ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। নামমাত্র খরচে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার আশায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শত শত রোগী ছুটে আসেন এই হাসপাতালে। একসময় এই হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে নামমাত্র খরচে চোখের জটিল অস্ত্রোপচার করা যেত। কিন্তু দীর্ঘ সাত বছর ধরে এখানে সব ধরনের অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এতে একদিকে যেমন গরিব রোগীরা অন্ধত্বের ঝুঁকিতে পড়ছেন, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে অপারেশন থিয়েটারে পড়ে থাকা কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি।
Advertisement
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৮ সালে ‘ন্যাশনাল আই কেয়ার’ প্রকল্পের আওতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালের চক্ষু বিভাগকে আধুনিকায়ন করা হয়। একটি বিদেশি দাতা সংস্থার সহায়তায় এখানে স্থাপন করা হয় কোটি টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক সব চিকিৎসা সরঞ্জাম। এর মাধ্যমে হাসপাতালে চোখের ছানি অপারেশন, চশমাজনিত সমস্যা দূরীকরণ, ওপিডি ম্যানেজমেন্ট, লেজার চিকিৎসা এবং ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি রোগ নির্ণয়সহ চোখের প্রায় সব ধরনের আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া হতো। চক্ষু বিভাগে সপ্তাহে দুদিন করে প্রতি মাসে গড়ে দুই শতাধিক রোগীর সফল অস্ত্রোপচার করা হতো।
তবে হাসপাতালের এই সোনালি দিন থমকে যায় ২০১৯ সালে। ওই বছর চক্ষু বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. ইয়ামলী খান পদোন্নতি পেয়ে বদলি হয়ে যান। এরপর থেকেই রহস্যজনকভাবে হাসপাতালে চোখের অপারেশন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি মাঝে টানা তিন বছর এই বিভাগের সাধারণ চিকিৎসাসেবাও সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।
‘বর্তমানে হাসপাতালের তৃতীয় তলায় চক্ষু বিভাগে মাত্র একজন চিকিৎসক ও একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট কোনো রকমে আউটডোর (বহিঃবিভাগ) সেবা চালু রেখেছেন। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন গড়ে আড়াইশ রোগী চোখের সমস্যা নিয়ে এখানে আসেন। মাত্র দুজন জনবল দিয়ে এই বিশাল সংখ্যক রোগীকে প্রাথমিক সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে রোগীরা শুধু চোখের ড্রপ আর প্রাথমিক কিছু পরামর্শ নিয়েই বাড়ি ফিরছেন’
Advertisement
দীর্ঘ প্রায় সাত বছর ধরে কোনো অস্ত্রোপচার না হওয়ায় বর্তমানে অপারেশন থিয়েটারটিতে (ওটি) তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে অস্থায়ীভাবে এখন শিশু ওয়ার্ড করা হয়েছে। ফলে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সব যন্ত্রপাতি।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, বর্তমানে হাসপাতালের তৃতীয় তলায় চক্ষু বিভাগে মাত্র একজন চিকিৎসক ও একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট কোনো রকমে আউটডোর (বহিঃবিভাগ) সেবা চালু রেখেছেন। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন গড়ে আড়াইশ রোগী চোখের সমস্যা নিয়ে এখানে আসেন। মাত্র দুজন জনবল দিয়ে এই বিশাল সংখ্যক রোগীকে প্রাথমিক সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে রোগীরা শুধু চোখের ড্রপ আর প্রাথমিক কিছু পরামর্শ নিয়েই বাড়ি ফিরছেন।
আরও পড়ুন হাসপাতালে দ্বিগুণ হচ্ছে শয্যা, জনবল-বাজেট কি বাড়বে? রাজশাহীতে এইচআইভি আক্রান্তদের ৬৬ শতাংশই সমকামীকোনো রোগীর যদি অস্ত্রোপচার বা অপেক্ষাকৃত জটিল কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাকে সরাসরি ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট বা অন্যান্য হাসপাতালে রেফার করে দেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, সরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জেলার দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষ। প্রাইভেট ক্লিনিকে বা ঢাকায় গিয়ে চোখের ছানি অস্ত্রোপচার করার মতো সামর্থ্য অনেকেরই নেই।
Advertisement
‘ঢাকায় গিয়ে মাকে অপারেশন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক সমস্যা থাকায় এই মুহূর্তে ঢাকায় গিয়ে অপারেশন করানো আমার পরিবারের জন্য সম্ভব নয়। হাসপাতালে অপারেশন চালু থাকলে আমাদের মতো পরিবারের রোগীদের সব দিক দিয়েই সুবিধা হতো’
হাসপাতালে কথা হয় নবীনগরের আলমনগর গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা শফিকুল নামের একজনের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এখানে কম টাকায় চিকিৎসা নেওয়া যায়, তাই এসেছি। চিকিৎসক খুব ভালোভাবে দেখে চিকিৎসা দিয়েছেন। প্রতিদিন আমার মতো শত শত রোগী এখান থেকে চিকিৎসা নেন।’
নূর মিয়া নামের এক বৃদ্ধ বলেন, ‘হাসপাতালে সরকারিভাবে অপারেশন (অস্ত্রোপচার) নাকি বন্ধ আছে। ঢাকায় গিয়ে অপারেশন করতে বলেছেন। ঢাকায় গিয়ে অপারেশন করা আমার জন্য খুব কষ্টকর। এত খরচ বহন করার সামর্থ্য আমার নেই। সরকারিভাবে অপারেশন সেবা চালুর জোর দাবি জানাই।’
আরও পড়ুন স্বাস্থ্য সচিবের সাক্ষাৎ পাননি আদ্-দ্বীনের বিদেশি ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ১৫০০ শয্যায় উন্নীত হচ্ছে বগুড়া শজিমেক হাসপাতালখাদিজা আক্তার নামের আরেকজন বলেন, ‘ঢাকায় গিয়ে মাকে অপারেশন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক সমস্যা থাকায় এই মুহূর্তে ঢাকায় গিয়ে অপারেশন করানো আমার পরিবারের জন্য সম্ভব নয়। হাসপাতালে অপারেশন চালু থাকলে আমাদের মতো পরিবারের রোগীদের সব দিক দিয়েই সুবিধা হতো।’
‘২০১৯ সালে চক্ষু বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. ইয়ামলী খান পদোন্নতি পেয়ে বদলি হয়ে যান। এরপর থেকেই রহস্যজনকভাবে হাসপাতালে চোখের অপারেশন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি মাঝে টানা তিন বছর এই বিভাগের সাধারণ চিকিৎসাসেবাও সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল’
এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালি জাগো নিউজকে বলেন, ‘চিকিৎসক সংকটের কারণে বড় কোনো চোখের অস্ত্রোপচার করা যাচ্ছে না। চিকিৎসক পদায়ন হলে অস্ত্রোপচার পুনরায় শুরু করা যাবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অপারেশন থিয়েটারটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। শিশু ওয়ার্ডে সংস্কার কাজ চলমান থাকায় চক্ষু বিভাগের অপারেশন থিয়েটারে অস্থায়ীভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে৷’
এসআর/এমএস