতীর্থরা।
রোনালদো আর পারবেন না, তিনি তো গোলরক্ষকের চেয়েও কমবার বল ছুঁয়েছেন! শুরুর একাদশে তাঁর থাকা উচিত কি না, প্রশ্ন উঠেছিল তা নিয়েও! এমন আরও কত কি! সমালোচনার ঝড় যখন চারদিক থেকে ধেয়ে আসছে, রোনালদো তখন অপেক্ষায় ছিলেন একটাই মুহূর্তের- সব কিছুর জবাব দেওয়ার।
Advertisement
মঙ্গলবার অবশ্য রোনালদো মোটেও দেরী করেননি। ম্যাচের ৬ষ্ট মিনিটেই গোল উদযাপনের মাতেন তিনি। ডান পাশ থেকে হোয়াও ক্যানসেলোর বাড়ানো বল ধরে, ডান পায়ের জোড়ালো শটে গোলটি পেয়েছেন রোনালদো।
পর্তুগালের জার্সিতে এটি তার ১৪৪তম গোল। একই সঙ্গে এই গোলেই প্রথম ফুটবলার হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন ৬টি বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ডও গড়েছেন এই পর্তুগিজ রাজপুত্র। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫টি বিশ্বকাপে গোল করেছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসি। শুধু তাই নয় বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতাও এখন রোনালদো।
এদিন যেন রোনালদোর প্রতিযোগীতাটা ছিল নিজের সঙ্গে নিজের। প্রথম মিনিট থেকে তাকে গত কয়েক মাসের চেয়ে বেশি উৎফুল্ল, আগ্রাসী মনে হয়েছে। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা সমালোচনার জবাব দেওয়ার জন্য যেন মরিয়া হয়ে ছিলেন তিনি। প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি শটে যেন লুকিয়ে ছিল সমালোচকদের উদ্দেশে একটি বার্তা- ‘আমি এখনো শেষ হয়ে যাইনি।’
ম্যাচের ৩৯তম মিনিটে আরও একটি রেকর্ডময় গোল করেন সিআরসেভেন। ব্রুনো ফার্নান্দেজের পাস থেকে দারুণ ফিনিশিংয়ে করেন ম্যাচে নিজের দ্বিতীয় ও পতুর্গালের তৃতীয় গোল।এই গোলে পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলে সবার ওপরে এখন রোনালদো। ইউসেবিওর ৯ গোল ছাড়িয়ে রোনালদোর গোল এখন ১০।
Advertisement
রোনালদো আজীবন জেদিই! নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া, সেরা হওয়ার ক্ষুধা এ তার আজীবনের সঙ্গী। পর্তুগালের লিসবনের এমন একটা পরিবারে জন্মেছিলেন, সেখানে তিন বেলা খাবার পাওয়াও ছিল অনিশ্চিত। সেখান থেকে ১২ বছর বয়সে একা বাড়ি ছাড়া, এরপর একের পর এক সিড়ি বেয়ে রোনালদো আজ এখানে। ৫ বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী রোনালদোর সবচেয়ে বড় শক্তি লেগে থাকা, হাল ছেড়ে না দেওয়া।
অথচ গত ম্যাচেই রোনালদোর শেষ দেখে ফেলেছিলেন অনেকে। কিন্তু মূল বিষয় তিনি দেখেননি। রোনালদো সবসময় নিজেকে সেরা মানেন, শুধু মানেন না সেটা দাম্ভিকতার সঙ্গে বলেনও। আর সেটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। লড়াইয়ে কখনো ক্ষান্ত না দেওয়া, হার না মানার জেদ আর চোখে-মুখে যুদ্ধ জয়ের তেজের সঙ্গে আকাশ সমান আত্মবিশ্বাস- এসবই রোনালদোকাএ আলাদা করেছে সবার থেকে। তবে এমন ম্যাচেও রোনালদোর ব্যর্থতা আছে। হ্যাঁ, অবিশ্বাস্য নয় আছে। দ্বিতীয় গোল পরার পর সবমিলিয়ে ৬৬ মিনিট পেয়েছেন হ্যাটট্রিক পূরণ করার জন্য। বেশ কয়েকটি সহজ সুযোগও এসেছে, কিন্তু হয়নি। তাতে কি চাদেরও তো কলঙ্ক আছে।
ফিকে হয়ে আসা অন্ধকার, প্লাটফর্মে ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাঁড় । জানলার কাঁচটাতে লেগে থাকা শূন্যতা, সশব্দে ছুটে চলে ট্রেনলতে পারিনি তার যেটুকু যা ভাষা ছিল, কেঁপে ওঠা চোখের পাতায়। তারপর ভোরবেলা ডিঙিয়েছি চৌকাঠ, ভয়ানক সতর্কতায়। এভাবেও ফিরে আসা যায়, এভাবেও ফিরে আসা যায়।’
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আজকের পারফর্ম্যান্সের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য এর চেয়ে ভাল গান আর হতে পারেই না। আরে চ্যাম্পিয়ন, সুপারস্টাররা তো এভাবেই সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বারবার ফিরে আসেন আপন মহিমায়।
এসকেডি/আইএইচএস/